ছ’হাজার বছরের দীর্ঘ যাত্রায় সত্যের খোঁজ, শিশু-ভাবনা বাঁধা যেন একই যোগসূত্রে
কলকাতার ইন্ডিয়ান মিজিয়ামের এককোণে রাখা একগুচ্ছ মাটির প্রদীপ। প্রদীপগুলো তৈরি করেছে বিভিন্ন স্কুলর বাচ্চারা। উপলক্ষ দীপাবলির উৎসব। অন্যদিকে ভারতীয় যাদুঘরে হরপ্পা-র সময়কার খেলনা ও পুতুল বিষয়ক একটি প্রদর্শনী শুরু হয়েছিল শিশু দিবস উপলক্ষে। ১৮ নভেম্বর শুরু হয়ে যা শেষ হল সম্প্রতি। প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে চোখ পড়ে যায় প্রদীপগুলোর দিকে। আর তখনই এক আশ্চর্য দরজা খুলে যায় মনের মধ্যে। দীপাবলির প্রদীপের গায়ে আজকের যুগের ছোট পড়ুয়ারা নকশা করেছে কাঠি দিয়ে ছোট ছোট ছিদ্র করে। অন্যদিকে প্রায় একই ধরনের ছোট ছোট ছিদ্র করা নকশা দেখা যাচ্ছে এখানে প্রদর্শিত সিন্ধু সভ্যতার শিশুদের খেলনায়। ঠিক তখনি মনে হতে থাকে যে, ইউনিভার্সাল ট্রুথ আর ইউনিভার্সাল চাইল্ড শব্দ দুটির তাৎপর্য।
এই শিল্প নমুনাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যুগান্তধরে শিশুদের সৃষ্টিশীল কর্মের রূপ যেন একই থেকে গিয়েছে। যুগ ও সময়ের ঘূর্ণাবর্তে তাঁর দ্রুততা বৃদ্ধি পেয়েছে, আকৃতির পরিবর্তন ঘটেছে কিন্তু শিশুর চিন্তাভাবনা ও মননজাত শিল্পের মধ্যে সামঞ্জস্য আজও বর্তমান।
হরপ্পায় পোড়ামাটির তৈরি ষাঁড়, গণ্ডার, কুকুর, খেলনাবাটির বাসনপত্র পুতুলের গায়ে ছোট ছোট বুটি বুটি কাটা যা আমরা দেখছি, সেই একই নির্মাণ শৈলীই যেন এই যুগে ছোটদের তৈরি মাটির প্রদীপের গায়ে দেখলাম। হরপ্পা থেকে আজও শিশুদের মধ্যে বাহিত হচ্ছে সেই অদৃশ্য ধারা। গ্রামবাংলার বেশ কিছু পুতুলের গঠন-প্রকরণে এই প্রাচীন শৈলীর ছাপ বর্তমান। ষষ্ঠী পুতুল, মা-পুতুল অথবা আটা-ময়দা দিয়ে হাতে টেপা গোল্লা পাকিয়ে তৈরি করা পুতুলের এই শৈলি হরপ্পা ও মোহেন-জো-দড়ো’র উত্তরাধিকার সূত্রে আজও বহমান। যে কারণে পুতুলগুলি চরিত্রগত ভাবে কালাতীত। ভারতীয় জাদুঘরে প্রদর্শিত পুতুলগুলির মধ্যে আরও দেখা যায় এক ধরনের মোবিলিটি অর্থাৎ চলনশীলতা। পশুগুলি কর্মরত, জড় নয় সজীব। গৃহপালিত পশু নানাভাবে মানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গরু, ষাঁড়, কুকুর ইত্যাদি গৃহপালিত পশুগুলি দুধ দেয় চাষবাসে সহায়তা করে। শিশুরা এই সব গৃহপালিত পশুদের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বকে সহজেই বুঝতে শেখে পুতুলের মাধ্যমে।
মিউজিয়ামের একজন আধিকারীক অর্ণব বসু জানালেন- হরপ্পা ও মোহেন-জো-দড়োর সভ্যতার খেলনা তাদের চলনশীলতা বৈশিষ্ট্যের জন্য বর্তমান গেমফোবিয়ার যুগের শিশুদের মনেও একটা আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে। মিউজিয়ামের এডুকেশন অফিসার সায়ন ভট্টাচার্যের কথায়– বইয়ে পড়া হরপ্পা সভ্যতার ছোট ছেলে-মেয়েরা কী দিয়ে খেলা করত সেগুলি চাক্ষুশ জন্য আজকের শিশুদের মধ্যেও দেখা গেল প্রচণ্ড আগ্রহ। শিশুদিবস উপলক্ষে ভারতীয় জাদুঘরে আয়োজিত এই প্রদর্শনী হরপ্পা ও মোহেন-জো-দড়োর শিশুদের সাথে আত্মিক মেলবন্ধন ঘটালো আজকের যুগের শিশুদের। হরপ্পা যুগের সাথে যোগ স্থাপন করল ২০১৬ সালের শিশুরা।