অনেকেই সঙ-এর সঙ্গে বহুরূপীদের গুলিয়ে ফেলেন
যাদবপুরের এইট বি-র লাগোয়া বাজারে দেখা হল শিবঠাকুরের সঙ্গে। পরনে বাঘছাল, হাতে মুড়ির ঠোঙা, শিব তরকারিওয়ালার কাছে লঙ্কা চাইছিলেন। একটা লঙ্কা পেলেই শিব খুশি। সাধে কি তাঁর নাম আশুতোষ! তরকারিওয়ালা দুটো লঙ্কার সঙ্গে একটা কয়েন দিলেন। আশীর্বাদ করে বিদায় নিলেন শিব।এভাবেই হঠাৎ হঠাৎ দেখা হয়ে যায় ওঁদের সঙ্গে। কখনও তারকেশ্বর বা বর্ধমানগামী ট্রেনে। কখনও কোনও অলস দুপুরে জোড়াবাগান বা ভবানীপুরের ভেতরের দিকের কোনও পাড়ায়। বলছিলাম বহুরূপীদের কথা।
বহুরূপী মানেই কিন্তু বাঘ সেজে মানুষকে ভয় দেখিয়ে লাঞ্ছনার মুখে পড়া ছিনাথ বহুরূপী নয়। অনেক দিন আগে বহুরূপী সুবল দাস বৈরাগ্য আমায় বলেছিলেন, তিনি শিব থেকে মিস শেফালি সবকিছু সাজেন। একটু সংশয়ী হতেই তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, ‘ঘাবড়াবেন না, আমি মিস শেফালি সেজে আপনার সামনে এসে দাঁড়ালে আপনিও আমায় চিনতে পারবেন না। পরে জেনেছি, নর্তকী, বাইজী, কলেজ গার্ল ইত্যাদি সাজা তাঁদের পেশারই একটা অঙ্গ। তখন তাঁদের অনেককে সত্যিই চেনা যায় না। এই চিনতে না পারাটাই একসময় ছিল বহুরূপীদের তুরুপের তাস। চিনতে পারলে, ধরতে পারলে সে আর বহুরূপী কীসের! রূপসজ্জা, আর সেই সাজের সঙ্গে মানানসই সংলাপ, অঙ্গভঙ্গি ও অভিনয় – সব মিলিয়ে গোটা আবহাওয়াটাই বদলে দিতেন বহুরূপীরা। যাদবপুরের এইট বি-র সামনে যে বহুরূপীকে আমি দেখলাম তাদের সঙ্গে পুরনো বহুরূপীদের মেলানো খুবই কঠিন। তেমন দু–একজনের সঙ্গে এখনও নানা গ্রামীণ মেলায় হঠাৎ হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। কয়েক বছর আগে পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলায় পটুয়াদের মেলায় একজনের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তিনি সেজেছিলেন অর্ধনারীশ্বর। তাঁকে চিনতেই পারিনি। অথচ কিছুক্ষণ আগেই মেকআপহীন অবস্থায় তিনিই আমার সঙ্গে গল্প করেছেন। শরৎচন্দ্র, সমরেশ বসু, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়দের লেখায় বহুরূপীদের বর্ণনা পাচ্ছি। সব বর্ণনাতেই কিন্তু একটা জিনিস বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে, তা হল তাঁদের সাজসজ্জা, অভিনয় একটা অন্যরকম পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
আজকর মূলত ভিক্ষাজীবী বহুরূপীদের দেখে বোঝার উপায় নেই অভিনয়, অঙ্গভঙ্গী, সংলাপ এবং আদতে একটা দৃশ্য তৈরি করার মধ্যে দিয়ে এটা ছিল একটা সম্পূর্ণ বিনোদন। পুরনো কলকাতার বহুরূপীদের কথা বলতে গিয়ে রাধাপ্রসাদ গুপ্ত বলছেন, ‘বাতিওয়ালারা চলে যাবার পর অন্ধকার একটু গাঢ় হলেই প্রায়ই দেখা দিত বহুরূপীরা। বহুরূপী এলেই পাড়ার মধ্যে একটা সাড়া পড়ে যেত। অবিশ্বাস্য শোনালেও এটা সত্যি যে সে কখনও কখনও চ্যাপলিনের ভবঘুরে সেজে আসতো।’ যে সময়কার কথা যখন তিনি বলছেন, তখন শহরে চ্যাপলিনের ‘দ্য ট্রাম্প’ রিলিজ করে গেছে। সেই ভবঘুরের অঙ্গভঙ্গি, বিষাদ,আনন্দ নিজেদের মতো করে আত্মস্থ করে নিয়েছেন শহরের বহুরূপীরা। ভাবা যায়! ট্রাম্প ছিল তাদের একটা পপুলার আইটেম।
শুধু ছিনাথ বহুরূপীকেই মার খেতে হয়নি। মার খেতে হয়েছিল সমরেশ বসুর সুচাঁদকেও। ‘সুচাঁদের স্বদেশ যাত্রা’ গল্পে আমরা দেখি সুচাঁদ কখনো হনুমান, কখনও কঙ্কাল সেজে ভয় দেখাচ্ছে। আর তা দেখে কেউ ভয় পেলেই ‘সুচান্ বউরূপ্যা’ আত্মপরিচয় দেবার ঢঙে বলে উঠত, ‘আইজ্ঞা কত্তা, ডরাইবেন না আপনি সুচাঁদকে দেখতে আছেন।’ সুবল দাস বৈরাগ্যর মিস শেফালি সাজার মতো সেও সাজত রূপসী মেয়ে। বস্তুত, কলেজ গার্ল, ডান্সার – এসব সাজের বেশ চাহিদা ছিল একসময়। তবে এখন আর এসব বড় একটা সাজেন না তাঁরা। সম্ভবত তার একটা বড় কারণ হল মেয়ে সাজার জন্য যে স্বাভাবিক লাবণ্য আর কমনীয়তা দরকার জীবনধারনের গ্লানি তা তাদের শরীর থেকে কেড়ে নিয়েছে। বহুরূপীরা বরাবরই উপেক্ষা আর অবহেলার শিকার।
সেই আদ্যিকালে মনু স্মৃতিতেও তাদের সম্পর্কে খুব একটা ভালো কথা বলা হয়নি। ট্রাইবস অ্যান্ড কাস্ট অফ বেঙ্গল বইয়ে রিজলে সাহেব বলেছেন, ‘এরা নিম্নবর্ণের হিন্দু, যাদের একাংশ পরে মুসলমান হয়েছিল। এরা একইসঙ্গে ভাঁড়, অভিনতা এবং নানা ছদ্মবেশ ধারণে সক্ষম।’ অনেকে সঙ-এর সঙ্গে বহুরূপীদের গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু সঙ আর বহুরূপী আলাদা। সঙরা বিভিন্ন উৎসব, অনুষ্ঠান উপলক্ষে সঙ সাজেন। কিন্তু বহুরূপীদের সাজতে হয় বছরভর। এটা একটা স্বাধীন পেশা। বহুরূপীরা একক ও দলবদ্ধ দুভাবেই অনুষ্ঠান করেন। বস্তুত তাঁদের এটাই জীবিকা। আগে পাড়া বা গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে মাসের শেষে তাঁদের নিয়মিত চাল, ডাল, আনাজপাতি এবং টাকা দেওয়া হত।
আরও পড়ুন
কাজলা দিদি-র কবি যতীন্দ্রমোহন
বীরভূম, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, হাওড়া, হুগলি, নদীয়ার বহু জায়গাতেই একসময় ছিল বহুরূপীদের জমজমাট ঘর-গেরস্থালি। এখন তা ভাঙা হাট। তারকেশ্বর, বৈঁচি, হুগলি, ত্রিবেণী, চুঁচুড়া এবং লাভপুরের কাছে বিষয়পুরে এখনও কয়েক ঘর বহুরূপী কোনওমতে টিকে আছেন। যারা আছেন তাঁরা অন্য কোনও পেশায় যেতে পারবেন না বলে আছেন। সেই পরিবারগুলির তরুণরা কিন্তু এখন আর এ পেশায় আসছেন না। এসব এলাকার কিছু কিছু গ্রামে গেলে দেখা যাবে সকালেই শিব, দুর্গা, লালন ফকির, ডাকাত সর্দার সেজে বেরিয়ে পড়েছেন বহুরূপীরা। কিন্তু আর কতদিন বেরোতে পারবেন তা এঁরা নিজেরাই জানেন না!
ছিনাথ বহুরূপীকে ল্যাজ কেটে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর আমাদের উপেক্ষা ও অসম্মান এঁদের প্রায় অবলুপ্ত করে দিল। বালকবেলায় বহুরূপীদের নিয়ে সনৎ সিংহ-র একটা চমৎকার গান শুনতাম- ‘আমি বহুরূপী, আমি বহুরূপী’। তার দুটো লাইন মনে পড়ে গেল- ‘এমনি করে আমি কত রূপ বদলাই/অনেক মনের ভিড়ে তবুও হারিয়ে যাই।’ হারিয়েই গেলেন বহুরূপীরা। শুধু ঋত্বিক ঘটক আর নাগেশ কুকনুরের ছবি, সনৎ সিংহ-র গান আর নানা গল্প, উপন্যাসেই হয়তো এঁরা থেকে যাবেন।
ছবি – বিজয় চৌধুরী