রাজা সুবোধ মল্লিকের প্রাসাদ—গুম হয়ে থাকা ইতিহাস

স্বদেশি আন্দোলনের পীঠস্থান ছিল অরবিন্দ-রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিঘেরা এই বাড়ি

সে এক মস্ত বড়ো বাড়ি। হয়তো আগে রঙ ছিল গাঢ় লাল। কিন্তু দীর্ঘ রোদ-ঝড়-জলে সে রঙের চমক আজ বোঝা কঠিন। দেওয়ালের গায়ে নম্বর সাঁটা। ১২ নম্বর রাজা সুবোধ মল্লিক স্ট্রিট। রাজার নামাঙ্কিত রাস্তার ওপরেই দাঁড়িয়ে রাজা সুবোধ মল্লিকের বিশাল প্রাসাদ। দাঁড়িয়ে নিঃশেষিত জৌলুস নিয়ে। 

বাড়িটি প্রথম নজরে আসে বেশ কিছুদিন আগে। এক সন্ধেবেলা ট্যাক্সি করে ফেরার পথে। আধো আলো, আধো অন্ধকারে মিশে হাঁ করে থাকা বাড়িটি যেন গিলতে আসছিল। চারপাশে উপচে পড়া গাছ। একটা গাছের সঙ্গে আরেকটা গাছ মাথায়-মাথায় জড়িয়ে। মনে হবে, হাত বের করে ছুঁতে চাইছে পরস্পরকে। এ দেওয়াল ও দেওয়াল ফুঁড়ে উঠেছে অসংখ্য গাছের শেকড়। জংলা গাছের দল। সবাই মিলে যেন আড়াল করছে বাড়িটাকে। সন্ধেবেলায় এই বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে, তার দোতলা তিনতলার ভাঙা-কপাট  অন্ধকার জানলাগুলোর দিকে তাকিয়ে গা ছমছম করে ওঠে বৈকি। আর সেজন্যই বোধহয় রাজা সুবোধ মল্লিকের বাড়ি আজ কলকাতার ‘হনটেড হাউজ'-এর তালিকায়। 

দ্বিতীয়বার বাড়িটির সামনে যাওয়া চৈত্র মাসের দুপুরে। রোদ-পোড়া আকাশ, তেমনি পোড়া বাড়ি। কিংবা পোড়োবাড়ি। পাশেই একটি বালিকা বিদ্যালয়। হৈহৈ শব্দ শোনা যায় সবসময়। অসংখ্য গাড়ির অবিরল যাতায়াত। শোরগোলের কোনো শেষ নেই। তবু কেন জানি না, বাড়িটির ঠিক সামনে একটা অদ্ভুত চুপ করে যাওয়া টের পাওয়া যায়। মনের ভুল? হবে হয়তো।

পেল্লায় লোহার গেট। ঢোকার কোনো উপায় নেই। আষ্টেপৃষ্ঠে আটকানো। গেটটি দারুণ নকশাময় ছিল এককালে। চক্র আঁকা, আরো কত কারুকাজ। গেট থেকে যতটুকু চোখে পড়ে, একটা বড়ো পোর্টিকো, গাড়িবারান্দা। গেটের সামনেই দুমড়ানো মুচড়ানো নহবতখানা। পার্বণের দিনে যে বেশ সোরগোল তুলত এই বাড়ি– তা আন্দাজ করা যায়।

রাজা সুবোধ মল্লিকের নামে রাস্তা, স্কোয়ার কত কী। অথচ বাড়ির গায়ে কোনো ইতিহাসই লেখা নেই। আছে বলতে একটি মাত্র সাদা পাথরে লেখা ফলক। অরবিন্দ ঘোষ এই বাড়িতে ছিলেন ১৯০৭ সাল পর্যন্ত। কোথাও লেখা নেই, এই বাড়িটিতে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। তখনও এই বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন শ্রী অরবিন্দও। বাল গঙ্গাধর তিলক এসেছিলেন। এছাড়াও ভূপেন্দ্রনাথ দত্তসহ আরো অনেক মানুষের আনাগোনা ছিল এই বাড়িতে।

স্বদেশি আন্দোলনের অন্যতম গর্ভগৃহ ছিল বাড়িটি। দেশকে, জাতিকে শিক্ষায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে তৈরি হয়েছিল ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর এডুকেশন। যা আজকের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। আর তাতে সক্রিয় অংশগ্রণ ছিল রাজা সুবোধ মল্লিকের। সেই আমলে এক লক্ষ টাকা দান করেছিলেন তিনি। সেন্ট জেভিয়ার্স ও প্রেসিডেন্সি কলেজের কৃতি ছাত্র সুবোধ মল্লিক জন্ম নিয়েছিলেন কলকাতার পটলডাঙা অঞ্চলে। এই সুবিশাল প্রাসাদটি যখন তৈরি হয়, তাঁর বয়স তখন চার। এই বাড়িতে থাকতেই তাঁর বঙ্গভঙ্গ বিরোধিতা,  আলিপুর বোমা মামলায় জড়িয়ে পড়া। আর তারপর আলমোড়ায় চোদ্দো মাসের কারাজীবন। এইসবই নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া অতীত। বাড়িটির চারপাশে এসবের কিছুই লেখা নেই।

অনেক গবেষক পণ্ডিত মানুষেরা ভগ্নপ্রায় বাড়িটি থেকে খুঁজে বের করেছেন- গ্রন্থাগার, রান্নাঘর কিংবা কোনটি শ্রীঅরবিন্দর ঘর ছিল- ইত্যাদি। বলেছেন, দেওয়ালের গায়ে দামি ইউরোপীয় ছবির কথা। বিলিয়ার্ড রুমের কথা। সেসব খুঁজে বের করতে চাওয়া তো দূর- তার সদর দরজা খোলাই হয়তো আজ আর সম্ভব নয়। তবে ভিতরে লোকের বাস নেই তা নয়। আইনি বেআইনি নানা জটিলতায় ধুঁকছে গোটা বাড়িটাই। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে নাকি লেখা ছিল বাড়িটির সত্ত্ব। কিন্তু মল্লিকবাড়ির কোনো কর্মচারীর অধিকার চেয়ে মামলা ঠুকে বসে। ফলে মামলা আজও বহমান। ইতিমধ্যে বাড়িটি হেরিটেজ ও বিপজ্জনক দুয়েরই তকমা পেয়েছে। তবে বাড়িটি বিপজ্জনক ছিল আগেও। ব্রিটিশ বিরোধিতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র বলে কথা। 

তবে সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়ার আগে কলকাতার এসব ঘরদোর, অতীতের চিহ্নগুলোকে দেখে রাখা দরকার। হোক ভাঙাচোরা,  তবুও তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে পুরোনো আগুনখেকো সময়টা দিব্বি মাথায় চলে আসে। ঠিক যেমন বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে গেল, এবছরই জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের একশো বছর পূর্তি।

Post Tags
Developed by DXDasia