যদি চোখ যায় ওই ফলকটির দিকে তবে হয়তো সে খানিকটা ইতিহাসের পথেই বিচরণ করল।

আমাদের শহর কলকাতা, তার গায়ে জড়িয়ে আছে অজস্র ইতিহাস, কত কথা- কত কাহিনী। কিন্তু সে সবের হদিস রাখা, বিশেষ আমাদের খুব একটা হয়ে ওঠে না। হবেই বা কেমন করে? কারণ এই ইতিহাস তো কেবলমাত্র ঘরবাড়ির দেওয়ালের গায়ে লেখা থাকে না। তার দেওয়াল লিখন পরিণত হয় আরও অন্য অনেক জায়গায়। কোথাও একটা খিলানে, কোথাও বা একটা তেল রঙয়ের ছবিতে। কোথাও বা ইতিহাস পরিণত হয় টিনের বা এনামেলের পাতের গায়ে। এমনকী শহরের এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মান্ধাতার আমলের গৌরবময় কামানগুলির শরীরেও লেখা রয়েছে কলকাতার ইতিহাস। আসলে এইগুলির ভিতরেই জড়িয়ে গিয়েছে হেরিটেজ নামক শব্দটির বিরল গৌরব। তা আমাদের খুব একটা দেখা হয়ে ওঠে না। এই যেমন- উত্তর-মধ্য কলকাতার অক্রুর দত্ত লেন, যা গিয়ে মিলেছে রমানাথ কবিরাজ লেন-এ। দু’পাশে কিছু সরু গলি। এরকমই এক গলির বেশ খানিকটা ভিতরে একটি বাড়ির দেওয়ালের গায়ে নীল এনামেলের বা টিনের পাতে সাদা অক্ষরে লেখা ‘জেলিয়াপাড়া লেন।’ নিছকই একটি নাম। দেখে শুনে মনে হয় যেন এখানে যারা বসবাস করতেন তাঁরা আসলে পেশায় ছিলেন মৎস্যজীবী। কিন্তু এই মৎস্যজীবীদের জীবন প্রণালীর আড়াল থেকেই উঠে এসেছিল দেশের মানুষকে সামাজিক ভাবে সচেতন করার নতুন প্রয়াস। এরা শুধুমাত্র মাছ ধরতেন না কিংবা শুধুমাত্র জাল বুনতেন না। এসবের অবসরে তাদের প্রত্যেকের অন্তরে লুকিয়েছিল একেকজন সমাজকবি। সেকেলে হিসেবে- এই অঞ্চল জেলে-কৈবর্তদের আদি নিবাস। কিন্তু বর্তমানে ‘জেলিয়াপাড়া’ নামটি বেঁচে আছে শুধুমাত্র ওই লোহার পাতেই। শহুরে রাস্তার নিত্যনতুন নামকরণে হারিয়ে গিয়েছে এই পেশা-নির্ভর রাস্তার নামটি। তল্লাটটি ভাগাভাগি হয়েছে অক্রুর দত্ত লেন, রমানাথ কবিরাজ লেন, নেবুতলা ইত্যাদি ছোট-ছোট অঞ্চলে।

‘জেলিয়াপাড়া’ নামটি আমাদের টেনে নিয়ে যায় এক লৌকিক ইতিহাসের কেন্দ্রস্থলে। তা জেলেপাড়ার সঙ-এর ইতিহাস। এই সঙের চেহারা, ঢং, গানের কলি, কাঁসারীপাড়া খিদিরপুর-সহ অন্যান্য জায়গার সঙের থেকে অনেকটাই আলাদা। কোথাও জেলিয়াপাড়া কথার মারপ্যাঁচে আলাদা, কোথাও জেলিয়াপাড়ার নিজেদের বক্তব্য প্রকাশের রঙ-ঢঙে আলাদা। এই অঞ্চল তার স্পষ্টবাক বক্তব্যের জন্য কেড়ে নিয়েছিল সকলের নজর। এঁরা হিরণ্যকশিপু, গৌর-নিতাই সেজে, কিংবা নরসিংহের রূপ দেখিয়ে আবেগে কাঁদান না মানুষকে। এঁদের ঝোঁক ছিল সমাজের অনাচার আর দুর্নীতির ওপর কষাঘাতের দিকে। বাংলা ১৩২০ নাগাদ জেলেপাড়া সঙের আবির্ভাব। আর এই অঞ্চলের ‘বালকনাথ’ (শিব)-এর মন্দির ঘিরে চৈত্র সংক্রান্তির আগে থেকেই শুরু হত ‘মহলা’। লেখা হত পালা ও গান। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়ঃ রূপচাঁদ পক্ষী, ‘রসরাজ’ অমৃতলাল বসু, দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্র পণ্ডিত, সজনীকান্ত দাস, হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, কবিশেখর কালিদাস রায় সকলেই গান লিখেছিলেন জেলেপাড়ার সঙ-দের জন্য। তা ছাড়া স্থানীয় কবিরা তো ছিলেনই। সকলেরই উদ্দেশ্য ছিল সমাজ সমালোচনা। তেমন জেলেপাড়ার সঙদের গানের একটা কলিকে একটু বুঝিয়ে বলা যাক। কলিটি হল- ‘বিদ্যার মন্দিরে এ সিঁদ কেটেছে কোন চোরে/ সখীরা নেকী নাকি পড়লো ফাঁকি/ কেউ দেখেনি ঘুমের ঘোরে/ বিদ্যা সর্ব্ববিদ্যা অধিকারী/ দেবের প্রসাদে গুমোর গো ভারী…/ বিদ্যা নিত্য পূজে আশুতোষে।’ রসিকরা বুঝতে পেরেছিলেন এ গানের আড়ালে বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন উপাচার্য দেবপ্রসাদ সর্বাধিকারী থেকে শুরু করে স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সকলকেই ব্যঙ্গ করা হচ্ছে।

এই যে ইতিহাস জেলে-কৈবর্ত আবিষ্কার করেছিল সেই কারণেই কিন্তু জেলেপাড়ার এত সুখ্যাতি। সেই সুখ্যাতির প্রাচীন স্থাননামটুকু আজ রয়ে গিয়েছে এই এক ফালি টিনের ফলকে। ঘুরতে ঘুরতে লোকের সেটা চোখে পড়তেও পারে আবার নাও পড়তে পারে। কিন্তু ইতিহাস নীরব হয় না। আজও নিস্তব্ধ দুপুরে কারও যদি চোখ যায় ওই ফলকটির দিকে তবে হয়তো সে খানিকটা ইতিহাসের পথেই বিচরণ করল। এই ধরণের অলিগলি পথ বা রাস্তাকে বলতে ইচ্ছা হয় স্মৃতির সরণি।

Post Tags
Developed by DXDasia