
উপেক্ষায় অবহেলায় যেন অনেক দূরে চলে গিয়েছেন ‘আরণ্যক’-এর লেখক
গত শতাব্দী থেকে এই শতাব্দীর মাঝে ঠিক কতগুলি বছর? ঠিক একশো বছরই কি? অঙ্কের হিসেবে নিশ্চয় তাই। কিন্তু কেবলি মনে হয়, সেসব যেন বহু বহু শতাব্দীর পুরোনো আমল। আজকের সঙ্গে তার দূরত্ব অনেক। মাত্র একশো বছরেই এতটা বদলে গেল চারপাশ, যে অতীতের ছিটেফোঁটাও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল প্রায়। ঘাটশিলায় বিভূতিভূষণ-এর বাড়ি ঘুরে এমনটাই মনে হল খুব। উপেক্ষায় অবহেলায় যেন অনেক দূরে চলে গিয়েছেন ‘আরণ্যক’-এর লেখক। মাঝে যেন কয়েকশো বছর।
বাড়িটির নাম গৌরীকুঞ্জ। গৌরীদেবীর নামে বাড়ি। স্বল্প পরিসরের একটুকরো জমিতে তৈরি। তিরিশের দশক থেকে ঘাটশিলার সঙ্গে ক্রমশ নিবিড় হয়েছিল বিভূতিভূষণের যোগাযোগ। গৌরীকুঞ্জে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে পড়ে আছে তাঁর বেশকিছু চিঠিপত্র। তাঁর ব্যবহৃত কিছু পোশাক। দু-একটি দ্রব্যসামগ্রী। ঘরের ভিতর আলো-পাখার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। ঢোকার মুখে দেওয়ালে বড়ো বড়ো করে লেখা কোন মহান লেখকের নিবাস ছিল এটি। রয়েছে অনুদানের বাক্স। রয়েছে বিভূতিভূষণের বইগুলি। সামনের সামান্য ঘাসজমিতে স্থানীয় কচিকাঁচারা ছুটোছুটি করে দুপুর পেরোলে। আর আছে একটি মঞ্চ ও ‘অপুর পাঠশালা’ নামে ছোট্ট বাংলা ইস্কুল। সমস্তটাই চলে প্রায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে। কিছু মানুষ নিজস্ব তাগিদে অনুদান দেন। স্থানীয় কয়েকজন নিজের থেকে দায়িত্ব নিয়ে বাড়িটি দেখাশোনা করেন। সরকারি সহায়তা আপাতত সম্পূর্ণ বন্ধ। বাঙালি পর্যটকরা অবশ্য অনেকেই যান। গিয়ে মনঃক্ষুণ্ন হন। হয়তো বিভূতিভূষণের বাড়ির দুরবস্থা দেখে। আর নয়তো দেখার মতো কিচ্ছুটি না-পেয়ে।
অবশ্য সে বাড়ি ঘুরলে আরেকটি জিনিস চোখ টানবেই। বিভিন্ন জায়গায় বাংলাভাষা বাঁচিয়ে রাখার দাবিতে পোস্টার। ছোটো বাচ্চাদের আঁকা। লেখা। বাড়িটির দেখাশোনা করেন যারা, তাদের গলায় ক্ষোভ ঝরে পড়ে- “ঘাটশিলায় এখনো সত্তর শতাংশ বাঙালি জানেন? অথচ দেখুন, সরকার সব বাংলা স্কুলগুলো তুলে দিয়ে হিন্দি করে দিচ্ছে। দু-একটা বাংলা স্কুল যা আছে, তাতেও বাংলা পড়ানো বন্ধ করার তোড়জোড় চলছে।” অনেক কষ্টে এই বাড়িটা তারা রেখেছেন। নাহলে এটাও হয়তো…
দীর্ঘশ্বাসে বাক্য সম্পূর্ণ করেন ভদ্রলোক।
একদা জীবনধারণের প্রয়োজনে খেলাত ঘোষ এস্টেটের চাকরি নিয়ে কলকাতা ছেড়েছিলেন বিভূতিভূষণ। ছোটোনাগপুর মালভূমির লবটুলিয়া বইহার তখন তাঁর কর্মক্ষেত্র। জঙ্গল ঢেউ-খেলানো টিলাপথের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গভীর। ঘাটশিলার সঙ্গে যোগাযোগ নিবিড় হওয়ার পর সুযোগ পেলেই সেখানে পৌঁছে যেতেন। বিশেষ করে যেতেন শরৎকালে। সঙ্গে যেতেন লেখকবন্ধুরা। নির্জন টিলায় বসে নাকি সাধনা করতেন। সুবর্ণরেখার তীরে, রাতমোহনায় বসে কেটে যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
আজকাল অবশ্য মরে এসেছে সুবর্ণরেখার জল। সেই জল বা স্রোত কিচ্ছুটি নেই। একসময় বাঙালির প্রিয়তম জায়গা ছিল ঘাটশিলা। আজও চোখে পড়ে, রাস্তায় গলিতে আনাচে-কানাচে বাঙালি বাড়ির অবশেষ। করুণা ভবন, শিবানি আলয়- বাংলায় লেখা নাম, বাড়ির নম্বর। লোকে বলে বাঙালির নাকি উপনিবেশ ছিল সেসব অঞ্চল। কিন্তু একথা মানতেই হয়, সেই উপনিবেশ ছিল পরিপূর্ণ সাংস্কৃতিক। বাংলা সাহিত্যকে সেসব টিলামোড়া পথঘাট, ছায়ামারীচের উপত্যকা অনেককিছু দিয়েছে।
পুরোনো দিনের সেসব স্মৃতিকথা থেকে ঘাটশিলা আজ মুক্ত। বিভূতিভূষণের বাড়ি সেখানে একলা দাঁড়িয়ে থাকে৷ স্টেশনে বাংলায় লেখা ‘ঘাটশিলা’-র ওপরে পড়ে রঙের পোঁচ। এখন দেখার অপেক্ষা, বাংলাবিহীন ঘাটশিলা অঞ্চলে কোন নতুন সভ্যতা মাথা তুলে দাঁড়ায়। আর তাতে সেই অঞ্চল কতটাই বা ফলদায়ী হয়ে ওঠে। দেখা যাক!
