লাইনে দাঁড়াতে হবে ২০ কোটি ঘণ্টা
পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলের প্রাথমিক ধাপ অনেক আগেই পেরোনো গেছে। তার পর কয়েক বছর কেটেও গেল। মাঝে মাঝেই কেন্দ্রের গড়িমসির কথা শোনা যাচ্ছে। সেই সব বাধা কেটে গেলে শুরু হবে আসল কাজ। এই সব নিয়ে যখন সরকার বেশ নাজেহাল, তখন শোনা গেল, সরকারের মেন্টাল হসপিটাল থেকে নাকি এক চিকিৎসাধীন ইঞ্জিনিয়ার সরকারকে একটি চিঠি দিয়েছে। সেই চিঠি আমাদের দফতরে এসে পৌঁছেছে। তা এখানে হুবহু তুলে দেওয়া হল।
‘স্যার, শুনেছি রাজ্যের নাম বদলাচ্ছে। এই নিয়ে আমার কিছু নিবেদন আছে সরকারের কাছে। কথাটা খুলেই বলি। প্রথমে আসা যাক মোছামুছির ব্যাপারটায়। আপনাদের সবারই নিশ্চয় চোখে পড়েছে, গোটা রাজ্য জুড়ে নানা ভাবে পশ্চিমবঙ্গ লেখা আছে। আগে যদি জানা থাকত এক দিন নাম বদলানো হবে, তাহলে হয়তো এত কিছু লেখা থেকে মানুষ বিরত থাকত। কিন্তু সে কথা তো আর কারও জানা ছিল না। ফলে এখন হ্যাপা সামলানো ছাড়া আর কোনও পথ নেই। কোথাও লেখা শুধুই ‘পঃবঃ’। কোথাও লেখা ‘পঃবঃ সরকারের আদেশানুসারে’। কোথাও আবার লেখা আছে দেখছি, ‘পঃবঃ সরকারের পক্ষে জনস্বার্থে প্রচারিত’। এমনি কত রকমের পঃবঃ যে রাজ্য জুড়ে লেখা, তার হিসেব কে রাখে! কিন্তু তা বললে তো হবে না! ওই হিসেব এবার রাখতে হবে।কারণ, নাম বদলে এই বঃ রাজ্যকে পঃ-শূন্য করার সময় এসেছে এত দিনে।ফলে, ‘পঃ’ কাটতে কত সময় লাগবে, আর তার খরচই বা কত, তার একটা হিসেব খুবই জরুরি হয় পড়েছে।
আসুন আমরা ‘বঃবাসীরা’ প্রথমে পঃ বিদায়কে স্বাগত জানাই। গোটা রাজ্যে পঃবঃ কত যায়গায় লেখা আছে? তা ধরুন রাউন্ড ফিগারে ধরলে ১০ লক্ষ হতে পারে। খুঁজলে আরও দু’চারটে বাড়তেও পারে। সেই ১০ লক্ষ পঃ মুছতে হবে। কিন্তু মুছতে হলে প্রথমে তো ঠিক করতে হবে কী রং দিয়ে মোছা হবে? এটাই সব থেকে বড় পলিটিক্যাল কোয়েশ্চেন। নীল না সাদা, না কি নীল-সাদা রং দিয়ে! তার পর আছে রং কেনা। সেটা কম কথা নয়। সরকারের কোনও দফতরকে হয়তো মুছতে হবে মাত্র তিনটে পঃ। কিন্তু তাই বলে তো আর সরকার দোকানে গিয়ে বলতে পারে না এক চামুচ রং দেবেন ভাই তিনটে পঃ মুছব! সরকার কি ভিখারি নাকি! ফলে অন্তত এক লিটার রং কিনতেই হবে। যদিও তার প্রায় সবটাই তিন পঃ নিকেষ করার পর আর কোনও কাজে লাগবে না, কিন্তু কিছু করার নেই। এক লিটার রং-এর দাম কত? কম বেশি ৩০০ টাকা। তাহলে ১০ লক্ষ পঃ মোছার রং-এর খরচ মোটামুটি ওই গিয়ে দাঁড়াবে ২০-৩০ কোটি। আরও সমস্যা আছে। সব পঃ তো আর এক জায়গায় সার বেঁধে লেখা নেইরে বাবা। একটা এখানে তো পরেরটা দু’মাইল দূরে। তার পরেও কথা আছে। প্রথম পঃ-টা যদি স্বাস্থ্য দফতরের নোটিসের হয়, পরেরটা হয়তো দেখা যাবে পূর্ত বিভাগের সতর্কবাণী। স্বাস্থ্যের নিয়োগ করা কর্মী তো আর পূর্তের পঃ মুছতে পারে না। সেটা ভালোও দেখায় না। তা ছাড়া সেটা অনেকটা অমুকের দফতরে তমুকের হস্তক্ষেপ বলে গণ্য হতে পারে। একটা পঃ মোছার পর যদি দেখা যায় আর কোনও মোছার মতো পঃ ধারে পাশে নেই, সে ক্ষেত্রে ওই কর্মীকে দিয়ে ফাইল-টাইল ঝাড়িয়ে নিতে হবে। কিন্তু তাকে তো এক দিনের ন্যূনতম মজুরি, ধরা যাক ২৫০টাকা, সেটা তো দিতেই হবে। তো এক জন গড়ে ১০টা করে পঃ মুছলে এক লক্ষ কর্মী চাই ১০ লক্ষ পঃ মোছার জন্য। ১ লক্ষ কর্মীর এক দিনের মজুরি হবে আড়াই কোটি টাকা। এর পর অবশ্য আছে কয়েক লক্ষ বাস, ট্রাক, ট্যাক্সি, অটো, বাইকের নম্বর প্লেটের ‘ডব্লিউ বি’-এর ‘ডব্লিউ’ মোছার গল্প। তার পর তো আছে ব্লুবুক, ট্যাক্স টোকেন, ড্রাইভিং লাইসেন্সের ‘ডব্লিউ’ হটানোর অভিযান। জানা গেছে এই সব কর্মকাণ্ড দেখা শোনার জন্য সরকার নাকি এক জন উচ্চ পঃদস্থ আমলাকে দায়িত্ব দেবে। এর পর আসবে ফর্ম সংশোধনের পালা। হাজার রকম ফর্ম আমরা নেটে ফিলআপ করি। সেখানে স্টেট অপশনে ক্লিক করলে অন্য অনেক রাজ্যের নামের সঙ্গে ওয়েস্টবেঙ্গলও বেরিয়ে আসে। এসব সরকারি বেসরকারি ইন্টারনেটের ইংরেজি পঃ-কে মানে ওই ওয়েস্ট বেঙ্গলের ওয়েস্টকে কী ভাবে পালটাতে হবে কে জানে!
তবে এসব তো গেল ছোট-খাটো ব্যাপার নিয়ে কথা। কিন্তু এর পর আসবে ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, আধার, পাশপোর্ট, গ্যাসের বই, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের পঃ বা ডব্লিউ বিদায়ের পর্ব। রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড কত জনের আছে? ধরা যাক কম করেও ৫ কোটি। মানে পাঁচ কোটি বাঙালিকে এসব কাটাকাটি করতে লাইনে দাঁড়াতে হবে। পাঁচ কোটি বাঙালি লাইন করে দাঁড়ালে অন্তত পাঁচ কোটি ফুট লম্বা একটা লাইন হবে। অর্থাৎ ১৮,৯৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন। পৃথিবীর ব্যাসের প্রায় দেড় গুণ। যা চিনের প্রাচীরের দৈর্ঘের (৮৮৫২ কিমি) দ্বিগুণেরও বেশি। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, সবাই এক সঙ্গে লাইনে দাঁড়াবে না। এই সব কার্ড বদল করতে কতক্ষণ লাইনে দাঁড়াতে হবে? ধারণা থেকেই বলা যায় জন প্রতি কম করেও সব মিলিয়ে ৪ ঘণ্টা। অর্থাৎ ৫ কোটি মানুষ মোট ২০ কোটি ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াবে। ২০ কোটি ঘণ্টা মানে, নাম বদল করতে সময় লাগবে ২২ হাজার ৮৩১ বছর। সোজা কথা নয়’।
জানা গিয়েছে, এই চিঠি সরকারি দফতরে পৌঁছনোর পর সরকার থেকে নাকি ওই মেন্টাল হসপিটালে ফোন করে বলা হয়েছে, এই লোকটিকে যেন সহজে ছেড়ে না দেওয়া হয়।