গোসাবায় হ্যামিল্টন সাহেবের স্কুলের হাল-হকিকত

‘সমস্ত ভারতবর্ষের আদর্শ হোক গোসাবা’ – বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ

পিছিয়ে থাকা ভারতীয় সমাজকে দ্রুত এগিয়ে নিতে একদিকে সুশিক্ষার আয়োজন অন্যদিকে গ্রাম পুনর্গঠনে আর সমবায় গড়ায় জোর দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি তাঁর সে ভাবনার প্রয়োগ ঘটাতে, এমনকি বৃদ্ধ বয়সেও ছুটে ছুটে গেছেন দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে। তেমন ভাবনার এক শরিক হলেন ড্যানিয়েল হ্যামিল্টন(১৮৬০-১৯৩৯)। তিনি এসেছিলেন সুন্দরবন অঞ্চলে ব্যবসা করতে। সে অঞ্চলের দারিদ্র ও অশিক্ষা দেখে, গোসাবা দ্বীপে গড়ে তুললেন রুর্যাঞল রিকন্সট্রাকশন ইন্সটিটিউট ১৯৩২ সালে। সত্তর পার হওয়া রবীন্দ্রনাথ সে বছরই গেলেন তা দেখতে।

এখনও সুন্দরবনের দ্বীপগুলিতে যাতায়াত খুবই কষ্টসাধ্য, সেকালে তো আরও বিপদসঙ্কুল ছিল সে যাত্রা। গোসাবায় সমবায় শক্তির বহিঃপ্রকাশ দেখে বিস্মিত রবীন্দ্রনাথ লিখছেনঃ স্বদেশী সমাজের যে স্বপ্ন একদিন দেখেছিলাম, এখানে তার পরিপূর্ণ রূপ দেখে মুগ্ধ হলাম। সমস্ত ভারতবর্ষের আদর্শ হোক গোসাবা।

কী হল? ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া ভারতবর্ষই যেন গোসাবার আদর্শ হল। বৃহত্তর সমাজের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে(চাহিদাটা যে মেকলের শিক্ষাদর্শন মেনে রাষ্ট্রশক্তির গড়ে তোলা চাহিদা তা এখন অন্তত স্পষ্ট) এখানেও চাওয়া হল প্রথাগত সাধারণ শিক্ষার আয়োজন, খেতে না পাওয়া মানুষও চায় তার সন্তানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ডিগ্রি!

হ্যামিল্টনের গড়া সেই আদর্শ বিদ্যানিকেতন আজ ‘আর আর গভঃ স্পনসর্ড উচ্চ মাধ্যমিক ইন্সটিটিউশন’। দেশের অন্য পাঁচটা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মতো এখানেও এখন কলা, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগ পড়ানো হয়। কারিগরী শিক্ষার আয়োজন নিশ্চিহ্ন হয়নি বটে, তবে তা গতি হারিয়েছে।

কেমন চলছে সে বিদ্যালয়? হ্যামিল্টনের স্বপ্ন ডুবে গেছে, ভেসে গেছে রবীন্দ্রনাথের গ্রাম পুনর্গঠন চিন্তা, আজ সে বিদ্যালয় জেগে আছে ভিন্ন সুরের গানে গলা জুড়ে ও ভিন্নতালের নাচে পা মিলিয়ে। বিদ্যালয়ে ঢোকার মুখে চোখে পড়ে প্রায় শুকিয়ে ওঠা ছোট্ট একটা ডোবা আর এক স্মারক – খ্রিষ্টান হ্যামিল্টন সাহেবের সংগ্রহ করা দুটো ইট যা তিনি মহান সমাজসেবী ও ধর্মপ্রচারক ডেভিড লিভিংস্টোনের পুড়ে যাওয়া প্রিয় গির্জা থেকে এদেশে বয়ে এনেছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন ঐ ইটদুটো দিয়ে গড়া তাঁর সংস্থার ভিত্তি স্থাপন করবেন মহাত্মা গান্ধি। গান্ধিজী আসতে পারেননি, পরে হলেও এসেছিলেন তাঁর প্রিয় সাথী মহাদেব দেশাই।

প্রধান শিক্ষক মহাশয়ের আক্ষেপ, যদি চারদিকে দেওয়াল তোলা যেত! কিছু অংশে দেওয়াল না থাকায় অনেক জমি বেদখল, বাইরের লোকজন এসে বিদ্যালয়ের পুকুরে স্নান করে। কে আটকাবে? একজন প্রাক্তন শিক্ষক, ঐ স্কুলেরই প্রাক্তনী, বলছিলেন, ওদের বোধই নেই। বিদ্যালয় যে মন্দিরের চেয়েও পবিত্র এক স্থান সেই বোধটাই হারিয়ে গেছে। একে পরিষ্কার রাখার দায় কেউ তাই মানে না।

পুকুরের জলেই মিড-ডে মিলের বাসনপত্র ধোয়া হয়। সব ছেলেমেয়ে কেন মিড ডে মিল খায় না তা জানেন না প্রধান শিক্ষক। খাবারের মান ভাল নয়। অথচ এখনও বিপুল জমি আছে স্কুলের দখলে। 

ছেলেমেয়েরা পুকুরের জলেই হাতমুখ ধোয়। সামান্য তফাতে ফেলা হয় যাবতীয় জঞ্জাল। ছেলেমেয়েদের পৃথক টয়লেট আছে বটে কিন্তু ছেলেদের টয়লেটে জল নেই। পাইপের জল কই?

দিন দিন শিক্ষার্থীসংখ্যা কমছে। কেন? প্রধান শিক্ষক বললেন আশেপাশে আরও স্কুল হয়েছে, সেখানে যাচ্ছে কিছু। আর এখানে হিন্দু পরিবারে শিশুসংখ্যা কমছে।

বললাম, শিশুসংখ্যা বিষয়ে আপনার তথ্য তো সরকারি পরিসংখ্যানের সাথে মেলে না। তিনি দাবি করেই চললেন, শিশু বাড়ছে মুসলমান পরিবারে, কিন্তু তারা এই স্কুলে আসে না। তাছাড়া, তিনি দাবি করলেন, এখন তো স্কুলের অভাব নেই। যে যার সুবিধামতো স্কুলে নাম লেখায়। সে দাবি অবশ্যই সত্য।

কিন্তু, কোনও শিক্ষার্থীরই কি এই স্কুলে আসার ইচ্ছে হয়? হতে পারে? তবু তারা আসে। হাস্যমুখ কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থীদের দিকে তাকালে বোঝাই যায় না এত সমস্যা তাদের স্কুলের। জল-আলো নেই ল্যাবগুলিতেও। ধুলোর পুরু আস্তরণ। নেই ন্যূনতম প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। কী শিখছে? কেমন করে শেখাচ্ছেন টাইট্রেশন? রসায়নের শিক্ষিকাকে সে প্রশ্ন করায় তিনি কেবল তাঁর উদ্যমের বিবরণ দিলেন। পদার্থবিদ্যায় কোনও শিক্ষকই নেই! তবু তো নানা পরীক্ষায় আমাদের ছেলেমেয়েরা ভাল ফল দেখাচ্ছে এতেই তুষ্ট বা তৃপ্ত স্থানীয় মানুষ, শিক্ষকরা।

আর শিক্ষার্থীরা? তারা নিজেদের জন্য, নিজ সমাজের জন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আগ্রহী। তারা জানতে চায়, শিখতে চায়। তাইতো ভরসা জাগে যে একদিন প্লাস্টিক দূষণ থেকে মুক্ত হবে এই দ্বীপ; নদীকে বইতে হবে না ভ্রমণার্থীদের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল, থার্মোকলের থালাবাটি, দূর হবে শব্দদূষণ, সাইকেল রাখার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা হবে; সবার টয়লেটে জল থাকবে। পরিবেশ দপ্তরকে পাশে নিয়ে কাজ শুরু করেছে তারা। জয়যুক্ত হোক তাদের উদ্যোগ।

Developed by DXDasia