যোধপুর পার্ক বয়েজ স্কুল : শিক্ষাকে আধুনিকতার মোড়কে এনে এখনও রাজ্যের অন্যতম সেরা

সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ১৭

ঠিক ছাত্র গড়ার কারিগর বোধহয় সেইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেই বলা যায়, যেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতি-খেলাধূলা সব বিষয়েই সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই ভাবনা নিয়েই ১৯৬২ সালের ৭ জানুয়ারি দক্ষিণ কলকাতার যোধপুর পার্ক বয়েজ স্কুলের (Jodhpur Park Boys School) পথ চলা শুরু। আর সেকারণেই রাজ্যের মধ্যে অন্যতম সেরা স্কুলের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে এই স্কুল।

“১৯৬২ সালে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঠিক করেছিল রাজ্যে বেশ কিছু আদর্শ স্কুল বা মডেল স্কুল তৈরি করবেন। সেই ভাবনা থেকেই যোধপুর পার্ক বয়েজ স্কুলের জন্ম। রাজ্য সরকারের পূর্ত দপ্তর স্কুলের ভবন তৈরি করে দিয়েছিল। স্কুলের ম্যানেজিং বডি তৈরির ক্ষেত্রেও সরকারের একটা ভূমিকা ছিল। কিন্তু, বামফ্রন্ট সরকার রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর স্কুলটি গভমেন্ট স্পনসর্ড স্কুল হিসেবে থাকলেও তার পরিচালন ব্যবস্থা গভমেন্ট এডেড স্কুলের মতন হয়ে যায়। মোটামুটি এই হচ্ছে যোধপুর পার্ক বয়েজ স্কুলের সৃষ্টির ইতিহাস।” বলছিলেন স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ সোম। ১৯৮৬ সালে তিনি যখন এই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে আসেন, তখন স্কুলের ছাত্র সংখ্যা ছিল মাত্র আড়াইশো জন। স্কুলের ল্যাবরেটরি, শ্রেণিকক্ষ কোনও কিছুই তখন সেভাবে গড়ে ওঠেনি। রবীন্দ্রনাথ সোম দায়িত্ব নিয়ে ধীরে ধীরে স্কুল সংস্কারের কাজ করেন। যোধপুর পার্ক বয়েজের বর্তমান প্রধান শিক্ষক অমিত সেন মজুমদারের কথায়, “আমাদের স্কুলে ‘হাইব্রিড মোড’ ক্লাস চলে। অফলাইনে পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে কখনও কখনও অনলাইনে ছাত্রদের পড়ান শিক্ষকরা। আমরা সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিই  পড়াশোনায়। ছাত্রদের মধ্যে সমস্ত রকমের সম্ভাবনাকে জাগ্রত করার জন্য যে শিক্ষাপদ্ধতি অবলম্বন করে পড়ানো দরকার, সেটাই করি। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত আমরা বেসলাইন সার্ভে করি ইংরেজি, অংক, বাংলার উপরে। আগের ক্লাসে পড়াশোনায় কোনও ঘাটতি আছে কি না, সেটা দেখার জন্যেই এই ব্যবস্থা। সরকার এ বিষয়ে আমাদের কোনও নির্দেশ দেয়নি, আমাদের স্কুলের শিক্ষকরাই ছাত্রদের কথা ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশেষত, মূল্যায়নের বিষয়টাতে খুব জোর দেওয়া হয়। করোনার পর বিজ্ঞান বিষয়ে ছাত্ররা দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই একটা এনজিও-র সঙ্গে সমন্বয় করে স্কুলে ‘স্টেন ল্যাব’ তৈরি হয়েছে। নিচু ক্লাসের ছেলেরা এই ল্যাবে বিজ্ঞানের বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা হাতে কলমে করতে পারবে। ছেলেদের বিজ্ঞান পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ানোই এর লক্ষ্য।” 

যদি কোনও ছাত্র বিজ্ঞান পড়তে নাও চায়, এই ল্যাবের মাধ্যমে তার মধ্যে জানার কৌতূহল বাড়বে, প্রশ্ন করার প্রবণতা বাড়বে, যা তাদের ভবিষ্যতে চলার পথ সুগম করবে – এমনই মত প্রধান শিক্ষকের। এছাড়া স্কুলে একটা বায়োডাইভার্সিটি গার্ডেনও আছে, যেখানে ছাত্রদের জীবন বিজ্ঞান ক্লাস নেওয়া হয়। রাজ্য সরকারের ‘সেন্টার অফ এক্সেলেন্স’ তকমা পেয়েছে যোধপুর পার্ক বয়েজ।

লেখাপড়ার ঐতিহ্যকে আধুনিকতার মোড়কে আচ্ছাদিত করে সেই প্রথম থেকেই এগিয়ে চলেছে এই স্কুল। তাই এই স্কুলে স্মার্ট বোর্ড, প্রজেক্টরের মাধ্যমে পঠনপাঠন চলে। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছাত্র-সহায়তার জন্য স্কুলে ইন্টারনেট পরিষেবার ব্যবস্থাও রয়েছে। একটি ছাত্রকে তার লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে সমস্ত রকম সহায়তা করে এই স্কুলের পরিবেশ, শিক্ষকদের যোগদান এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। লেখাপড়া ভয় বা আতঙ্ক নয়, এই ধারণা ছাত্রদের মনে গেঁথে দিতে যোধপুর পার্ক বয়েজ দীর্ঘ সময়কাল ধরে উদ্যোগী। কলা ও বিজ্ঞান উভয় ক্ষেত্রেই সমান ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় এখানে। 

এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন বিখ্যাত সব ব্যক্তিত্বরা। সরোদ বাদক তেজেন্দ্র নারায়ণ মজুমদার, রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় (প্রয়াত), সংগীতশিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য, প্রবুদ্ধ রাহা, দাদার কীর্তি-শ্রীমান পৃথ্বীরাজ খ্যাত অভিনেতা অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। 

স্কুলের ৫০ বছর পূর্তিতে প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক ডঃ গোপাল চন্দ্র নন্দী, ডাঃ সমিত ঘোষ, শিল্পী তেজেন্দ্র নারায়ণ মজুমদার, শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য

এই স্কুলে বায়োডাইভার্সিটি গার্ডেন আছে, যেখানে ছাত্রদের জীবন বিজ্ঞান ক্লাস নেওয়া হয়। রাজ্য সরকারের ‘সেন্টার অফ এক্সেলেন্স’ তকমা পেয়েছে যোধপুর পার্ক বয়েজ।

স্কুলের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল নিয়ে প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন, উচ্চমাধ্যমিকে ১০০ শতাংশ ছাত্র প্রথম বিভাগে পাশ করে। ৮০ শতাংশ ছাত্র ৭০ শতাংশ নম্বর পায়। মাধ্যমিকে ১০০ শতাংশ ছাত্র প্রথম বিভাগে পাশ করে। ছাত্ররা খেলাধুলো করে স্কুলের মাঠেই। খেলা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিযোগিতা স্কুলে হয়। স্কুলটি ‘শিশু মিত্র’ পুরস্কার পেয়েছে। যোধপুর পার্ক বয়েজ রাজ্যের একমাত্র স্কুল, যেখানে বার্ষিক পরীক্ষার খাতা ছাত্রদের দেখিয়ে তারপর রেজাল্ট প্রকাশ করা হয়। এটা করা হয় এই কারণে যাতে ছাত্রদের মনে তাদের পরীক্ষায় পাওয়া নম্বর নিয়ে কোনও সংশয় না তৈরি হয়। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের এটা একটা উল্লেখযোগ্য নজির।স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র, স্কুলের তিনবারের ম্যানেজিং কমিটির সম্পাদক (অধুনা প্রাক্তন) ডাঃ সমিত ঘোষের মনে এখনও যোধপুর পার্ক বয়েজ-এর স্মৃতি অমলিন। তিনি তাঁর দুই ছেলেকে এই স্কুলে পড়িয়েছেন, নিজেও প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন। এখনও স্কুলের সরস্বতী পুজোয় উপস্থিত থাকেন। সমিতবাবু বলছিলেন, “আমাদের সময় ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক একটা আলাদা মাত্রায় ছিল। আমি মনে করি যেকোনও স্কুলে শাসনের গুরুত্ব রয়েছে। যেমন আমি মনে করি আমদের সময় শিক্ষকরা ক্লাসে শাসন করতেন বলেই জীবনে সফল হতে পেরেছি। পরবর্তীতে স্কুলে সম্পাদকের পদ পেয়েছি। আর আজকাল তো শিক্ষক-শিক্ষিকারা ছাত্রদের সামান্য শাসন করলেই অভিভাবকরা থানায় চলে যান। ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কে এই বিরোধ ভালো নয়।” এরপর সমিতবাবু তাঁর স্মৃতি থেকে কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করে বললেন, “সময়টা ১৯৭২। নকশাল পিরিয়ড। আমি তখন প্রাথমিকের মর্নিং বিভাগের ছাত্র। হঠাৎ একদিন সকালে স্কুলে ওরা এলো, ব্ল্যাকবোর্ড সহ অন্যান্য জিনিস ভাঙতে শুরু করল। হইচই শুরু হয়ে গেল স্কুল জুড়ে। তখন আমাদের স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ধীরেনবাবু এসে ওদের হঠিয়ে দেন। আমরা আতঙ্কমুক্ত হই। ঘটনাটা আমার আজও মনে আছে। আমাদের সময় পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাটাও খুব ভালো ভাবে হত। স্কুলের ভিতর বিরাট মাঠ ছিল, এখনও আছে। এই মাঠে ইন্টার স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট হতো। স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র শ্রীকান্ত আচার্য, স্কুলবেলায় খুব ভালো গোলকিপার ছিলেন। আসলে বাচ্চাদের বড়ো হওয়ার সময় পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধুলা, গানবাজনা সবেরই প্রয়োজন আছে, যেটা এখন খুব একটা দেখা যায় না।”

স্কুলের ল্যাবরেটরি আগের তুলনায় অনেক ভালো হয়েছে বলে জানালেন সমিতবাবু। তিনি যখন স্কুলের সেক্রেটারি, সেসময়ই স্কুলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অডিটোরিয়াম তৈরি হয়েছিল। তখন সবে সবে রাজ্যের বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলিতে কম্পিউটার শিক্ষার প্রচলন হয়েছে। সেই সময়ই যোধপুর পার্ক বয়েজ দেশের মধ্যে কম্পিউটার শিক্ষায় প্রথম হয়েছিল। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের হাত থেকে দিল্লিতে গিয়ে সমিতবাবুই স্কুলের হয়ে সেই পুরস্কার নিয়েছিলেন। এটা তাঁর গর্ব, জীবনের একটা স্মরণীয় মুহূর্ত। 

দিল্লিতে এপিজে আব্দুল কালামের হাত থেকে কম্পিউটার শিক্ষায় দেশের সেরা স্কুলের পুরস্কার নিচ্ছেন ডাঃ সমিত ঘোষ

স্কুলের বিস্তীর্ণ খেলার মাঠ, অডিটোরিয়াম, স্মার্ট ক্লাস রুম, কম্পিউটার এবং বিজ্ঞান পরীক্ষাগার – এই সবকিছু নিয়েই যোধপুর পার্ক বয়েজ প্রতিটি ছাত্রের জন্য সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ প্রদান করতে সহায়ক হয়ে উঠেছে। ছাত্রদের শিক্ষাদানের এই প্রক্রিয়াগুলিকে আরও কার্যকর ও বাস্তবোচিত করতে স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের এবং সমাজের প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের পরামর্শ এবং প্রতিক্রিয়াকে সম্বল করে এগিয়ে চলেছে বলেই জানান স্কুলের প্রধান শিক্ষক। 

___________________

তথ্য সূত্র: 
অমিত সেন মজুমদার, প্রধান শিক্ষক, যোধপুর পার্ক বয়েজ স্কুল

রবীন্দ্রনাথ সোম, প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক

ডাঃ সমিত ঘোষ, প্রাক্তন ছাত্র ও প্রাক্তন সেক্রেটারি, যোধপুর পার্ক বয়েজ স্কুল

ছবি: সংগৃহিত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।           

Developed by DXDasia