দুর্গা পুজো ও শিল্পীদের ভূমিকা প্রসঙ্গে যোগেন চৌধুরী

শিল্পী, ক্লাব কর্তা ও ভবিষ্যৎ

কথা হচ্ছিল যোগেন চৌধুরীর সাথে। ৩-রা অক্টোবর ২০১৭, মঙ্গলবার। কিছু আগেই শেষ হয়েছে বিসর্জন শোভাযাত্রা। প্রণাম মিষ্টিমুখ কোলাকুলির পরে কলকাতার পুজোর হালহকিকত নিয়ে ওনার মতামত কী- তারই খোঁজ করছিলাম।

• পার্থ দাশগুপ্ত– কলকাতার পুজোমাঠে আপনার এই নিয়ে দ্বিতীয়বার যুক্ত হওয়া…

যোগেন– (কিছুটা বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলেন আগেরবারের কথা। খেই ধরিয়ে দিতেই মনে পড়ে যায়) হ্যাঁ মনে পড়েছে, সেলিমপুরের ওখানে শহীদনগরের একটা পুজোয় আমার এক আত্মীয় জোর করে- আমি ডিজাইনটা করে দি। ওখানে করেছিলাম কী, ইতিহাসে যতরকম দুর্গার রেফারেন্সগুলো আছে তাকে কেন্দ্র করেই… কাজটা খুব ভালো হতো। লাইন ফ্যাক্ট ডিজাইটা আমার খুব পছন্দের ছিল- যেমন নানান দুর্গার রেফারেন্স, মিডল ইস্টের মহিশাসুরমর্দিনী-র রেফারেন্স আছে সে সব সম্মিলিত ভাবে একটা নকশা ভাবনা ছিল। কিন্তু প্রধানত অর্থের যোগান না থাকার দরুন সেই কাজটা দাঁড়ায় না। আসলে যারা এক্সিকিউট করে তাদের মধ্যেও একজন ভালো শিল্পীর থাকা দরকার। সেটা সেখানে ছিল না। যতদূর মনে পড়ছে সেটা ২০১০ কী ২০১১ সাল ছিল।

তারপর এই বেহালা নতুন দলে। এখানের একজন অন্যতম কর্মকর্তা মৃত্যুঞ্জয় কয়াল আমাকে খুব জোরাজুরি করে। তা আমি প্রতিমার একটা নকশার সূত্র দিয়েছিলাম। ঐ যে যেমন চিৎপুরের কাঠখোদাই হয় না, তেমন। একটা রথের মত ব্যপারটা।খুবই পরিচিত ঐ রথের কাঠখোদাইটা। তার বিভিন্ন খোপে নানারকম মূর্তির অধিষ্ঠান তা ঐখানে প্রদীপ দাস নামে একটা অল্পবয়সী ছেলে, গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের, ওই ব্যাপারটা এক্সিকিউট করে। ওর সঙ্গে পিন্টু শিকদার নামে আর একটি ছেলেও ছিল। যদিও ব্যপারটা পুরোটাই আমার মত অনুসারে হয়নি, তবুও ওদের যেহেতু দক্ষতা ছিল, তাই একেবারে বেমানানও লাগছিল না। আমাকে মাঝে মাঝেই দেখিয়ে নিয়ে যেত। আমি পরামর্শ দিতাম ও রকম হলে ভালো, এই সব।

তবে আমি সময়াভাবে সেহেতু হাত লাগাতে পারিনি তাই ব্যাপারটা কতটা আমার আর কতটা ওদের, তাই নিয়ে একটু ধন্ধই আছে। মানে authorized এর প্রশ্ন আর কী।

কিন্তু ওরা খুবই যত্ন করে কাজটি যে করেছিল তা বোঝাই যাচ্ছিল। ফলে সর্বক্ষেত্রেই সেটা appreciated হয়েছে।

• পার্থ- এই যে আপনাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীরা দুর্গাপুজোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, তাঁর কতটা প্রয়োজন আছে?

যোগেন – দেখ এখানকার শিল্পীদের বেশ কিছুটা অর্থনৈতিক সুবিধা হয় এই ধরনের কাজ করলে। এবং সত্যি সত্যি ব্যাক্তিগত কাজের ক্ষেত্র থেকেও কিন্তু বেশ অনেকটা সময় স্যাক্রিফাইস করতে হয়। তাতে একটা সুবিধা আছে যে উপার্জিত অর্থ একেবারে ব্যাক্তিগত শিল্পীচর্চাকে support করে। তবে ভবতোষ বা তুমি, তোমাদের ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। তোমরা সব ব্যাপারটা একটা বৃহৎক্ষেত্রে চর্চার মতো করে করো।

তাছাড়া শিল্পীরা যুক্ত হলে আর একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার দেখা যায় যে প্রতিমার মূর্তিকলায় নানা রকম experiment। আর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে extension of crafts। আমি কলকাতায় এবার ঘুরে দেখলাম কিভাবে সবাই craft- কে ব্যবহার করেছে। এই ব্যাপক ব্যবহারে কিন্তু craftsmanship বা skill development ও হচ্ছে।

• পার্থ– যোগেন’দা এই পুজোতে আমি দেখেছি, যে যে পরিমাণ ফিনানসিয়াল সাপোর্ট দেয় পুজো কমিটিরা সেটা পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু একরকম important art patronage বলা চলে।

যোগেন– তা বটে, কিন্তু সবক্ষেত্রে আবার পুরষ্কারের এত হাতছানি যে পুরো ব্যাপারটার মধ্যে ভীষণ অস্থিরতা চলতে থাকে।

• পার্থ– ভারতের art patronage এর ক্ষেত্রে যেমন skoda art prize এর একটা ভূমিকা ছিল। কিন্তু সেটা সীমিত ছিল মাত্র একজনের ক্ষেত্রে এবং অর্থমূল্য ছিল ১০ লক্ষ টাকা। কিন্তু কলকাতার পুজোর ক্ষেত্রে, আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে আমরা যে বিশাল আকারের কাজের কথা ভাবি তার জন্য ৩০ লক্ষ ৪০ লক্ষ টাকার যোগান কিন্তু এই পুজো কর্তারাই দেন। এটাকে তো একপ্রকারের শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতাও বলা যায়।

যোগেন– এটার ভালো মন্দ দুটো দিকই আছে। ভালোটা হল practice in a wide area and experiences new materials and mediums, তাছাড়া mass এর সঙ্গে একটা communication এর bridge তৈরি করা।

আর অন্যদিকটা হল কাজের মধ্যে একাত্মতার জায়গাটা কিছুটা হলেও হারিয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে তুমি সেটা একাগ্রভাবে ভাবছো সেটা অনেকাংশে public demand এর ছলনায় বিঘ্নিত হয়।

• পার্থ- তবে আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে আমি যেভাবে ভাবি সেটা এই পুজোমাঠ খুব সাহায্য করে।

যোগেন– তোমার, ভবতোষের ব্যাপারটা অন্যরকম, তোমরা তোমাদের কাজটাই এই aspect এ দেখো। আমি বলছি যে বিভিন্ন জায়গায় না কেমন একটা জগঝম্প-র মতো কাজ হয়ে গেছে। মানে যা পেরেছে গুঁজে দিয়েছে। সবাটাই একটা অস্থিরতার মতো। আসলে কি জানো সব কাজেই না একটা clarity দরকার হয়। ঐ পুরষ্কারের পথে চেয়ে থাকলে কাজে খুব অস্থিরতা আসে। আমি দেখেছি এবার অনেক জায়গায় অতিকথনের মতো উদভ্রান্তের মতো কাজ করে বসে আছে।

• পার্থ– এবার শেষ প্রশ্ন- আপনি আবার যদি এই রকম অনুরোধ পান, করবেন?

যোগেন– দেখো এটা বলা মুশকিল। তবে art advisor হিসাবে অনুরোধ আসলে ভেবে দেখতে পারি। কারণ অনেক ক্ষেত্রে দেখেছি কাজে বড় অস্থিরতা। হয়তো পুরষ্কারের তাড়না আছে তাঁর পিছনে। কিন্তু পরিশীলিত ভাবে ভাবলে সুন্দর কাজ করা যায়।

Developed by DXDasia