ইন্দিরা গান্ধিকে বাংলা পড়িয়েছিলেন রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার

ছাত্রজীবনে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী সভায় যোগ দেওয়ার কারণে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয় তাঁকে

একই নাম আর ডাকসাইটে প্রতিভা। বিশ শতকের দুজন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের কথা বলছি। একজন বিখ্যাত ছোটোগল্পকার, অন্যজন শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক এবং মূলত রবীন্দ্রজীবনীকার। দুজনেই রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য। আজকের কথকতা রবীন্দ্রজীবনীকারকে নিয়ে। রবীন্দ্রজীবনকথার চারটি খণ্ড তাঁকে অমর করেছে।

প্রভাতকুমারের আঠারো বছরের জন্মদিনে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে আশীর্বাদ করেছিলেন। তারপর আবার বাইশ বছরের প্রভাতকুমারকে জন্মদিনের আশীর্বাদ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ছন্দে গাঁথা অক্ষরমালা —

“প্রভাতের পরে দক্ষিণ করে/ রবির আশীর্বাদ — নূতন জনমে নব নব দিন/তোমার জীবন করুক নবীন,/ অমল আলোকে ধুয়ে হোক লীন/ রজনীর অবসাদ।” এই রবির আশীর্বাদের আলোর ঋণ অপরিশোধ্য। তবু প্রভাতকুমারের লেখা রবীন্দ্রজীবনী রবীন্দ্রনাথকেও নতুন করে প্রতিষ্ঠা দেবে পাঠকের মনে। এ-ও বড়ো কম কথা নয়। নদিয়ার রানাঘাটের একটি ছেলে কেমন করে বিশ্বভারতীতে এসে পৌঁছবে আর রবি ঠাকুরের জীবনী লিখবে, সেসব কথা ভবিষ্যতের গর্ভে লুকিয়েছিল কতদিন! ছাত্রজীবনে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী সভায় যোগ দেওয়ার কারণে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয় তাঁকে। তারপর কলকাতা জাতীয় শিক্ষাপরিষদের প্রবেশিকা পরীক্ষায় পঞ্চম স্থান অধিকার করেছিলেন প্রভাতকুমার। কিন্তু তারপর ভাগ্যের ফেরে এবং দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে আর কোনোরকম পরীক্ষায় বসতে পারেননি। কলেজে পড়তে পড়তেও মাঝপথে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে। ঠিক তখনই সতেরো বছর বয়সে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের কাজে যোগ দিয়েছিলেন প্রভাতকুমার।সেই থেকে আমৃত্যু শান্তিনিকেতনই ছিল তাঁর প্রাণের আরাম, মনের শান্তি। মানুষ আসলে নিজেও জানে না, এই ভুবনে কোন কাজ তার জন্য নির্দিষ্ট করা আছে। নিয়তি তাকে যেকোনো উপায়ে লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যায়। সময় তাকে দেয় সুযোগ। আয়ুর প্রান্তে এসে জীবনের মালা যখন আকার পায়, তখন যে যে মুহূর্ত কর্মের দীপ্তিতে ঝলমল করে, মানুষ বোঝে, এই ছিল তার অভীষ্ট কর্ম। অথচ সেইসব মুহূর্তযাপনের সময় এইসব কথা তার মনে আসে না। প্রভাতকুমারের কর্মের শিকড় ছিল শান্তিনিকেতনেই, রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে। শান্তিনিকেতন থেকে একবার আর্থিক কারণে তিনি কলকাতার সিটি কলেজে কাজ করেছিলেন। কিন্তু ওই ভুবনডাঙার মেঘলা আকাশ যার উপর ভর করে, তার আর কোথাও গিয়ে শান্তি নেই। তার উপর অমোঘ আহ্বানের মতো তার কাছে ভেসে এসেছিল রবিঠাকুরের চিঠি — “ইংরেজি পড়াইবার লাইব্রেরি দেখিবার লোকের দরকার। আপাতত আমিই পড়াইতেছি। আমার পড়ানোর প্রণালী কঠিন, কাহাকেও তৈরি করিয়া লইতে চাই। নতুন লোককে সহসা ডাকিতে সাহস হয় না। তাই ভাবিয়াছিলাম তোমাকে তৈরি করিয়া লইব। সস্ত্রীক যদি আসিতে পারো তো ভালো।”

প্রভাতকুমারের স্ত্রী ছিলেন সুধাময়ীদেবী। এই চিঠির পর প্রভাতকুমার এসে হাজির শান্তিনিকেতনে। বিশ্বভারতীর গ্রন্থগারিক হলেন তিনি। ভূগোল, ইতিহাসের অধ্যাপনা আর জ্ঞানসাধনা — প্রভাতকুমারকে সত্যিই জ্ঞানতাপস করে তুলেছিল। সিলভাঁ লেভির সঙ্গে তাঁর ছিল গুরু শিষ্যের সম্পর্ক। ইন্দিরা গান্ধি যখন শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন, তাঁকে বাংলা পড়িয়েছিলেন প্রভাতকুমার। অল্প কিছু শিশুসাহিত্যও রচনা করেছিলেন। তবে তাঁর মূল কীর্তি অবশ্যই রবীন্দ্রজীবনী, চারখণ্ডে সম্পূর্ণ ‘রবীন্দ্রজীবনী ও রবীন্দ্রসাহিত্যপ্রবেশক’। ১৯২৯ সালে রবীন্দ্র জীবনী লেখার পরিকল্পনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রায় পঁচিশ বছর সাধনার পর এই কাজ তিনি শেষ করেছিলেন। এছাড়াও ‘ভারতের জাতীয় আন্দোলন’, ‘রামমোহন রায় ও তৎকালীন সমাজ ও সাহিত্য’, ‘জ্ঞানভারতী’, ‘বঙ্গপরিচয়’, ‘বাংলা দশমিক  ও বর্গীকরণ’, ‘বাংলা গ্রন্থ বর্গীকরণ’, ‘রবীন্দ্রগ্রন্থপঞ্জী’, ‘রবীন্দ্রজীবনকথা’ ইত্যাদি আরও অনেক তথ্যনির্ভর বই লিখেছিলেন তিনি। বিশ্বভারতী গ্রন্থাগারের দায়িত্বও ছিল তাঁর উপরে। এই হয়তো ছিল তাঁর সাধনপীঠ। এছাড়াও পল্লীউন্নয়ন, নারীশিক্ষা ইত্যাদি সমাজসেবামূলক কাজও করেছিলেন তিনি। সারাজীবন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মানপ্রাপ্তি তাঁর প্রাপ্যই ছিল। তিনি লিখেছিলেন, ‘জীবনে যে মূলধন লইয়া আসিয়াছিলাম তাহা নষ্ট করি নাই।’ রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে এটাই প্রকৃত সত্য। 

সহায়ক গ্রন্থঃ

রবীন্দ্রপরিকর, পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়

Developed by DXDasia