বিপ্লবী নলিনী দাসের জীবন ও সংগ্রাম
তাঁর জন্ম বরিশালের উত্তর সাহরাজপুরে, ১৯১০ সালে। ছোট থেকেই চঞ্চল ও বিদ্রোহী ছিলেন তিনি। ৫ম শ্রেণিতে পড়ার সময় হরতাল ও ধর্মঘটে যোগ দিয়ে কারাবরণও করেন। ১৯২৮ সালে ভোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করে বরিশাল বি এম কলেজে আই এস সি ক্লাসে ভর্তি হন। বরিশালে সেসময় তিনি একজন ভালো ফুটবলার ছিলেন। পরীক্ষার আগে কলকাতা ‘মেছুয়াবাজার বোমা মামলা’য় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে আত্মগোপন করেন। তিনি নলিনী দাস। ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের এক উজ্জ্বল বিপ্লবী।
পলাতক অবস্থায় ১৯৩০ সালে কলকাতার পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টকে হত্যা প্রচেষ্টা মামলা’য় তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৩১ সালে হিজলি জেলে রাজবন্দিদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণকালে তিনি সেখানে ছিলেন। ওই বছর ডিসেম্বর মাসে তিনি ও ফণী দাশগুপ্ত হিজলি জেল থেকে পালান। পলাতক অবস্থায় ১৯৩২ সালে ফরাসি অধিকৃত চন্দননগরের যে বাড়িতে তিনি ও বিপ্লবী দীনেশ মজুমদার, বীরেন রায় আত্মগোপন করে থাকতেন, সেই বাড়িটিকে পুলিশ ঘেরাও করলে তাঁরা চার ঘণ্টাব্যাপী খণ্ডযুদ্ধ করেন। এই খণ্ডযুদ্ধে চন্দননগর পুলিশ কমিশনার কিয়ুব সাহেব নিহত হন এবং বীরেন রায় আহত অবস্থায় ধরা পড়েন।। আহত হয়েও পালিয়ে যান দীনেশ মজুমদার ও নলিনী দাস।
আরও পড়ুন
‘ইজ অ্যান্ডারসন স্টিল অ্যালাইভ?’
১৯৩৩ সালে, কলকাতায় কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটে যে বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন, ২২ মে পুলিশ সন্ধান পেয়ে সেই বাড়িটিকে ঘেরাও করে আক্রমণ করলে উভয়পক্ষে গুলিবিনিময় চলে। দীনেশ মজুমদার, জগদানন্দ মুখার্জি ও তিনি শেষ বুলেট পর্যন্ত লড়াই করে আহত অবস্থায় ধরা পড়েন। বিচারে জগদানন্দ মুখার্জি ও তিনি যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর দণ্ডে দণ্ডিত হয়ে ১৯৩৪ সালে আন্দামানে প্রেরিত হন। এই মামলায় দীনেশ মজুমদারের প্রাণদণ্ড হয়। আন্দোলনের চাপে সরকার ১৯৩৮ সালে আন্দামান থেকে তাদের কলকাতায় ফিরিয়ে আনলেও ৩০ জন রাজবন্দিসহ নলিনী দাস-কে ‘ভয়ানক বিপ্লবী ব্যক্তি'-রূপে চিহ্নিত করে সেপ্টেম্বর ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত কারাগারে আটক রাখে। মুক্তি পেয়েই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির নিষ্ঠাবান কর্মী হিসাবে কাজ করেন। দেশ বিভাগের পর বরিশালে চলে যান।
তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ভোলা কৃষক আন্দোলনের কাজে সংশ্লিষ্ট থাকায় ১৯৫০ সালে পাক সরকার কর্তৃক গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন এবং ১৯৫৫ সালে ছাড়া পান। শুধু কৃষক আন্দোলনে না, পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য থেকে মুক্তি পাবার জন্য সেখানে যে গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী শক্তি সংগঠিত হচ্ছিল তারও তিনি সক্রিয় অগ্রণী কর্মী ছিলেন। ১৯৫৯ সালে আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখল ও সামরিক আইন জারির পর তিনি আত্মগোপন করেন। তিনি জুলাই থেকে ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পলাতক অবস্থায় মুক্তিফৌজের রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠন করেছেন। তাঁর রচিত 'স্বাধীনতা সংগ্রামে দ্বীপান্তরের বন্দি’ গ্রন্থে তাঁর ২৩ বছরের কারাবাস ও ২০/২১ বছরের পলাতক জীবনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। ১৯৮২ সালে মারা যান তিনি।
(ঋণ – দ্য লেজেন্ড অব অগ্নিযুগ / জয়ন্তকুমার ঘোষ)