নন্দলালের আঁকা হরিপুরা কংগ্রেসের পোস্টারেও ছায়া ফেলেছিল কালীঘাটের পট
পৃথিবীর শিল্পকলার ইতিহাস হল দেওয়া নেওয়ার ইতিহাস। এক প্রাণের ইতিহাস অন্য প্রাণের ইতিহাসের সঙ্গে যেমন মিলে মিশে যায় একই ভাবে এক প্রান্তের ভূগোলে বেড়ে ওঠা শিল্প অন্য প্রান্তের ভূগোলে বেড়ে ওঠা শিল্পকে প্রভাবিত করে বা অনুপ্রেরণা জোগয়। এমনটা বারে বারেই দেখা গিয়েছে। পিকাসোকে প্রেরণা দিয়েছে ইবেরিয় ভাস্কর্য, হেনরি ম্যুরকে প্রেরণা জাগিয়েছে মেক্সিকান ভাস্কর্য, পল গঁগ্যা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন জাপানি চিত্রকলা থেকে। এমন ঘটনার উদাহরণ বিরল নয়। কিন্তু বারে বারেই যে বিষয়টি লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে তা হলো লোকশিল্প বারে বারে প্রত্যেক শিল্পীর নিজস্বতা অনুসন্ধানে ও নতুনত্বের অন্বেষণে সহায়ক হয়ে উঠেছে।
এই প্রসঙ্গেই আলোচিত হতে পারে কালীঘাটের ছবির কথা। এই আলোচনার প্রসঙ্গেই অবনীন্দ্রনাথের বয়ান – “বিলিতি পোর্ট্রেট আঁকতুম, ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে পট পটুয়া জোগাড় করলাম। যত রকম পট আছে সব স্টাডি করলাম, সেই খাতাটি এখনো আমার কাছে।” এ থেকে বোঝা যায় অবনীন্দ্রনাথও দেশি মতে দেশি ছবি আঁকার তাগিদে পট স্টাডি করেছিলেন। আর সব রকমের পটের মধ্যে যে কালীঘাট ছিল তাতে সন্দেহ নেই।
আবার আমরা যদি এক ঝলক চোখ বুলিয়ে নিতে পারি নন্দলাল বসুর আঁকা হরিপুরা কংগ্রেসের পোস্টার (১৯৩৭) গুলির ওপরে সেখানে পরিষ্কার ভাবে বোঝা যায় এই সব পোস্টারে নন্দলাল বসু কালীঘাটের লৌকিক রীতির বলিষ্ঠ রেখা, বর্ণ এবং ছবির বিষয়ের উপস্থাপনার ঢং টিকে নিয়েছিলেন। কালীঘাটের রেখার স্ফূর্তির সঙ্গে এই পোস্টার গুলির তুলনা করা যায়।
অন্য দিকে যামিনী রায় সরাসরি কালীঘাট পটের বিষয়কেই কপি করেছেন কিন্তু তিনি ছবিতে রং লাগিয়েছেন নিজস্ব পদ্ধতিতে। তাই কালীঘাট পটের প্রতি বারেই দেখা গিয়েছে শিল্পীদের আবেগ ও প্রেরণা। একেবারে সমকালীন সময়ের শিল্পীদের মধ্যে সনৎ কর যেমন প্রবল ভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।
কালীঘাটের পট চিত্রের দ্বারা একই ভাবে যোগেন চৌধুরীর অনেক ছবির আড়ালেও খুঁজে নেওয়া যায় সেই পটের গুণগান। বিশেষ করে ছবির মধ্যে বাবু বিবির স্থূল শরীর আমাদের তেমন কথাই মনে করায়। সম্প্রতি ভাস্কর তাপস সরকারের নির্মাণে সরাসরি কালীঘাটের পট উঠে এসেছে, সঙ্গে তিনি মিশিয়ে দিয়েছেন তাঁর নিজস্বতা কে।
অতএব কালীঘাটের পট শৈলী যে যুগে যুগে সমকালীন শিল্পীদের অনুপ্রেরণা করেছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
এই পট যেন তাই সৃজনের আগুন।