সুমের অঞ্চলে বারেবারেই প্রভাবিত হল রক্ত স্রোতের ইতিহাস। যা চললো হালের সাদ্দাম হোসেনের যুগ পর্যন্ত
টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিস নদীর মাঝখানে যে উর্বর দেশ সেই দেশটাকেই প্রাচীন ইউনানিরা আদর করে বলতেন মেসোপোটামিয়া। এই দোয়াব অঞ্চল আজকে নাম নিয়েছে ইরাক। এই অঞ্চলের যেমন একটা বাস্তব জগৎ আছে তেমনই আছে এক আশ্চর্যের জগৎ। সেই আশ্চর্যের জগতের মধ্যে রয়েছে দোয়াবের বসরাই গোলাপ, উড়ন্ত গালিচা, ব্যবিলনের শূন্য উদ্যান গিলগামেশের মহাকাব্য, আবব্য রজনীর গল্প, আলিবাবা-চল্লিশ চোরের গল্প ও সিন্দবাদের আশ্চর্য যাদু চিরাগের গল্প। বলতে গেলে যিশুর জন্মেরও প্রায় ৫০০ বছর আগে এই দেশকে লোকে ডাকতেন ‘সুমের’ বলে। এই সুমেরিয়রা কৌণিক আকারের অক্ষর বা লিপি আবিষ্কার করে মাটির ফলকে সেই লিপিগুলির ছাপ তুলে সাহিত্য রচনা করেছিলেন। সেই যে সাহিত্য তার প্রভাব যেমন পড়েছে ওডিসি মহাকাব্যে আবার একই ভাবে পড়েছে আমাদের দেশে যম বা নচিকেতার উপাখ্যানে। পাশা-পাশি তাঁরা তৈরি করেছেন কি অপূর্ব সব শিল্পকৃতি। কিন্তু ইতিহাসের এমনই ফের বারেবারেই এই অঞ্চলে লুট করতে এসেছে অন্য অঞ্চলের ক্ষমতাশীলরা। সেটা যিশুর জন্মের ২৩০০ বছর আগের কথা। আক্কাদিরা এসে দেশটাকে লুট করলো। যদিও তারা এই অঞ্চলে রাজত্ব করলেন এবং আক্কাদিদের হাতে এই অঞ্চলের সভ্যতাও অনেকখানি এগিয়ে গেল। তার পর সময় চলল সামনের দিকে। দেখা গেল যিশুর জন্মের ১৮০০ বছর আগে ব্যবিলনের লোকজনেরা এসে হাজির হল এখানে। সেই থেকেই সুমেরীয় সভ্যতার সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার যোগাযোগ। আবার সেই থেকেই সুমের অঞ্চলে বারেবারেই প্রভাবিত হল রক্ত স্রোতের ইতিহাস। যা চলল হালের সাদ্দাম হোসেনের যুগ পর্যন্ত। সাদ্দামের সময় লুট হল ইরাক। বাগদাতের পতনের সময় আশি হাজার মৃৎ ফলকের পৃষ্ঠা অবাধে লুট হয়ে গেল। আমেরিকান ও ব্রিটিশ সৈন্যদের কাছে ব্যপারটা দাঁড়ালো অনেকটা এই রকম ‘মারি তো গন্ডার, লুঠি তো ভাণ্ডার।’ সভ্যতার নিদর্শন লুঠ হতে থাকলো। আর ব্রিটিশ ও আমেরিকান লুঠেরেরা তখন ব্যস্ত ইরাকের তেল লুঠ করবার হিসেব নিকেশ নিয়ে।
একজন শিল্পীর ছবিতে এই হালের লুঠেরাদের গল্প উঠে এল অবলিলায়। এই শিল্পীর নাম মকবুল ফিদা হোসেন। তিনি ছবিতে আঁকলেন একটা উড়ন্ত গালিচায় একজন আমেরিকান সৈনিক মর্জিনাকে লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। আর মর্জিনার হাতে একটি মাটির ‘জালা’। এইখানে এই মর্জিনা হল প্রকৃত অর্থে ইরাকের প্রতীক আর তার হাতে যে জালা সেই জালা হল মাটির থেকে আহরিত খনিজ তেলের প্রতিক। এই খনিজ তেল কী করে? এই খনিজ তেল সভ্যতার চাকাকে ঘোরায়। তাই এই ছবি যেন বলছে বুশ এবং ব্লেয়ার (আমেরিকা ও ইংল্যান্ড) এদের চাই সভ্যতার চাকা ঘোরানোর শক্তি। অর্থাৎ খনিজ তেল। তাই মর্জিনাকে অর্থাৎ ইরাককে ওদের দরকার। ছবিতে বাগদাদের নয়া লুঠেরাকে নতুন ভাবে চিহ্নিত করলেন হুসেন। ‘বাগদাদের লুঠেরা’র সিরিজ রচনা করার জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন হলিউডের প্রাচীন কালের সিনেমা – ‘থিফ অফ বাগদাফ’র পোষ্টারের উপাদানকে। ওই ছবিতে মেরি পিক্ফোর্দ সেজেছিলেন মর্জিনা আর ছবির নায়ক ছিলেন ডগলাস্ ফেয়ার ব্যাঙ্কস। এমন কী এই সিরিজের একটি ছবিতে তিনি সরাসরি লিখেও দিয়েছিলেন হলিউড মোশন পিকচার, ডগলাস্ ফেরার ব্যাঙ্কস- নামগুলি। সভ্যতার লুঠেরাদের এই রকম ছবি সমকালিন শিল্প ইতিহাসে বিরল। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখা ভাল বাল্যকালে এই সিনেমাটি দেখেছিলেন হুসেন। পরিনত বয়সে যখন এই রকম একটি প্রতিবাদী ছবি তৈরি করতে যাচ্ছেন তখন আশ্চর্য ভাবে ছোটবেলার দেখা ছবির পোষ্টারের উপাদান তাঁর ছবিতে নিজের মত করে ফিরে এল।