১১৬ বছরের পুরোনো এই ঐতিহাসিক কারাগারটি
সুকুমার রায়ের লেখা ‘হ য ব র ল’ নাটকের সেই বিখ্যাত পংক্তিটি মনে পড়ে? – “ছিল রুমাল, হয়ে গেল বিড়াল!” এও যেন ঠিক তাই, ছিল ১১৬ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক এক কারাগার, দুম করে হয়ে গেল এক জাদুঘর। তাও আবার এক্কেবারে সুসজ্জিত এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি সমৃদ্ধ। ফলত, এ জাদুঘর যে ইতিহাস এবং ঐতিহ্য অনুরাগীদের কাছে আগ্রহের ঠেক হবে তা আলাদা করে বলার অবকাশ থাকে না, পাশাপাশি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ছাত্র, অধ্যাপক এবং শিক্ষকদের কাছেও এই জাদুঘরটি হয়ে উঠেছে প্রিয় আস্তানা। আলিপুর সেন্ট্রাল জেল (প্রেসিডেন্সি জেল) কিন্তু অন্য কারাগার বা সংশোধনাগারের মতো কোনো সাধারণ সংশোধনাগার ছিল না কোনোদিনই। এটি এমন একটি স্থান যা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এখানেই একসময় ব্রিটিশ উপনিবেশিকদের নির্যাতনের শিকার হয়েছিল অসংখ্য ভারতীয়। এমনকি ফাঁসিতেও ঝোলানো হয়েছিল অনেক শহিদদের।
১৭ নম্বর জাজেস কোর্ট রোডে অবস্থিত এই বাড়িটি একটি জাতীয় ঐতিহাসিক ল্যান্ডমার্ক যা ১৯০৬ সালে ১৫.২ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয়েছিল।

একদিন যে কারাগার অজস্র শহিদের রক্ত আর ঘামের সাক্ষী ছিল, আজ সেটাই যখন জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়, তখন তা এক অনুপ্রেরণামূলক গল্পের জন্ম দেয়। এই জাদুঘরে পা রাখলে চোখের সামনে যেন ধরা দেবে সেকালের ইতিহাস। লাল বাড়িটির দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা রয়েছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অজানা সব গল্পগুলি। স্বাধীনতা-উত্তর প্রজন্মের কাছে এই সব গল্প শুধু যে শিক্ষণীয় তাই নয়, পাশাপাশি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতেও সাহায্য করে। স্বাধীনতা-পূর্বকালে আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের কারাজীবন কোথায় অতিবাহিত করেছেন, ব্রিটিশ সরকার কীভাবে তাঁদের শাস্তি দিয়েছে ইত্যাদি লেখা রয়েছে কারাগারের দেওয়ালে। এ যেন জীবনে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যা কিনা কোনো বইয়ে পড়েও জানা সম্ভব নয়। এ কেবল অনুভব করা যায়।
আরও পড়ুন: ট্রাম মিউজিয়াম ও নতুন আড্ডা জোন
আলিপুর মিউজিয়াম (ALIPORE MUSEUM) নামে পরিচিত এই জাদুঘরটি উদ্বোধন করেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Chief Minister Mamata Banerjee)। কলকাতা শহরের বুকে নির্মিত এই মিউজিয়ামটি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি ব্যাতিক্রমী সংযোজন। ১৭ নম্বর জাজেস কোর্ট রোডে অবস্থিত এই বাড়িটি একটি জাতীয় ঐতিহাসিক ল্যান্ডমার্ক যা ১৯০৬ সালে ১৫.২ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৯১৪ সালের বেঙ্গল গেজেটিয়ারের ভাষায়: “এই নতুন কারাগারটি ছিল আধুনিক উন্নত মানের ব্যবস্থা সম্পন্ন একটি কারাগার। ইংরেজিতে যাকে বলে আপ-টু-ডেট কারাগার (Modern up-to-date)।” এই প্রতিবেদনটি প্রকাশের ঠিক এক বছর আগে অর্থাৎ ১৯১৩ সালে নতুন কারাগারটি পুরানো আলিপুর জেলের কার্যভার গ্রহণ করে এবং কেন্দ্রীয় কারাগার হিসাবে পরিচিত হয়।

এ বাড়ির প্রতিটা ইট খুব কাছ থেকে দেখেছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে, দেখেছে সে সময়ের টালমাটাল পরিস্থিতিকে। তাই এ দেওয়াল, ইট, প্রাচীর, খিলান, গম্বুজ সবই যেন অতীতের এক মূল্যবান দলিল। লাল ইটের প্রাচীরে লেখা রয়েছে বন্দি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নাম। জওহরলাল নেহেরু (Jawaharlal Nehru), সুভাষ চন্দ্র বসু (Subhash Chandra Bose), চিত্তরঞ্জন দাস (Chittaranjan Das), দীনেশ গুপ্ত (Dinesh Gupta), ডঃ বিধান চন্দ্র রায় (Dr Bidhan Chandra Roy) সহ আরও অনেকেই রয়েছেন সে তালিকায়। পশ্চিমবঙ্গ হাউজিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের (HIDCO) উদ্যোগে মিউজিয়ামটির পুনরুদ্ধারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে শুধু মিউজিয়ামটি ঘুরে দেখাই নয়, উপরন্তু পর্যটকদের জন্য রাখা হয়েছে একটি বিশেষ আকর্ষণ। তা হল, ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো’-এর (Light and Sound show) মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্ব তুলে ধরা। এছাড়াও এই বাড়িটির ভিতরে রয়েছে আরামদায়ক একটি কফি হাউস, যেখানে বসে কফি সহযোগে বেশ খানিকটা সময় কাটাতে পারেন যে কেউ। আর রয়েছে বাগান ঘেরা মনোরম পরিবেশ।

মিউজিয়ামের প্রাঙ্গনে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই হাতে পাবেন তথ্যসমৃদ্ধ একটি গাইড ম্যাপ (Guide map)। কোন কোন জায়গাগুলি পরপর দেখবেন তা মানচিত্রটি অনুসরণ করে সহজেই ঠিক করে নিতে পারবেন। একটু এগোলেই পরপর দেখতে পাবেন নেহেরু সেল (Nehru Cell), নেতাজি সেল (Netaji Cell) সহ মহান সব বন্দিদের কারাগার। প্রত্যেকের কারাগারে তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে আবক্ষ মূর্তি। আর একটু এগোলেই রয়েছে পৃথক পৃথক ওয়ার্ড (Segregation Wards), অবশেষে সেই ফাঁসির মঞ্চ (Gallows)। এখানে এসে অচিরেই থমকে দাঁড়াবেন আপনিও। আর নিমেষের মধ্যে কোনো এক অজানা হাওয়া এসে শীতল করে দেবে সারা শরীর।

জাদুঘরের প্রবেশমূল্য – মাথাপিছু ৩০ টাকা।
‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ শো-র মুল্য – মাথাপিছু ১০০টাকা
সময় – দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা (সোমবার বন্ধ)।
লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো-র সময় – সন্ধ্যা ৬:৩০ এবং সন্ধ্যা ৭:৩০।
এছাড়াও কোনো প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে যোগযোগ করতে পারেন নিম্নলিখিত ফোন নম্বরে – +৯১৩৩২৪৪৯২০১৫, +৯১৩৩২৪৪৯২০১৬
ওয়েবসাইট: independencemuseum.in
ইমেল: info.alipore@wbhidco.in
মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন।