ক্ষুধার ভারতে ইন্ডিয়া জিডিপি-ময়

ভারতের তুলনায় বাংলাদেশেও অনেক কম মানুষ অভুক্ত থাকে

আমার এক স্নেহভাজন, ছিলেন কট্টর বামপন্থী, এখন কট্টর মোদিপন্থী। যেখানে যা দেখেন, যদি মনে হয় তা অর্ধসত্য সঙ্গে সঙ্গে তা আমার মোবাইলে আছড়ে পড়ে, সঙ্গে আরেকটা পোস্ট। সেই পোস্টে অবধারিতভাবে প্রমাণ থাকবে কোনও অন্য সমর্থকের পোস্ট থেকে নেওয়া পাল্টা সমালোচনা যে কেন তা অর্ধসত্য, কেন তা মোদিকে ছোট করার চেষ্টা এবং অবশ্যই মোদিকে ছোট করার সেই অপপ্রচেষ্টার নিন্দা।

কিন্তু গোটা আলোচনাটা যে পথে চলেছে, ইংরাজি বা আঞ্চলিক ভাষার গণমাধ্যমগুলিতে, তাতে কিন্তু নীতি ও রূপায়ণ পদ্ধতির মধ্যে ফারাক হওয়ায় নীতির মূল উদ্দেশ্য ঠিক কী ভাবে ঘুরে যাচ্ছে সেদিকে আর নজরটা থাকছে না। আরও স্পষ্ট করে বললে, আপাত দৃষ্টিতে মূল নীতিটা থাকছে একই কিন্তু তার রূপায়ণ যে রাস্তায় হচ্ছে তাতে নীতির প্রাথমিক লাভ যাদের হওয়ার কথা ছিল তাদের না হয়ে, হচ্ছে সম্পূর্ণ অন্য আরেক শ্রেণির।

এই মুহূর্তে সংবাদপত্রের শিরোনামে আবার ফেরত এসেছে অর্থনীতি। দেশের আর্থিক বৃদ্ধির প্রসঙ্গ। আমার প্রতিপাদ্যটি খোলসা করার জন্য আমরা তুলে নি জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি ও উন্নয়ন প্রসঙ্গটি। লড়াই চলছে বর্তমান বৃদ্ধির হার যা হওয়া উচিত ছিল তা হয়নি কেন তা নিয়ে। কিন্তু এটা তো মানতেই হবে সরকারি হার যা বলা হচ্ছে তা সত্যি ধরে নিলে তা বিশ্ববাজারের প্রেক্ষিতে বেশ ভাল। তা’হলে আর লড়াই কিসের? আসলে লড়াইটা এখান থেকেই শুরু।

সরকার চাইছে “সবকা ভালাই”। দাবি করা হচ্ছে সরকার যেভাবে নীতি প্রণয়নের রাস্তায় হাঁটছে তাতে আর কয়েক বছরের মধ্যেই দেশের দারিদ্র্য ঘুচে যাবে। কিন্তু তথ্য কী বলছে? আসি সেই আলোচনায়। দু’টো তথ্য যা আমাদের ঘরে সংবাদমাধ্যমের হাত ধরে পৌঁছিয়েছে আমরা চোখ রাখি সেই দুই তথ্যের উপর। একটি তথ্য বলছে যে ভারত এই মুহূর্তে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম কোটি কোটিপতিদের আঁতুড় ঘর। বিলিওনিয়ারদের সংখ্যা ভারতে বাড়ছে। একই সঙ্গে দেখছি ভারত কম থেকে বেশি এই সূচকে ১১৯টি দেশের মধ্যে ১০০ তম স্থান নিয়ে গর্বের সঙ্গে বিরাজ করছে। অর্থাৎ সূচকটিকে আমাদের ভাষায় পড়লে দাঁড়ায় ক্ষুধার বিশ্বে ১১৯টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান প্রথম ২০টির মধ্যে। ভারতের তুলনায় বাংলাদেশেও অনেক কম মানুষ অভুক্ত থাকে।

ব্যাপারটা তাহলে কী দাঁড়াল? ভারতে বড়লোকের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু গরীবরাও এখনও পেটে ক্ষিদে নিয়েই জীবন যাপন করছে। একটা যুক্তি সরকার সমর্থকরা দেবেন এবং সেটা হল ভারত তো গরীবের দেশ বলেই পরিচিত ছিল। পরিসংখ্যানও তাই বলে। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি সরকারই তো তাই চেষ্টা করে চলেছে দারিদ্র্য দুর করতে। ঠিক। কিন্তু এই চেষ্টা যে উচ্চারণ পেরিয়ে রূপায়ণের রাস্তায় হাঁটছে তা বুঝব কী করে?

এটা বোঝার একাধিক রাস্তা আছে। যেমন কর ব্যবস্থা। সরকার তুলনামূলকভাবে বড়লোকদের ঘাড়ে বেশি করের কোপ ফেলে আর সেই কর দিয়ে দরিদ্রদের জন্য এমন প্রকল্প রূপায়ণ করে যাতে তারা দারিদ্র্য কাটিয়ে বাজারে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে। কিন্তু যা হিসাব পাওয়া যাচ্ছে তাতে কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে নীতির খুব একটা মিল পাওয়া যাচ্ছে না। থমাস পিকেটি এবং লুকাস চ্যানসেল ভারতের জাতীয় আয়ের বিস্তার ও তার বন্টন নিয়ে বিস্তারিত কাজ করছেন। তাঁদের সাম্প্রতিক অঙ্কে দেখা যাচ্ছে ৩০ এর দশকে দেশের মাত্র এক শতাংশে মানুষ জাতীয় আয়ের ২১ শতাংশের মতো ভোগ করতেন। আর এখন সেই এক শতাংশ মানুষই দেশের আয়ের ২২ শতাংশের ভাগীদার। পরাধীন ভারতের ৩০-এর দশকটি অন্যান্য অনেক কিছুর সঙ্গে দারিদ্র্যের জন্য পরিচিত। কিন্তু সেটা তো পরাধীনতার সময়। ২০১৭ সালের কাছেপিঠে এই বিভাজন যদি পরাধীন ভারতের সঙ্গে তুলনীয় হয়ে ওঠে তা’হলে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে স্লোগান এখন ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে সেই “সবকা ভালাই” আসলে কার ভাল।

কর ব্যবস্থা এর উত্তর দিতে পারে।কী ভাবে? অঙ্কটা কষা হয় এই ভাবে। পরিসংখ্যানবিদরা প্রথমে জাতীয় আয়ের বন্টন হিসাব করেন। তার থেকে হিসাব করা হয় জিনি সূচকের। এই সূচকটি শূন্য থেকে একের মধ্যে থাকে। শূন্য মানে হল আয় বন্টনে সার্বিক সাম্য রয়েছে আর এক মানে হচ্ছে অসাম্য সাংঘাতিক।এবার কর তত্ত্বের যে সূত্র মানা হয় তা মেনে নিলে কর বাদ না দিয়ে জাতীয় আয় বন্টন থেকে জিনি সূচক যা পাওয়া যাবে, তার থেকে কর বাদ জিনি সূচক অনেক বেশি সাম্যের হিসাব দেবে। এক কথায় এটা থেকে দেখা হয় যে আর্থিক দিক দিয়ে যারা সবল তাদের থেকে টাকা নিয়ে সরকার তুলনামূলক ভাবে দুর্বলদের সুবিধা করে দিচ্ছে কি না। ভারতের ক্ষেত্রে পিকেটিদের অঙ্কে সাম্প্রতিক হিসাব যা পাওয়া যাচ্ছে তা ভয়ানক। দেখা যাচ্ছে যে দু’টোর মধ্যে কোনও ফারাক তো নেই, অসাম্য সূচক প্রায় ০.৫ শতাংশ ছুঁই ছুঁই। অসাম্য এই অঙ্কে ভয়ানক বেশি? তা’হলে বর্ধমান অসাম্যের প্রেক্ষিতে এই “সবকা…” আসলে কারা? উন্নয়নের নীতির অভিমুখটা তা’হলে কী? উত্তরটা কিন্তু জরুরি।
 

Developed by DXDasia