‘আজ হইতে পি.সি. সরকার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হইলেন’

১৯৩৭ সালে ২৪ বছর বয়সে তিনি সর্বপ্রথম জাপানে যান

বাংলায় জাদুবিদ্যার ইতিহাস অতি প্রাচীন। তখন থেকে আজ পর্যন্ত জাদুর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যে ক’জন সেরা জাদুকরের নাম করা যাবে, তাঁদের মধ্যে যিনি সর্বশীর্ষে, তাঁর নাম জাদুসম্রাট প্রতুলচন্দ্র সরকার, যিনি বিশ্বের কোটি কোটি জাদুপ্রিয় মানুষের কাছে পি.সি. সরকার নামেই সর্বাধিক পরিচিত। জাদুর ইতিহাসে যিনি এক কিংবদন্তি পুরুষ। তিনি যখন সপ্তম/অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, তখন থেকে মজার মজার জাদুর খেলা দেখিয়ে সবাইকে অবাক করে দিতেন। বাল্যকাল থেকেই তিনি পাঠ্যপুস্তুকের পাশাপাশি জাদুর বইও পড়তে শুরু করেন। স্কুলের লাইব্রেরিতে জাদু শেখার ওপর যত বই ছিল, সব পড়ে শেষ করেন প্রতুল। প্রথম শ্রেণিতে ম্যাট্রিক পাস করার পর ভর্তি হন করটিয়া সাদত কলেজে। তখন কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন বিখ্যাত লেখক ও শিক্ষাবিদ ইব্রাহিম খাঁ। কলেজে এসেও চলল জাদুর ওপর পড়াশোনা আর ম্যাজিকের চর্চা। সারা কলেজে তখন তাঁর প্রচুর নাম ডাক। চায়ের দোকানে, খেলার মাঠে সকলের মুখে মুখে প্রতুলের অদ্ভুত জাদুর খেলার প্রশংসা। ১৯৩৭ সালে ২৪ বছর বয়সে তিনি সর্বপ্রথম জাপানে যান। সেখানে জাদুর খেলা দেখিয়ে প্রচুর সুনাম ও অর্থ উপার্জন করেন। এরপর কলকাতায় পাড়ি জমান। প্রথমে ওঠেন ভাড়া বাড়িতে। পরে নিজেই বাড়ি করেন কলকাতার বালিগঞ্জে। অল্পদিনের মধ্যেই কলকাতা শহরে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। নিয়মিত জাদুর অনুষ্ঠান করতে লাগলেন, আর সেই সঙ্গে পত্রপত্রিকাতেও শুরু করলেন জাদু বিষয়ে লেখালেখি। দু’দিকেই তাঁর খ্যাতি বাড়তে লাগল।

তাঁর জাদু নিয়ে মাঝেমধ্যে মজার মজার কাণ্ড উল্লিখিত আছে বিভিন্ন বইতে। অবিভক্ত বাংলাদেশের মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হকের সময় তখন। মন্ত্রীসভার এক নৈশভোজে আয়োজন করা হয়েছিল পি.সি. সরকারের জাদুখেলার। খেলাটির শিরোনাম ছিল বাংলার মন্ত্রীমণ্ডলীর পদত্যাগ। অনুষ্ঠিত হয়েছিল কলকাতার ইম্পেরিয়াল রেষ্টুরেন্টে। মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হকের হাতে এক টুকরো সাদা কাগজ দিয়ে কিছু লিখতে বললেন। হক সাহেব তাঁর কথামতো কিছু লিখলেন। তারপর তাঁর মন্ত্রীসভার সদস্যরা সেই লেখার নিচে স্বাক্ষর করলেন। এবং স্বাক্ষরিত পত্রটি তিনি পড়তে দিলেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত পুলিশ কমিশনার মিঃ কলসনের হাতে। তিনি পড়তে লাগলেন, “আমরা সর্বসম্মতিক্রমে সকলে এই মুহূর্তে মন্ত্রীত্ব ত্যাগ করিলাম এবং আজ হইতে জাদুকর পি.সি. সরকার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হইলেন।”

সবাই বিস্ময়ে হতবাক। শেরে বাংলা অবাক হয়ে বললেন, তিনি তো এমন কোনও কথাই কাগজে লেখেননি। মন্ত্রীরাও বললেন তাঁরাও যে কাগজে সই করেছেন, তাতে এমন কোনও কথা ছিল না। তাহলে এমন হল কী করে? আসলে এমনটাই ছিল পি.সি. সরকারের খেলা। এটা ছিল ফোর্স রাইটিং-এর জাদু। পরেরদিন বেশকিছু পত্র-পত্রিকায় এই রসিকতাপূর্ণ উচ্চমানের জাদুখেলার খবরটি ছাপা হয়েছিল বেশ ফলাও করে।

জাদুসম্রাট পি.সি. সরকারের একটি বড়ো বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি জাদু দেখানোর সময় পরিধান করতেন ভারতীয় রাজা মহারাজাদের পোশাক। দর্শকদের মধ্যে চমক সৃষ্টি করার জন্যই বোধহয় এমনটা করতেন। তাঁর এই রাজকীয় পোশাক নিয়ে একবার এক মজার কাণ্ডও ঘটেছিল। জনৈক ব্রিটিশ জাদুকর তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করার জন্য বলেছিলেন, 
“Why you wear Princely costume? You are not of Royal birth.” 
পি.সি. সরকার মৃদু হেসে বলেছিলেন, “Am I not the Prince of Magic?”

(তথ্যঋণ – সেতুবন্ধন)

Developed by DXDasia