গুজরাতে রাহুলের জাতপাতের তাস বুমেরাং হবে না তো?

রাহুল কিন্তু নিশ্চিতভাবেই চেষ্টা করছেন সংখ্যাটা কমানোর

কংগ্রেস এবার গুজরাতে মরিয়া হয়ে নেমেছে। রাহুল গান্ধী নিজেই বলেছেন, তাঁরা ‘ভাল ফল’ করবেন। জিতবেন, এমন কথা বলেননি। এই বক্তব্যের মধ্যে একটা বুদ্ধিমত্তার ছাপ রয়েছে। ভাল বলতে ভোটের শতাংশ বা আসন বাড়ানোও বোঝায়। গত লোকসভা ভোটের সময় বিজেপি গুজরাতে ভোট পেয়েছিল ৬০ শতাংশ। উত্তরপ্রদেশের মতো গুজরাতেও বিধানসভার ভোটে লোকসভার পুনরাবৃত্তি হলে ১৮২–র মধ্যে অন্তত ১৬০ পেয়ে যাবে বিজেপি। কিন্তু ইতিমধ্যে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। হরিজনদের ওপর অত্যাচার, সংরক্ষণের দাবিতে পাতিদার বা প্যাটেলদের আন্দোলনের মতো ঘটনাগুলো নরেন্দ্র মোদি–উত্তর গুজরাটের রাজনৈতিক চালচিত্রে কিছুটা ছাপ তো ফেলেছে। আনন্দীবেন প্যাটেলকে মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছে। কাজেই লোকসভার পুনরাবৃত্তি খুব, খুব কঠিন। হলে আশ্চর্য হওয়ার মতো ঘটনা বলেই ধরতে হবে। আর গত বিধানসভায় প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ আসন জিতেছিল বিজেপি। পেয়েছিল ১১৬। অক্টোবরের সমীক্ষাগুলো বলছে, ফল মোটের ওপর সেটাই হবে। রাহুল কিন্তু নিশ্চিতভাবেই চেষ্টা করছেন সংখ্যাটা কমানোর। পারলে, বলা যাবে রাহুল কিছুটা অন্তত সফল। 

লোকসভার সময় প্রশ্নটা ছিল একজন গুজরাতিকে দেশের প্রধানমন্ত্রী করার। কিন্তু বিধানসভায় তো মোদি নেই। তাঁর মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন অবশ্য আছে। তবে বিধানসভাটা মানুষের বেশি কাছাকাছি। কংগ্রেস নোটবাতিল, জিএসটি, এসব খুব বলে চলেছে। কিন্তু নোটবাতিলের প্রশ্ন তুলে কতটা কাজ হবে, জানা নেই। নোটবাতিলের তিন মাস পরে শুরু হয়েছিল উত্তরপ্রদেশের ভোট। চলেছিল একমাস ধরে। দেখা গিয়েছিল নোটবাতিলে ধাক্কা খায়নি বিজেপির জয়রথ। এখন তারসঙ্গে জিএসটি যুক্ত হয়েছে। সারা পৃথিবীতে যেদেশে যখন জিএসটি হয়েছে, এক থেকে দু বছর সরকারের জনপ্রিয়তা ধাক্কা খেয়েছে। এদেশেও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। আর গুজরাত তো বিশেষভাবে ব্যবসাযীদের জায়গা। কাজেই ৬০ শতাংশ থেকে ভোট ৫০ শতাংশে নামবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ৫০ শতাংশের মতো ভোট পেলে দুই–তৃতীয়াংশ আসন জিতে নিতে অসুবিধা হবে না বিজেপি’র।

রাহুল তাই নতুন একটা অস্ত্র খুঁজে নিয়েছেন। জাতপাতের তাস খেলতে চেষ্টা করছেন তিনি। পাতিদার আন্দোলনের নেতা হার্দিক প্যাটেল, অনগ্রসর শ্রেণীভুক্ত ঠাকোর নেতা অল্পেশ ঠাকোর আর দলিত নেতা জিগনেশ মেওয়ানিকে সঙ্গে পেতে উঠে পড়ে লেগেছিল কংগ্রেস। ঠাকোর কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। বাকি দু’জন এখনও ভাবছেন। গুজরাতের রাজনীতিতে জাতপাত একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। আটের দশকে জনতা পরিবারের আক্রমণ ঠেকাতে মাধব সিন সোলাঙ্কি জাতপাতের ‘খাম’ সমীকরণ তৈরি করে কংগ্রেসকে তিন–চতুর্থাংশ গরিষ্ঠতা এনে দিয়েছিলেন। খাম মানে ক্ষত্রিয়, হরিজন, আদিবাসী ও দলিতদের জোট। পরে অনগ্রসর রাজনীতির জোয়ার এসেছে দেশে। ফলে এখন বিভিন্ন জাতের মধ্যে সমীকরণ বদলে গিয়েছে। যেমন গুজরাতে ক্ষত্রিয়রা এসে গিয়েছেন অনগ্রসর তালিকায়। অল্পেশ ঠাকোর এই ক্ষত্রিয় সম্প্রদায়ের এক নেতা, যিনি এতদিন রাজনীতিতে ছিলেন না। তিনি ক্ষত্রিয় ও অন্যদের সামাজিক কল্যাণের জন্য কাজ করতেন। কংগ্রেস তাঁকেও নিতে চাইছে, আবার সংরক্ষণের দাবিতে সাড়া–ফেলা পাতিদার আন্দোলনের নেতা হার্দিক প্যাটেলকেও নিতে চাইছে। এখন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, গুজরাতে আর সংরক্ষণ দেওয়ার জায়গা নেই, কারণ তাহলে সংরক্ষণ ৫০ শতাংশ অতিক্রম করবে। উপায় একটাই, পাতিদারদের জোরজার করে অনগ্রসর তালিকায় ঢোকানো। সেই প্রতিশ্রুতি দিলে ক্ষত্রিয় সহ কমবেশি ৪০ শতাংশ অনগ্রসর মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবেন কংগ্রেস ওপর। না–দিলে কংগ্রেসে ঢুকে হার্দিক মুখ দেখাবেন কি করে? আর ১৫ শতাংশ প্যাটেল, যাঁরা এতদিন বিজেপির সঙ্গে ছিলেন, কেনই বা কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকবেন?

বিশ্বনাথপ্রতাপ সিং যখন মন্ডল কমিশন রিপোর্ট রূপায়ণ করে অনগ্রসরদের সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন, তখন কংগ্রেস ছিল ঘোর সংরক্ষণ–বিরোধী। তাঁরা বুঝতেই পারেননি, দেশের রাজনীতি কী ভাবে বদলে যাচ্ছে। এখন দেশ যখন ধীরে ধীরে কিছুটা হলেও জাতপাতের রাজনীতির বাইরে আসছে, তখন কংগ্রেস জাতপাত আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছে। কিন্তু জাতপাতের ভেতরকার সমীকরণ মনে হচ্ছে তাঁরা এখনও বুঝে উঠতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তাই জাতপাতের তাস বুমেরাং হয়ে ফিরে আসতে পারে। আর তা যদি হয়, তাহলে কিন্তু সমীক্ষাগুলো যা বলছে তা মিলে যাবে, এক–তৃতীয়াংশ আসনের বেড়া এবারও কংগ্রেসের টপকানো হবে না।

Developed by DXDasia