অমার্ক্সীয় বলশেভিক বিপ্লব

লেনিনবাদী সমাজতন্ত্র, যা মূলত মার্ক্সীয় সমাজতন্ত্র-বিরোধী

ভারতে বাম রাজনীতির এখন বোধ হয় চরমতম দুর্দিন। মানুষ আজ আর আগের মত বামপন্থার দিকে আকর্ষণ বোধ করে না। এজন্যে জনগণকে দুষে লাভ নেই , তা সমীচীনও নয়। বামপন্থী, বিশেষত কমিউনিস্ট পার্টিগুলির (পড়ুন লেনিনবাদী) শুধু আত্ম-সমালোচনা নয়, চেনা মানুষদের কাছে গিয়ে জানতে চাওয়া উচিত , কেন তাঁরা বাম দলগুলিকে আর কাছের দল বলে ভাবেন না। কিন্তু তা বাম দলগুলির মাথাতেই নেই, এমনকি আত্ম-সমালোচনাতেও অনাগ্রহী। এমন একটা অবস্থায় এসে পড়েছে বলশেভিক বিপ্লবের শতবর্ষপূর্তি। তা পালন নিয়ে এই দলগুলি নেমে পড়েছে। কিন্তু তা মূলত বলশেভিক বিপ্লবের, লেনিনের স্তুতিসর্বস্ব। কেন পৃথিবীর কোথাও লেনিনীয় (অংশত হলেও যার ফলিত রূপ স্তালিন জমানা ও মাও জমানা) টিকল না, সে নিয়ে খোলামেলা আলোচনা/চর্চা নেই। স্তালিন, খ্রুশ্চেভ, গোর্বাচেভ বা দেং-এর উপর দোষ চাপিয়ে লাভ নেই। কিন্তু এসব প্রশ্ন তোলা যেন নিষিদ্ধ। মার্ক্স যে দেকার্তের প্রিয় নীতি (De omnibus dubitandum -সব কিছু সন্দেহ করতে হবে অর্থাৎ প্রশ্নবোধকতার নিরিখে যাচাই করতে হবে), এই নীতি লেনিনবাদী দলগুলি কখনোই মানে নি, এদেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলিও নয়। আমার মনে হয় বলশেভিক বিপ্লবের ( অধুনালুপ্ত সোহ্বিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ভাষায় ‘মহান অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব) পুনর্বিচার তার শতবর্ষপূর্তিতে জরুরী, অন্তত তার ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য।

দুটি বিষয়ে বোধ হয় কোন বিতর্ক থাকার অবকাশ নেই। এক, লেনিনই দুনিয়ার মানুষের কাছে মার্ক্সের বার্তা ও ভাবনা পৌঁছে দিয়েছিলেন এবং তা সম্ভব হয়েছিল বলশেভিক বিপ্লবের কারণে। বলশেভিক বিপ্লব জাতীয় মুক্তি সংগ্রামগুলিকে সক্রিয় প্রেরণা দিয়েছিল। মানবেতিহাসে একারণে বলশেভিক বিপ্লব চিরজীবী হয়ে থাকবে।

তৎসত্বেও ‘সমাজতান্ত্রিক’ ব্যবস্থা প্রায় সর্বত্র ধ্বংস হয়ে গেল কেন? স্তালিন, খ্রুশ্চেভ, গোর্বাচেভ বা দেং-এর জন্যে বলে সত্যকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। মার্ক্স ও এঙ্গেলস কমিউনিস্ট ইস্তাহারের রুশ সংস্করণে (১৮৮২) রাশিয়ায় বিপ্লবী সম্ভাবনার কথা লিখেছিলেন।, “দ্রুতবর্ধিষ্ণুপুঁজিতান্ত্রিক জুয়াচুরি ও বিকাশোন্মুখ বুর্জোয়া ভূ- সম্পত্তির মুখোমুখি রয়েছে দেশের অর্ধেকের বেশি জমি জুড়ে চাষিদের যৌথ মালিকানা। এখন প্রশ্ন হ’ল যৌথ মালিকানার এই আদি রূপ রুশ অবশ্চিনা (অর্থাৎ স্বশাসিত গ্রামীন সমাজ- শ.রা) কি কমিউনিস্ট সাধারণ মালিকানার উচ্চতম পর্যায়ে সরাসরি রূপান্তরিত হতে পারে? না কি পক্ষান্তরে তাকেও যেতে হবে ভাঙনের সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, যা পশ্চিমের ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারা হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে? এর যে-উত্তর দেওয়া সম্ভব তা এইঃ রাশিয়ার বিপ্লব যদি পশ্চিমে প্রলেতারীয় বিপ্লবের সংকেত হয়ে ওঠে যাতে দুই বিপ্লব পরস্পরের পরিপূরক হয়ে দাঁড়ায়, তা হলে রাশিয়ার ভূমির বর্তমান মালিকানা কাজে লাগতে পারে কমিউনিস্ট বিকাশের সূত্রপাত হিসেবে” ।কিন্তু সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সংকেত লক্ষ্য করলেও তাঁরা প্রলেতারীয় বিপ্লবের আবশ্যকতার উপর জোর দিয়েছিলেন সে পথে লেনিন যান নি, তাঁর নেতৃত্বাধীন বলশেভিক পার্টিও ( রুশ সমাজ-গণতান্ত্রিক শ্রমিক দল – আর এস ডি এল পি) নয় । । তাঁরা ‘সাম্যবাদী বিকাশের’ কথা বলেছিলেন বরং তাঁরা ‘ শর্টকাট’ পথে ভেবেছিলেন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম হয়ে যাবে। আজকের দিনে ভাবতে হবে এ কাজ সুবিধাবাদের পথানুসরণ ছিল কি না। লেনিন এক আকস্মিক ও মার্ক্স-বিরোধী তত্ব হাজির করলেন আগে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, তার পরে তো সাম্যবাদী বিপ্লব,সমাজতন্ত্র । সাম্যবাদের নীচের স্তর বা প্রাক-স্তর ( লেনিনের ‘রাস্ট্র ও বিপ্লব’ গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়) মার্ক্স এমন কথা কোথাও কখনো বলেন নি। মার্ক্স সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদকে সমার্থক বলেছিলেন।তিনি অন্য প্রতিশব্দও ব্যবহার করতেনঃ শ্রমিকদের সাধারণতন্ত্র,মুক্ত ব্যক্তিদের পুনর্মিলনের সমাজ, ইত্যাদি । গোথা কর্মসূচির সমালোচনা-য় মার্ক্স লিখেছিলেন সাম্যবাদেরই দুই স্তর। প্রথম স্তরে প্রলেতারীয় একনায়কতন্ত্র, দ্বিতীয় স্তরে ‘পূর্ণ সাম্যবাদ’। প্রথম স্তরে বা প্রলেতারীয় একনায়কতন্ত্র-স্তরে মার্ক্স সমাজ-রূপান্তরের প্রাথমিক ক র্মসূচির কথা বলেছেন , যেমন জনগণের প্রয়োজন মেটানোর কাজে অত্যাবশ্যক উৎপাদিকা শক্তির পুনর্গঠনও বুর্জোয়া সংস্কৃতির মোকাবিলার কথা বলেছিলেন। প্রলেতারীয় একনায়কতন্ত্রের উদ্দেশ্য পুঁজিবাদীদের পুনরাবির্ভাবের ভিত্তি প্রতিবিপ্লবী শক্তিকে চিরতরে অশক্ত, অকেজো করে দেওয়া। আর দ্বিতীয় স্তরে মানসিক ও শারীরিক শ্রমের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক অবসান, যাতে শ্রমশক্তি ব্যক্তির সামগ্রিক ও সার্বিক বিকাশের পথ প্রশস্ত করতে পারে। এরই ভিত্তিতেই সমবায় সম্পদের উন্মুক্ত বিকাশ সুনিশ্চিত হবার কথা বলেছিলেন।

লেনিন গোথা কর্মসূচির সমালোচনা’বিকৃত করেছিলেন । অক্টোবর বিপ্লবের তিন সপ্তাহ আগে লেনিন লিখলেন -The proletariat cannot "lay hold of" the "state apparatus" and "set it in motion". But it can smash everything that is oppressive, routine, incorrigibly bourgeois in the old state apparatus and substitute its own, new apparatus. The Soviets of Workers', Soldiers' and Peasants' Deputies. are exactly this apparatus… ( Can the Bolsheviks Retain State Power?)।

বলশেভিক বিপ্লবের পরেই তিনি ‘সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র’, ‘কমিউন রাষ্ট্র’ ইত্যাকার ধারণা তুলে ধরলেন, যা আদ্যন্ত মার্ক্স-বিরোধী। মার্ক্স কখনো এমন কথা লেখেন নি। বন্ধু সুহৃদ ডাঃ লুডহ্বিগ কুগেলম্যান-কে ১৮৭১ সালে ১২ এপ্রিল লিখেছিলেন , এক রাস্ট্র-ব্যবস্থা চূর্ণ করে অন্য কোন প্রকার রাস্ট্র গড়বেনা সর্ব হারারা। “If you look at the last chapter of my Eighteenth Brumaire you will find that I say that the next attempt of the French revolution will be no longer, as before, to transfer the bureaucratic-military machine from one hand to another, but to smash it, and this is essential for every real people's revolution on the Continent”।

‘রাস্ট্র ও বিপ্লব’ গ্রন্থে লেনিন নিজেই লিখেছিলেন , ‘রাষ্ট্র থাকলে স্বাধীনতা থাকবে না, স্বাধীনতা থাকলে রাষ্ট্র থাকবে না’ । পরে কেন ভুলে গেলেন যে রাষ্ট্র মানেই শোষণ যন্ত্র, তা বোধগম্য নয়। লেনিনের ‘সমাজতান্ত্রিক রাস্ট্র’ সমাজতান্ত্রিকও ছিল না, কারণ সেখানে মজুরী দাসত্ব অটুট ছিল, যে মজুরি ব্যবস্থাকে মার্ক্স অভিহিত করেছিলেন- “System der Sklaverei”। কেবল পুঁজিবাদী মালিকেরজায়গা নিয়েছিল বলশেভিক পার্টির আমলাতান্ত্রিক নেতারা।

বিংশ শতাব্দীতে কোথাও মার্ক্সীয় সমাজতন্ত্র ছিল না, কায়েম হয়েছিল লেনিনবাদী সমাজতন্ত্র , যা মূলত মার্ক্সীয় সমাজতন্ত্র-বিরোধী, যা পুঁজিতান্ত্রিক পণ্য-মজুরী সম্পর্কের অবসান ঘটানোর চেস্টাই করে নি। সেই ব্যবস্থা একদিন না একদিন ধ্সে পড়তই।

Developed by DXDasia