জে টি সান্ডারল্যান্ড : ইংরেজরা যাঁর বই ‘ব্যান’ করেছিল, পাশে পেয়েছিলেন বাঙালি সম্পাদক-বন্ধুকে

এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বাইবেল লিখেছিলেন তিনি

ভারতে এসে এখানকার মানুষদের সঙ্গে আলাপ করে, এখানকার পত্র-পত্রিকা পড়ে, ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে, ইংরেজ শাসকদের কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করে, এখানকার সংগঠনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে, দেশে ফিরে ভারতের দুর্ভিক্ষ সম্বন্ধে একটি ছোট পুস্তিকা লেখেন এক মানবদরদী ইংরেজ। নাম- জেবেজ টমাস সান্ডারল্যান্ড। ‘দ্য কজ়েস অব ফ্যামিন ইন ইন্ডিয়া’। নিউ আটলান্টিক মান্থলি পত্রিকায় লেখেন ‘দ্য নিউ ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া’ নামে প্রবন্ধ। সান্ডারল্যান্ড প্রথম ভারতে আসেন ১৮৯৫ সালে। ১৯১৩ সালে দ্বিতীয় বার ভারতভ্রমণের পরে তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ধর্মযাজকের পদে থাকলেও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও অপশাসনের বিরুদ্ধে মুখর হয়ে ওঠেন। ভারতের স্বাধীনতার সমর্থনে লেখেন এক বিস্ময়কর বই ‘ইন্ডিয়া ইন বন্ডেজ: হার রাইট টু ফ্রিডম’। এই বই প্রথমে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত হয়। তারপর সান্ডারল্যান্ডের বন্ধু, ‘প্রবাসী’ ও ‘দ্য মডার্ন রিভিউ’-এর সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ১৯২৮ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন বইটি।

১৯২৯ সালে পুলিশ ‘প্রবাসী’ পত্রিকার অফিসে হানা দেয়, ৪৩টি বই বাজেয়াপ্ত করে, রাজদ্রোহের অপরাধে গ্রেফতার হন মুদ্রাকর সজনীকান্ত দাস। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ও গ্রেফতার হন। তার পর শুরু হয় রাজদ্রোহের মামলা। শেষে সজনীকান্ত ও রামানন্দ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে মুক্তি পান। তখনকার দিনে সান্ডারল্যান্ডের ‘ইন্ডিয়া ইন বন্ডেজ’ ভারতে খুব জনপ্রিয় হয়। কেউ কেউ এমনকী বইটিকে এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বাইবেল বলে অভিহিত করেছিলেন। প্রথম সংস্করণে ২০০০ বই ছাপা হয়েছিল। তা নিঃশেষিত হয়ে গেলে শুরু হয় দ্বিতীয় সংস্করণের কাজ। টনক নড়ে সরকারের। এমনিতেই সে সময় মেরঠ ষড়যন্ত্র মামলা ইত্যাদি ঘটনায় সন্ত্রস্ত ছিল ইংরেজ সরকার। এর মধ্যে সান্ডারল্যান্ডের বই ভারতীয়দের উত্তেজিত করতে পারে ভেবে সরকার বইটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। অর্থাৎ ইংরেজের দ্বারা নিষিদ্ধ হয় একজন ইংরেজের বই।আজীবন আমেরিকায় বসবাস করলেও জে টি সান্ডারল্যান্ড জন্মসূত্রে ইংরেজ। ১৮৪২ সালে ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারে তাঁর জন্ম। ১৮৪৪ সালে অর্থনৈতিক কারণে তাঁর পরিবার চলে আসে আমেরিকায়। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভের পর ব্যাপটিস্ট সম্প্রদায়ের যাজক হিসেবে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। এর পর তিনি ইউনিটারিয়ান মতবাদে দীক্ষিত হয়ে সম্প্রদায়ের ধর্মযাজক হিসেবে কাজ করেন। ধর্মপ্রাণ হলেও তিনি ছিলেন নির্ভেজাল মানবতাবাদী।

সান্ডারল্যান্ড যে যুক্তি দিয়েছিলেন, সেগুলি হল: ১) অন্য জাতিকে শাসন করার অধিকার কোনও জাতির নেই। ২) যে কোনও বিদেশি শাসনের মতো ভারতে ইংরেজ শাসনও অত্যাচারমূলক। ৩) ভারতের মতো ঐতিহ্যশালী দেশকে পদানত করে রাখা অপরাধ, পৃথিবীর শান্তির অন্তরায়; তাই ভারতে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ প্রয়োজন। ৪) যে ভারতবাসী গত ৩০০০ বছর ধরে নিজেদের শাসন করেছে, তারা আজও তা করতে পারে, ইংরেজের গায়ে-পড়া অভিভাবকত্বের প্রয়োজন নেই। ৫) একমাত্র ভারতবাসীর হাতেই ভারতবাসীর স্বার্থ সুরক্ষিত থাকতে পারে।

ইংরেজ আমলে প্রায় সব প্রাদেশিক ভাষার গ্রন্থই রাজরোষে পড়েছিল। বাংলা তার মধ্যে অন্যতম।এ ছাড়া বিদেশে প্রকাশিত অনেক বইপত্র ও পত্রিকা ইস্তেহার এ দেশে পাঠানো ও প্রচারের উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল। ইংরেজ আমলে বাজেয়াপ্ত বইগুলি সমীক্ষা করলে দেখা যাবে, এই তালিকায় সাহিত্যের কোনও ধারাই বাদ যায়নি। প্রবন্ধ, নাটককবিতাউপন্যাস, ছোটগল্প, গান, সবরকম মাধ্যম, বই, ইস্তেহার, সাময়িক পত্রিকা, কার্টুনআলোকচিত্র

বইপত্রের উপর এরকম সংঘবদ্ধ বেসরকারী আক্রমন অন্যান্য দেশের মতো ভারতে নকশাল আন্দোলনের সময়, বিশেষ করে ১৯৭০-১৯৭৩ সালে, বহু মনীষী, লেখকের আলোকচিত্র, প্রতিকৃতি, মূর্তিও নষ্ট করা হয়েছিল। স্কুল-কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পাঠাগারে চলে এই হামলা। এখনও আমরা এই উদাহরণ(তসলিমা নাসরিন, মলয় রায়চৌধুরি, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, ভারভারা রাও প্রমুখ) দেখতে পাই। স্বাধীন চিন্তার ধবংস সাধনের এই মনোভাবের বিরুদ্ধে ১৯৫৫, ১৪ জুন ডটিমাউট কলেজে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। সেটি পঠন-পাঠনের ও অবাধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে এক মূল্যবান দলিল। তিনি বলেছিলেন “লাইব্রেরিতে গিয়ে কোন বই পড়তে ভীত হয়ো না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমার ব্যক্তিগত শালীনতার আদর্শকে ক্ষুণ্ণ করছে। তোমার শালীনতার আদর্শই তোমার পক্ষে একমাত্র সেন্সরনীতি।”

যে শালীনতার কথা আইসেনহাওয়া উল্লেখ করেছিলেন, তা আক্ষরিক অর্থে শালীনতা নয়, তা চেতনা বা মুক্তচিন্তা। একজন লেখক, সে কী লিখবে? এই পৃথিবীতে ‘শালীনতা’ যখন একটা মিথ, রূপকথার গল্প বৈ অন্য কিছু নয়, তখন ‘শালীনতা’ বলতে আমরা কি বুঝবো? তখন লেখকের কলমে ‘অশ্লীলতা’ অর্থাৎ সত্যিটা ছাড়া আর কীই বা উঠে আসবে! আর এই(প্রতিবাদের) ভাষা তো নীতিপুলিশ বা রাজরোষে পড়বেই, এ অবধারিত, চিরকালীন। বই হল স্বাধীনতার ইস্তেহার, মাতৃভাষার অভিব্যক্তি, কখনও কখনও অস্ত্রও…একতার। তাই লোপাট করা, নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া, ভয় দেখানো, শিক্ষা-সাহিত্যের নির্মম খুন, এ ছাড়া আর কোনও পথ খোলা থাকে না আখের গোছানো মুখোশধারী প্রকৃত ‘Traitor’ বা ‘দেশদ্রোহী’দের কাছে।

সহায়ক গ্রন্থঃ

ব্রিটিশ শাসনে বাজেয়াপ্ত বাংলা বই, শিশির কর

 

Developed by DXDasia