জোড়াসাঁকো থেকে দক্ষিণেশ্বর : জয় গোস্বামীর ‘প্রণাম’

গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনে কবিপক্ষে জয় গোস্বামীর নির্জন কবিতা পাঠ

“বাক‍্য কাকে বলছো! বলো গান!” লিখছেন জয় গোস্বামী, এ বছর জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত তাঁর একগুচ্ছ কবিতায়, ‛প্রণাম’ শিরোনামে যা গ্রন্থিত হয়েছে সিগনেট প্রেস থেকে (জয় গোস্বামীর ‘প্রণাম’)। শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদামণি, বিবেকানন্দ; এই তিনজনকে উদ্দেশ্য করে এক অবিরত পংক্তিমালা লিখছেন জয়। তাতে উঠে আসছে সমকাল, উঠে আসছে কবির আবহমানের শান্তিপিপাসা। আর, যেন এক আশ্চর্য অথচ অমোঘ পদার্পণে আসছেন রবীন্দ্রনাথ। যেমন আসছেন শিব আর দুর্গা, আসছেন নতুন পুরাকথার চরিত্রের মতো আরও অনেকেই। ইতিহাস নয়, যেন অনন্ত প্রাণসাগরের মত এক ‘সত‍্য’ সময়কাল রচনা করছেন কবি। তাই লিখছেন—

জয় গোস্বামী, রাহুল মিত্র, অরিত্র পাণ্ডা

“সন-তারিখ মানবো না, ভুলে যাবো ইতিহাসে
কী কী লেখা আছে
কার সঙ্গে কার দেখা হলো কি হলো না
মনে রাখবো না-
মানবো না কোন খ্রীষ্ট-অব্দে এসেছেন কে কে
ঘোড়ার গাড়িতে নয়, জোড়াসাঁকো থেকে 
রবীন্দ্রনাথকে পালকি করে
নিয়ে যাবো তোমাদের দক্ষিণেশ্বরে
আমি হবো একজন পালকির বাহক

সন্ধ‍্যারাত্রি নেমেছে তখন…
আকাশে কী স্নিগ্ধ চাঁদ
চাঁদ ঘিরে কয়েকজন তারা…
রবিবাবু তাঁর একটি ব্রহ্মসঙ্গীত শোনাচ্ছেন–
রামকৃষ্ণচক্ষে জলধারা…”

এই কবিতা শেষ হচ্ছে এক মুগ্ধ সভার বর্ণনায়, যেখানে এই অপরূপ দৃশ্যখানি চোখে দেখবার জন‍্য, ‛অদৃশ্য শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন স্বর্গের গায়ক-গায়িকারা।’

পুরো অনুষ্ঠানটি দেখুন

জয়ের বিশ্বাসী উচ্চারণের সঙ্গে যখন সরোদ বেজে ওঠে গভীরে, যখন নরেন্দ্রনাথের গায়নের উল্লেখে কালের মন্দ্রধ্বনির মতো বাজতে থাকে পাখোয়াজের ধ্রুপদী বোল, কবিতার ‛ধ্রুবপদ’ যখন মিশে যায় গানের ধ্রুপদে, তখন সূচনার ‛বাণী তব ধায়’ গানের সঙ্গে শেষের ‛বিপুল তরঙ্গ রে’ গানের গভীর সূত্র রচিত হয় এক অপার্থিব আবহে। আর যেন অনিবার্যভাবেই রবীন্দ্রগানের পাশাপাশি আসে বেহাগে বাঁধা সেই গান- ‘মন, চলো নিজ নিকেতনে’।

স্বর্গ নয়, মর্ত‍্যের গায়ক-গায়িকারাই ছুঁয়ে বসেছিলেন জয়কে, সম্প্রতি এক সন্ধ‍্যাকালে, গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচারের আয়োজনে ‛আদি ও অন্ত’ শীর্ষক এক নিবেদনে। জয় পড়ছিলেন তাঁর এই আশ্চর্য পংক্তিমালা। এই পৃথিবীর কত শ্রান্তি মেখে একটি স্নানের জন‍্য যে কবি ডুবে মরতে চেয়েছেন, ভেসে যেতে চেয়েছেন অলকানন্দা জলে তাঁর প্রথম কবিজন্মে, সেই জয় উল্লেখে আনেন ‛অস্ত্রঘাঁটি’, আনেন ‛ঝড়’। তার পাশাপাশি ধ্রুবতারার মতো তাঁর গন্তব‍্যপথে লেখা থাকে কামারপুকুর, জয়রামবাবাটী। কবির উচ্চারে স্থাননামের   আড়ালে থাকা ‘পুকুর’, ‘বাটী’ এই শব্দগুলি আমাদের প্রাণকে জুড়ায় । কবিতা ধারার এই স্ফূর্ত উৎসারের পাশে যথাযথ রবীন্দ্রগানকে রাখা সহজ কাজ নয়। বিন‍্যাসের এই দূরূহ কাজটি করেছেন রাহুল মিত্র। মা সারদার স্নেহভরা মুখটি যখন জয়ের কবিতায় হয়ে ওঠে এক অনুপম শান্তিপ্রতিমা, রাহুল তার পাশে গান রাখেন, “জননী তোমার করুণ চরণখানি”। সুদেষ্ণা মিত্রের স্নিগ্ধ উচ্চারণে এই গানের ‛করুণ চরণ’ এক বিশ্বময় শান্তিপ্রতীক হয়ে ওঠে, আমাদের মনে পড়ে, ‛করুণা’ শব্দের সঙ্গে রবীন্দ্রগানের লগ্নতার কথা, তাঁর গানের দুঃখদিনের রক্তকমল কারো ‛করুণ’ পায়ে অর্পণ করার কথা। 

সুদেষ্ণা মিত্র

জয়ের বিশ্বাসী উচ্চারণের সঙ্গে যখন সরোদ বেজে ওঠে গভীরে, যখন নরেন্দ্রনাথের গায়নের উল্লেখে কালের মন্দ্রধ্বনির মতো বাজতে থাকে পাখোয়াজের ধ্রুপদী বোল, কবিতার ‛ধ্রুবপদ’ যখন মিশে যায় গানের ধ্রুপদে, তখন সূচনার ‛বাণী তব ধায়’ গানের সঙ্গে শেষের ‛বিপুল তরঙ্গ রে’ গানের গভীর সূত্র রচিত হয় এক অপার্থিব আবহে। আর যেন অনিবার্যভাবেই রবীন্দ্রগানের পাশাপাশি আসে বেহাগে বাঁধা সেই গান- ‘মন, চলো নিজ নিকেতনে’। তরুণ গায়ক অরিত্র পাণ্ডা, সমগ্র ভাবনাটির প্রতি বিশ্বস্ত থেকে, এই গানটিকেও মিশিয়ে দিতে পারেন জয়ের কবিতাপাঠ আর অন‍্য রবীন্দ্রগান নিবেদনের মাঝে। রাহুল যেন সবার গানের মাঝেই প্রকাশিত হন, এই নিবেদনের পরিকল্পক হিসেবে। সিম্ফনির মতো সুচারু সাঙ্গীতিক বিন্যাসের মাঝে  কানে লেগে থাকে একটি শব্দের, একটি সংযোগের  পৌন:পনিক আর্তি : “বন্ধু ,বন্ধু ,বন্ধু…” (‘কোন শুভক্ষণে’, রাহুল মিত্রের নিবেদন)। সকল নির্জন গানগুলি একত্র হয়, জয়ের কবিতার কেন্দ্রকে ঘিরে। আমরা শান্ত হই।

Developed by DXDasia