November 2, 2017 | 8:20 PM

রবীন্দ্রনাথ ও এইচ জি ওয়েলস-এর সাক্ষাৎকার

১৯৩০-এর জুন মাসের কথোপকথন

রবীন্দ্রনাথ ও কল্পবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ এইচ.জি. ওয়েলস-এর সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে জেনেভায়। সেই সাক্ষাৎকারের সংক্ষিপ্ত রূপ এখানে উপস্থাপিত হলো।

রবীন্দ্রনাথ: আধুনিক সভ্যতার একটি প্রবণতা হচ্ছে বিশ্বকে সমরূপবিশিষ্ট করা। কলকাতা, বোম্বে, হংকং এবং অন্যান্য আরো কিছু শহর কমবেশি একই রকম। এমন একটি বড় মুখোশ পরে আছে যে, কোনো দেশকেই আলাদা করে চেনা করা যায় না।

ওয়েলস: এখন কি আপনার মনে হয় না যে, এ নিগূঢ় সত্যটি একটি ইঙ্গিত দেয় যে, আমরা একটি নব্য বিশ্বজনীন মানবীয় সুবিন্যস্ততায় পৌঁছতে চাইছি, যা স্থানীয়করণ হতে অস্বীকার করে?

রবীন্দ্রনাথ: আমাদের স্বতন্ত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অভিন্ন হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। মনটাকে সর্বজনীন হতে হবে। স্বাতন্ত্র্যকে বিসর্জন দেয়া যাবে না।

ওয়েলস: এখন আমরা ক্রমান্বয়ে চিন্তা করছি এমন একটি মানবীয় সভ্যতার কথা, যার স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তি হবে পরিপূর্ণতার অপার সুযোগ। আমাদের দৃষ্টিতে স্বাতন্ত্র্যের ত্রুটি হচ্ছে এই যে, সভ্যতা টুকরো-টুকরো হয়ে পৃথক-পৃথক এককে পরিণত হয়েছে। বিশ্বজনীন সম্পূর্ণতায় তা আর অঙ্গীভূত হয় নি। মানবজাতির স্বাভাবিক পরিণতিও তা-ই হবে বলে আমার মনে হয়।

রবীন্দ্রনাথ: আমি বিশ্বাস করি, বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে পারস্পরিক সহভাগিতা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়েই মানবসভ্যতা উত্তরোত্তর উন্নতি লাভ করতে পারে। আপনি কি মনে করেন, একটি সাধারণ সম্প্রদায় বা মানবজাতি-সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে?

ওয়েলস: আমরা পছন্দ করি বা না-ই করি, একটি সাধারণ ভাষা মানবজাতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আগে উঁচুমনের কোনো সম্প্রদায় নতুন-নতুন ভাষা সৃষ্টি করত। এখন আমাদের জন্য আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি বিশ্বজনীন ভাষা পরিগ্রহণ করা।

রবীন্দ্রনাথ: আমি এই বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত। পাঁচ মাইল দীর্ঘ কথার যুগ ক্রমশ নিঃশেষিত হচ্ছে। নিবিড় যোগাযোগও প্রতিষ্ঠা করতে পারে একটি প্রচলিত বা সাধারণ ভাষা। এই সাধারণ ভাষাটি জাতীয় ভাষা-বহির্ভূত না-ও হতে পারে। তারপরেও একটি কৌতূহল থেকে নয়, মানবমনের ক্রমববর্ধিষ্ণুতার সঙ্গে সঙ্গে সকল স্থানে জাতীয় আত্ম-সচেতনতার উন্নয়ন হচ্ছে অথবা জাতীয় ভাষার পুনর্জাগরণ হচ্ছে। আপনার কি মনে হয় না যে, আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা থাকা সত্ত্বেও ইংরেজি ভাষার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সংশোধন ও পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে?

ওয়েলস: আমার আশ্চর্য লাগছে যে ব্যাপারটি এখনো ঘটছে। ৪০ বা ৫০ বছর আগে এটি ঘটতে পারত, কিন্তু এখন সাহিত্য এবং সাধারণ কথ্য ভাষার ক্ষেত্রে ইংরেজি ও আমেরিকানদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা ক্রমশই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে অন্যান্য দিকেও আরো বেশি প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এখন আমরা শব্দ-রূপান্তরের ক্ষেত্রে বাস্তব পদ্ধতি প্রয়োগ করছি। অনুবাদ একটি বিরক্তিকর কাজ। একটি কবিতা অনুবাদ করে দেখুন – এতে কি কবিতাটির স্বকীয়তা অনেকখানি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে না? একই সময় সব মানুষের কাছে যদি একে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারেন, তবে সেটি হবে প্রকৃত অর্থেই চমৎকার।

রবীন্দ্রনাথ: বিভিন্ন দেশের সংগীতের রয়েছে একটি সাধারণ মনোবৈজ্ঞানিক ভিত্তি। কিন্তু এর অর্থ এ-ই নয় যে, জাতীয় সংগীতের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। আমার মতে, এই একই ব্যাপারটি সম্ভবত সত্য সাহিত্যের ক্ষেত্রেও।

ওয়েলস: আধুনিক সংগীত এক দেশ থেকে আরেক দেশে পরিভ্রমণ করছে কোনোরূপ ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই – পারসেল থেকে বাক, তারপর ব্রাহ্মস্, রাশিয়ান এবং তারপর প্রাচ্যে। বিশ্বের সবকিছুর মধ্যে সংগীত হচ্ছে সবচেয়ে আন্তর্জাতিক।

রবীন্দ্রনাথ: এ যুগের উপযোগী মনস্তাত্ত্বিকতা আমাদের সৃষ্টি করে নিতে হবে। সভ্যতার নতুন প্রয়োজন ও পরিস্থিতির সঙ্গে আমাদের নিজেদের সমন্বয় করে নিতে হবে।

ওয়েলস: সমন্বয়, চরম সমন্বয়!

রবীন্দ্রনাথ: আপনি কি মনে করেন যে, এক্ষেত্রে কোনো মৌলিক জাতিগত সমস্যা রয়েছে?

ওয়েলস: না। নতুন-নতুন জাতি সৃষ্টি হচ্ছে এবং পুনরাবির্ভূত হচ্ছে। অনন্ত এ গতিধারা। প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকেই জাতি-মিশ্রণের এ ব্যাপারটি চলে আসছে। ভারত এর সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বর্ণপ্রথা ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও জাতি-মিশ্রণের ব্যাপারটি বর্তমান।

রবীন্দ্রনাথ: এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে জাতি-গৌরবের ব্যাপারে। ;শিক্ষা কখনো ক্ষতি বয়ে নিয়ে আসে না,পাশ্চাত্য কি সম্পূর্ণভাবে প্রাচ্যকে স্বীকার করে নিয়েছে? পারস্পরিক গ্রহণযোগ্যতা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে আমি সেই দেশটির জন্য খুব দুঃখিত হবো, যে দেশটি অন্য দেশের সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে? যদিও ড. হাস ও অঁরি মাতিসের মতো ব্যক্তিরা মনে করেন যে, প্রাচ্য-মনের উচিত নয় প্রাচ্য-দেশের বাইরে যাওয়া আর তাহলেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

ওয়েলস: পাশ্চাত্যের আধিপত্য সম্ভবত গত একশ বছরের ঘটনা। লেপান্টোর যুদ্ধের আগে তুর্কিরা পাশ্চাত্যকে শাসন করত। তুর্কিদেরকে এড়ানোর জন্য কলম্বাসের সফরের আয়োজন করা হয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথ: ঊনবিংশ শতাব্দীর শরীরবিজ্ঞান সম্ভবত পাশ্চাত্যে জাতি-প্রাধান্যের এই ব্যাপারটি সৃষ্টি করেছে। শরীরবিজ্ঞান ব্যাপারটি যখন প্রাচ্যের আত্তীকরণ হলো, তখন সেই স্রোত পরিবর্তিত হয় এবং স্বাভাবিক গতিধারা লাভ করে।

ওয়েলস: আধুনিক বিজ্ঞান আসলে ইউরোপীয় নয়। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যেসব উদ্ভাবন ও আবিষ্কার সংঘটিত হয়েছে – কিছু দুর্ঘটনা ও অদ্ভুত পরিস্থিতির কারণে প্রাচ্যের লোকেরা তা প্রয়োগ করতে পারে নি। বর্তমানে জাপানি, চৈনিক এবং ভারতীয়রা বিশ্ববিজ্ঞানে যথাযথ স্বীকৃতি পাচ্ছেন।

Developed by DXDasia