বিশ্বভারতীর স্বদেশ প্রেমিক শিক্ষক কালীমোহন ঘোষ, পৃথিবী মুগ্ধ হল তাঁর কীর্তি দেখে

শান্তিনিকেতনের গ্রামগুলি সংস্কারের পিছনে অন্যতম ভূমিকা ছিল তাঁর

সে এক সময় ছিল। বিশ্বভারতী গড়ে ওঠার প্রথম আমল। রবীন্দ্রনাথ মগ্ন হয়ে সৃজন করছেন তাঁর স্বপ্নের শিক্ষাপীঠ। ভুবনডাঙার মেঘলা আকাশ, রাঙামাটি, পূর্বপল্লী যেন কুঁড়ি থেকে ফুল হওয়ার পথে। সিন্ধু সেঁচে মুক্তো আনার মতো করে রবি ঠাকুর খুঁজে আনছেন শান্তিনিকেতনের জন্য শিক্ষক। অন্য সকলের চোখে যারা হয়তো নিতান্ত সাধারণ, রবীন্দ্রনাথের প্রেরণায় তাঁরা অনন্য হয়ে উঠতে শুরু করলেন। পৃথিবী মুগ্ধ হল তাঁদের কীর্তি দেখে। এমনি এক মানুষ কালীমোহন ঘোষ, বিশ্বভারতীর শিক্ষক। শান্তিনিকেতনের পল্লীসংস্কারে তাঁর ভূমিকা রবীন্দ্রনাথ বারবার মনে করেছেন। শান্তিনিকেতনের গ্রামগুলি সংস্কার করতে বরাবর আগ্রহী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই কাজে এক প্রধান সহায়ক হিসেবে পেয়েছিলেন কালীমোহন ঘোষকে। দুইবেলা জ্বর আসা এক জীর্ণ শরীরের মানুষের কী আশ্চর্য মনের জোর। তার উপর তখন চলছে স্বদেশী আন্দোলনের উন্মাদনা। কালীমোহন ঘোষ বেশ পরিচিত স্বদেশী, পুলিশের খাতায় তাঁর নাম উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথও নিজের মতো করে দেশের কথা ভাবছেন। ‘স্বদেশী সমাজ’-এর পরিকল্পনা করছেন। এই সময় উত্তর পূর্ববঙ্গের জমিদারি এলাকার গ্রাম সংস্কারের কাজ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কালীমোহন ঘোষ তখন তাঁর এক অন্যতম সহায়ক। তাঁদের আলাপ যে মনিকাঞ্চন যোগ— একথা বোঝা যাবে ধীরে ধীরে। কালীমোহন ঘোষ জীবনের শেষবেলা পর্যন্ত গ্রাম উন্নয়নের কাজ করে যাবেন নিরলস ভঙ্গিতে। প্রেরণা – রবীন্দ্রনাথ!

১৮৮৪ সালে ত্রিপুরা জেলায়, বাজাপ্তি গ্রামে কালীমোহনের জন্ম। কষ্ট করেই লেখাপড়া শিখছিলেন কালীমোহন। কোচবিহার রাজ কলেজে পড়তেন তিনি। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পটভূমিতে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে কালীমোহন কলেজের পড়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। অনুশীলন সমিতির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তরুণ কালীমোহন গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন আর বিলিতি দ্রব্য বয়কটের কথা বলতেন। তখনও তিনি জানেন না, সময় তাঁর জন্য যে কাজ নির্দিষ্ট করে রেখেছিল, তারই প্রস্তুতিপর্ব চলছে। আসলে আমরা প্রত্যেকেই একটি কোনো কাজের ভার নিয়ে পৃথিবীতে আসি। আমাদের নিয়তি অমোঘ পথপ্রদর্শক হয়ে সেই কাজের ভুবনে আমাদের নিয়ে চলে। কালীমোহনেরও ঠিক তাই হয়েছিল। অনায়াসে মিশে যেতেন পল্লীর মানুষজনের সঙ্গে। কাজ করতেন সহজ সরল ভঙ্গিতে। ঢাকা জেলার সোনারঙ গ্রামে, এমন কোনো এক দিনে তরুণ ক্ষিতিমোহন সেনের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। দুজনেরই ভাবনার জগত অধিকার করে আছেন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য। এর মধ্যে বরিশালের এক সাহিত্য সভায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সরাসরি দেখা করেন কালীমোহন ঘোষ। টুকরো টুকরো ভাবনার মিল তখন দুজনের মধ্যে তৈরি করছে বিনিসুতোর বাঁধন। জমিদারির পল্লী সংস্কারের ভাবনার কথা কালীমোহনকে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। জহুরির চোখ বুঝে নিয়েছিল আসল রত্নকে। সরাসরি এই কাজে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন কালীমোহনকে। কালীমোহনও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিলেন। ভূপেশচন্দ্র রায়, অনঙ্গমোহন চক্রবর্তী, প্যারিমোহন সেন, অক্ষয়চন্দ্র সেন ও কালীমোহন ঘোষ—এই কয়জন হলেন রবীন্দ্রনাথের গ্রাম সংস্কারের কাজের প্রধান সহায়ক। কালীমোহনের মনের জোর প্রবল। কিন্তু শরীর বড়ো দুর্বল। তাই অচিরেই অসুখে পড়লেন। রবীন্দ্রনাথ প্রধান সহায়কের অসুখের দিনে নিজেই নিয়েছিলেন সেবার ভার। রোজ দুবেলা জ্বর আসত কালীমোহনের। ওষুধের বাক্স খুলে ওষুধ দিতেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে গিরিডি গিয়ে অনেকটাই সুস্থ হয়ে ওঠেন কালীমোহন। রবীন্দ্রনাথ আর তাঁকে শিলাইদহ পাঠালেন না। শান্তিনিকেতনের শিশু বিভাগে পাঠিয়ে দিলেন। তখন ১৯০৭ সাল! শুরু হল কালীমোহনের জীবনের আসল অধ্যায়। কাজের প্রতি অসম্ভব নিষ্ঠা ছিল কালীমোহনের। ছোটো থেকে বড়ো সব কাজই করতেন নিষ্ঠা ভরে। ছোটোদের সঙ্গে বেশ আলাপ জমত তাঁর। বাংলা আর ইতিহাস পড়াতেন। তাঁর ক্লাসে গল্পের আসর বসত। গ্রিক ও রোমানদের বীরত্বের কাহিনির সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় বীরদের বীরত্বের কাহিনিও আশ্চর্য সুন্দর ভঙ্গিতে গল্প করে শোনাতেন। তাঁর আবেগ আর শব্দের টুকরো মিলেমিশে এক অন্য ভুবন তৈরি হত ছাত্রদের মনে। 

কালীমোহনের মূল ঝোঁকটা ছিল গ্রাম উন্নয়নের দিকে। তাই সুযোগ পেলেই কালীমোহন চলে যেতেন ভুবনডাঙায়, সাঁওতাল পল্লীতে। সঙ্গে থাকতেন শান্তিনিকেতনের একটু বড়ো ছাত্ররা। কয়েকবছর পর তার সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন উইলি পিয়ারসন। ১৯১২ সালে কালীমোহন উচ্চশিক্ষার জন্য ইংলন্ডে যাওয়ার সুযোগ পেলেন। রবীন্দ্রনাথও সেইসময় ইংলন্ডে। কালীমোহন ঘনিষ্ঠভাবে রবীন্দ্রসান্নিধ্য পেলেন আবার। কবি ইয়েটসের সঙ্গে দেখা হল কালীমোহনের। রবীন্দ্রনাথের ছেলে রথীন্দ্রনাথ, কালীমোহন এবং ইয়েটস গল্পগুজব করে অনেক সময় কাটাতেন। কালীমোহন রোটেনস্টাইনের একটি আঁকার মডেল হয়েছিলেন। 

বিলেত থেকে ফিরে আবার শান্তিনিকেতন। কালীমোহনের ছিল গ্রাম, গ্রামের মানুষদের সম্পর্কে বিপুল অভিজ্ঞতা। রবীন্দ্রনাথ সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগালেন। ১৯২২ সালে শ্রীনিকেতনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পল্লী সংগঠন বিভাগ। এলমহার্স্টের সঙ্গে এই বিভাগের গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন কালীমোহন। গ্রামবাসীদের শিশুর মতোই মনে করতেন কালীমোহন। এলমহার্স্টের নানা আধুনিক পরিকল্পনাকে কাজে প্রয়োগ করেছিলেন তিনি। দরিদ্র কৃষিজীবিদের জন্য তৈরি হয়েছিল ঋণদানকারী ব্যাঙ্ক, ধর্মগোলা, কৃষি সমবায়, স্বাস্থ্য সমবায়, শিল্প সমবায়। গ্রামের পথঘাটের সংস্কার, বিচার ব্যবস্থা, ভ্রাম্যমান গ্রন্থাগার, ম্যালেরিয়া নিবারণ সমিতি, অস্পৃশ্যতা বর্জন আরো অনেক কাজ করেছিলেন কালীমোহন। পল্লীসেবা বিভাগ থেকে ‘দেশ -বিদেশ’ বলে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল, যার সম্পাদক ছিলেন কালীমোহন ঘোষ। এইসব তথ্য কালীমোহনের পুত্র শান্তিদেব ঘোষের স্মৃতিচারণ থেকে। ‘রায়পুর’ আর ‘বল্লভপুর’ গ্রামের তথ্য সংগ্রহ করে রেখে গিয়েছেন নিখুঁতভাবে। তবে কালীমোহনের বিপ্লবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া অতীত এই পল্লীসংগঠনের কাজের অন্তরায় হয়েছিল একসময়। ব্রিটিশ সরকার সন্দেহের চোখে দেখত কালীমোহনকে। তবে কাজের প্রয়োজনে ব্রিটিশ সরকারকে অনেকসময় কালীমোহনেরই দ্বারস্থ হতে হয়েছে। কালীমোহন দক্ষিণপূর্ব ইউরোপ আর পশ্চিম এশিয়ায় গিয়ে গ্রাম উন্নয়ন সম্পর্কে আরো অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরে ব্রতীবালক দল তৈরি, জয়দেব-কেঁদুলির মেলা পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া, পৌষমেলায় প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা— বিবিধ কাজে অংশ নিয়েছিলেন কালীমোহন। বিশ্বভারতীর জন্য অর্থসাহায্য চেয়ে রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষরযুক্ত আবেদন পত্র নিয়ে তিনি উত্তর ও দক্ষিণভারতের রাজা মহারাজাদের কাছে গিয়েছিলেন অনেকবার। অসাধারণ ভালো বক্তা ছিলেন তিনি। তাঁরই নেতৃত্বে ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্যের দল সেকালের পূর্ববাংলা পরিক্রমা করেছিল। তবে অনেকসময় আঘাত পেয়েছেন বিশ্বভারতীর সেই আমলের কর্মকর্তাদের থেকে। অভিমান করে পদত্যাগ পত্র পাঠিয়েছেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথ চিঠি পাঠিয়েছেন— ‘তোমার কর্মত্যাগপত্র আমরা কিছুতে স্বীকার করব না।’ অভিমান ভুলে আবার কাজে যোগ দিয়েছেন কালীমোহন ঘোষ। শারীরিক কষ্ট কোনোদিন তাঁর মনের জোর আর কাজের উদ্যমকে কমাতে পারে নি। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছড়ায় গেঁথে রেখেছিলেন কালীমোহন ঘোষকে—

কালীমোহনের অশেষ গুণ। 
যে তারে জানে—সেই জানে
দীনমুখে হৃদয়ে জ্বলে আগুন
অবিচার সহে না প্রাণে। 

গ্রামের মানুষ জানত কালীমোহন তাঁদের আপনজন। তাদের দুঃখকষ্টে স্থির থাকতে পারতেন না কালীমোহন। ১৯৪০ সালের পয়লা মে গ্রামবাসীদের সমস্যা মেটাতে মেটাতেই হঠাৎ করে প্রাণত্যাগ করেছিলেন কালীমোহন ঘোষ। কর্মী মানুষের শেষ নিঃশ্বাস বুঝি এইভাবেই পড়ে। 

সহায়ক গ্রন্থঃ
রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ, পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়

Developed by DXDasia