
হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার পিছনে সংকীর্ণ রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য রয়েছে
হরিদ্বার শহরে উনুন জ্বালানোর ঘুঁটে খুঁজতে গিয়ে বহুকাল আগে আমাদের এক আত্মীয় তার হিন্দি প্রতিশব্দ না জানায় দোকানদারকে বলেছিলেন, “আপকে পাস দেয়াল কা থাপ্পড় হ্যায়?” প্রবাদপ্রতিম ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে হিন্দিভাষী ট্রাম কন্ডাক্টরের অনবদ্য বাক্যালাপ আমরা আশা করি ভুলে যাইনি। 'সোনার কেল্লা' ছবিতে জটায়ু বলেছিলেন, "দূর মশাই, আমি গড়পারের ছেলে, হিন্দি কি কেউ সাধে বলে নাকি?" ঠিক কথা বলেছিলেন। এবং এটাই লাখ কথার এক কথা। হিন্দি কেউ সাধে বলে না। কোনও ভাষাই কেউ সাধে বলে না। প্রায় সব মানুষই একটা বিশেষ ভাষা ব্যবহার করে মূলত দু-তিনটে কারণে। প্রধানত, সে সেটাই মাতৃভাষা হিসেবে শিখেছে এবং দ্বিতীয় আর কোনও ভাষা জানে না বলে। দুই, যার সঙ্গে সে কথা বলছে, তার সঙ্গে কমিউনিকেট করার জন্য। তিন, একটা বিশেষ অঞ্চলে একটা বিশেষ ভাষাই চালু এবং সে অঞ্চলে বাণিজ্য করে সে ভাষায় কথা না বললে তার দিন গুজরান হবে না, সেইজন্য। সোজা কথায়, ভাষার ব্যবহারিক দিকটাই ভাষা ব্যবহারের মূল বা প্রায় একমাত্র কারণ।
কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন শিক্ষানীতির খসড়ায় প্রত্যেকটা রাজ্যে তৃতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দি গুঁজে দেওয়ার যে চেষ্টা হল, তার বিরুদ্ধে প্রধান এবং সঠিক অভিযোগ – সেই সিদ্ধান্ত নেহাতই রাজনৈতিক সংকীর্ণতাপ্রসূত এবং এই সিদ্ধান্ত ভাষার এই ব্যবহারিক দিকটা পুরোপুরি উপেক্ষা করে উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া। যে কোনও মানুষই সোজাসাপ্টা দেখলে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করবেন। এই নিয়ে সবচেয়ে বেশি চেঁচামেচি করেছে তামিলরা। মায়, কেন্দ্রীয় সরকারের বন্ধুদল আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাঘাম অবধি।
আরও পড়ুন
প্রশান্ত কিশোর : বাংলা রাজনীতির ময়দানে
বাঙালি কেন যথেষ্ট চেঁচামেচি করল না বা করছে না, সেই নিয়ে অনেকে আক্ষেপ করছেন এবং সেই নিয়ে নিজেরা যথেষ্টর বেশিই চেঁচামেচি করছেন। এই চেঁচামেচিটা একটু বেশিই কানে লাগছে। কেন, সেটা বুঝিয়ে বলি।
পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অঞ্চলে হিন্দির কোনও চল নেই। গ্রামের মানুষের একমাত্র ভাষা বাংলা। ভৌগোলিক এবং অন্যান্য কারণে সেই বাংলার কথ্যরূপে নানা পার্থক্য রয়েছে, এমনকি, বসিরহাটের মেছো ভেড়ির মৎস্যজীবী, বান্দোয়ানের জঙ্গলমহলের মানুষের বাংলা যে আদৌ বুঝতে পারবে, সেটাও জোর দিয়ে বলা যায় না। কিন্তু, শেষপর্যন্ত, দু’জনের ভাষাই বাংলা। নিজের নিজের মতো করে বাংলা। পশ্চিমবঙ্গের সব স্কুলে যদি তৃতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দি শেখানোও হয়, অপ্রয়োজনীয়তার কারণেই সেটার খুব বেশি টিকে থাকার কথা নয়। সাধারণভাবে ভাষার প্রচার যেভাবে সবচেয়ে বেশি হয় – ব্যবসাবাণিজ্য এবং প্রচারমাধ্যম – এই দুটোই এই রাজ্যের গ্রামে বাংলাতেই চলে। গ্রামের লোক বাংলা সিরিয়াল ফেলে হিন্দি সিরিয়াল দেখছেন, এরকম বড়ো একটা ঘটে না সেটা এ কারণে নয় যে, হিন্দি সিরিয়াল বাংলা সিরিয়ালের চাইতেও খারাপ। মূলত, তাঁরা হিন্দি বোঝেন না বলে, আর যদি বা শুনে শুনে খানিকটা আন্দাজ করতে পারেন, নেহাত পেটের কাছে চাকু না ঠেকালে তাঁরা হিন্দিতে কথাবার্তা শুরু করবেন, এটা কষ্টকল্পনা। শোনা আর প্রয়োজন না-থাকলে শুনে শেখা – এ দুটো কাজের মধ্যে প্রচুরপ্রচুর তফাত। অর্থাৎ, একটা বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের উপর চাইলেও হিন্দি চাপানো যাবে না, বাস্তবতার কারণেই।
তর্ক উঠতেইপারে, উর্দু-হিন্দি মেশানো 'হিন্দুস্তানি' বা 'মাগধি' বা 'ব্রজভাষা' বা 'মৈথিলি' বা 'ভোজপুরি' বা 'আওয়াধি'কে কি আগ্রাসী ‘রাজভাষা’ হিন্দি অনেকটাই কোণঠাসা করে ফেলেনি? এই কাণ্ডটা ঘটেছে তো বটেই, কিন্তু এটা বিভিন্ন জনজাতির আত্মপরিচয় ধ্বংসের প্রক্রিয়ার সমান্তরালভাবে ঘটেছে। ভাষা সেই ধ্বংসলীলার একটা অন্যতম অস্ত্র। নানা জনগোষ্ঠীকে তার জাতিচরিত্রের বৈচিত্র্য ঘুচিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং সাবর্ণ আধিপত্যবাদের তলায় পিষে মারার যে রাজনীতি, হিন্দিভাষার বীজ চারিয়ে দেওয়াটা সেই রাজনীতিরই প্রত্যঙ্গ। জাত হিসেবে চামার বা নাপিতকে ব্রাহ্মণ তার পায়ের তলাতেই রেখেছে, কিন্তু ভাষার বিভিন্নতা ঘুচিয়ে জনগোষ্ঠীগুলোকে একটা সাধারণ বস্তুপিণ্ডে পরিণত করেছে।
তবে এই কাজটা মনুর উত্তরাধিকারীরা যে করতে পেরেছেন, তার একটা বিরাট কারণ, ভাষা-পরিবার এবং ব্যাকরণের দিক থেকে উপরের ভাষাগুলো আর হিন্দি একই শ্রেণির। কিন্তু দক্ষিণ ভারতীয় ভাষাগুলো বা বাংলা বা ওড়িয়া কিংবা অহমিয়াকে এত সহজে পর্যুদস্ত করা মুস্কিল । হিন্দির সঙ্গে গঠন, মেজাজ আর ব্যাকরণের বিভিন্নতার কারণেই নয়। ভোজপুরি বা হিন্দুস্তানি-র গলা যে হাঁড়িকাঠে ফিট করে গিয়েছে, কন্নড়, তামিল বা বাংলা সেখানে ফিট করবে না।
শহর আর মফস্বলের গল্পটা অবশ্যই অন্যরকম। সেখানে ব্যবসা মূলত হিন্দিভাষী মানুষের দখলে । চাইলেও হিন্দি ঠেকাতে পারা কঠিন। তা হলে হয় আপনাকে ঘটিবাটি চাঁটি করতে হয়, নইলে চাটিবাটি গুটিয়ে অন্য কোথাও নিজের মতো দোকান দিতে হয়।
কিন্তু হিন্দিভাষাটা একটা অছিলামাত্র। হিন্দি শেখানোটা কোনও মহান উদ্দেশ্য আদৌ নয়, আসল কারণ হল, সাংস্কৃতিক একমাত্রিকতা। ঠিক যেভাবে স্বেচ্ছায় বা 'পরিস্থিতি'-র চাপে বাঙালি বিয়েতে মেহেন্দি হয়, লেডিজ সঙ্গীত হয়, বাজি ফাটে, বরকে ঘোড়ায় চাপিয়ে 'বারাতি'রা নাচতে নাচতে আসে, বিয়ের মণ্ডপে ডি জে -র গানে আমন্ত্রিতরা কোমর দোলান, ফুচকা দিয়ে খাওয়া শুরু করেন, সেই কারণেই হিন্দি নিয়ে চিন্তার কারণ রয়েছে। ভূগোল এবং ইতিহাস – দুটো কারণেই পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দিবলয়ের লাগোয়া একটা জনজাতি। কাজেই, হিন্দির ব্যাপারে তামিলদের তুলনায় অভ্যেস এবং সহিষ্ণুতা এখানকার বাঙালির বেশি হবে, এটা ধরেই নেওয়া যায়।
আরও একটা বুনিয়াদি তর্ক উঠতে পারে –হোমোজেনিটি মন্দ কী ? বাঙালি আর ইউপির সংস্কৃতি যদি মিলেমিশে যায়, সে কি খারাপ? অবশ্যই না। মানুষের সাংস্কৃতিক ইতিহাস দেওয়া নেওয়া-র ইতিহাস। কিন্তু, শুধু 'নিবে'-র ইতিহাস না। আর ইতিহাসই শেখায়, 'দিবে'-র জায়গায় শুধু 'নিবে'-ই যদি থেকে যায়, তাহলে নিভে যেতেও বেশি সময় লাগে না।
এই নিভে যাওয়াটা পছন্দ করবার বিষয় নয় কারণ আমরা কেউ হোমোজেনিটির পক্ষে না। গোটা দেশ এবং বিশ্বজুড়ে আমাদের বন্ধু আছেন, একান্ত ভালোবাসার জন আছেন। কিন্তু সেই ভালোবাসা জ্ঞাপন করার জন্য আমাকে তাঁদের মতো হয়ে যেতে হচ্ছে না। হবেও না।
আরও পড়ুন
মহুয়া মৈত্র, সংসদে এক নতুন তারকা
বরং এক পা এগিয়ে বলা যায় , ভোগবাদের এই ক্রেতাযুগে গোটা পৃথিবীই একটা একমাত্রিকতার দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে, যে মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন, তিনি আহিরিটোলার বাঙালি না নিউইয়র্কের ইয়াঙ্কি, তাতে খুব একটা যায় আসে না আর। কিন্তু মানুষ তো শুধু পাবজি খেলে আর হোয়াটসঅ্যাপ করে বা দশ মাইল দূর থেকে বোতাম টিপে ওয়াশিং মেশিন চালু করার লক্ষ্য নিয়ে বেঁচে থাকে না। তার শিল্প লাগে, সাহিত্য লাগে, সংগীত লাগে। হোমোজেনিটি এই উপাদানগুলোর বিরাট শত্রু। 'দিবে আর নিবে' আর 'চলো একদেহে হই লীন' – এ দুটো এক জিনিস নয়।
হিন্দি একটা ভাষামাত্র। কাজে লাগল বা লাগল না। কিন্তু, যে শক্তি চায়, আপনার বেঁচে থাকাটা বরাবরের মতো পালটে গেলে তার মাল বেচার সুবিধে – সে স্মার্টফোনই হোক, বা 'আচ্ছে দিন'-এর স্বপ্ন, ভাষা তার হাতে একটা সিঁদকাটি। ওই সিঁদকাটিটার দিকে খেয়াল রাখা দরকার।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
