নলেন গুড় ও আফসারদের পরিযায়ী জীবন

খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড়ের নাম নলেন গুড় হল কীভাবে

লেন গুড় ভালোবাসে না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। কিন্তু খেজুরের রস থেকে কীভাবে গুড় তৈরি হয় এমন তথ্য বোধহয় অনেক মানুষই জানেন না। প্রশ্ন হল, খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড়ের নাম নলেন গুড় হল কীভাবে! এর উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, এই শব্দের সাথে দ্রাবিড় সভ্যতার যোগ আছে। মনে করা হয়, প্রাচীন দক্ষিণ ভারতে এর ব্যবহার ছিল, কারণ বাংলা-দ্রাবিড় অভিধানে ‘ণরকু’ শব্দের অর্থ হল ছেদন করা বা কাটা। অন্যদিকে মাননীয় হরিনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ অভিধান মতে নরুন বা নরশনি মানেও ছেদন করা বা কাটা, এক্ষেত্রে নরুন হল গ্রামের নাপিতের ক্ষৌর অস্ত্র, কিন্তু গ্রামে বসবাসের সুযোগে দেখেছি খেজুর গাছ থেকে রস বের করতে গুড় প্রস্তুতকারীরা প্রথমে দা দিয়ে করে চেঁছে দেয় তারপর নরুনে ফুটো করে ও তার থেকে রস চুঁইয়ে চুঁইয়ে হাঁড়িতে পড়ে। নরুনে ফুটো করে সেখান থেকে একটা বাঁশের ছিলা লাগিয়ে দেওয়া হয় হাঁড়ি পর্যন্ত, এই পদ্ধতিতেও নল দিয়ে রস চুঁইয়ে পড়া থেকে নলেন গুড় নামের উদ্ভব হতে পারে বলে ধরে নেওয়া হয়। তবে শব্দের অর্থ যাই হোক, সাহিত্য থেকে বিজ্ঞান সর্বত্র নলেন গুড়ের স্তুতি শুনতে পাওয়া যায়। বিজ্ঞানের মতে, নলেন গুড় উচ্চ ক্যালোরি যুক্ত খাবার, অথচ অ্যান্টি-ফ্যাটের উৎস এটি। তাই যুগে যুগে ঘরে ঘরে প্রতিটি শীতে এর চাহিদা প্রচুর।

সাহিত্য থেকে বিজ্ঞান সর্বত্র নলেন গুড়ের স্তুতি শুনতে পাওয়া যায়। বিজ্ঞানের মতে, নলেন গুড় উচ্চ ক্যালোরি যুক্ত খাবার, অথচ অ্যান্টি-ফ্যাটের উৎস এটি। তাই যুগে যুগে ঘরে ঘরে প্রতিটি শীতে এর চাহিদা প্রচুর।

পূর্ব বর্ধমানের উত্তর রাঢ়দেশ তথা কেতুগ্রাম ও গঙ্গাটিকুরি অঞ্চলে নলেন গুড়ের ইতিহাসের জড়িয়ে আছে এক বিচিত্র পরিযায়ী জীবন। যেমন উত্তরের শীতের দেশগুলি থেকে পরিযায়ী পাখিরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে উড়ে আসে আর গোটা শীতকাল তারা এখানে কাটিয়ে আবার ফিরে যায় তাদের শীতের দেশে, ঠিক এক রকমভাবে নদিয়ার দেবগ্রাম, কালীগঞ্জ, ধুবুলিয়া, তেহট্ট থেকে গুড় প্রস্তুতকারী বিভিন্ন মানুষ শীত পড়তেই প্রতিবার ঘাঁটি গাড়েন কেতুগ্রাম ও গঙ্গাটিকুরির আশেপাশে বন্দর, গোমাই, শিবলুন, গঙ্গাটিকুরি, বালুটিয়া প্রভৃতি গ্রামগুলিতে। আফসার শেখ, কাদের মোল্লা, গফুর আলি-রা নভেম্বর মাসের মাঝের দিকে বিভিন্ন গ্রামে আসেন আর মার্চের শুরুতে আবার ফিরে যান। নভেম্বর মাসে এসে প্রথমেই খেজুর গাছ সমৃদ্ধ কোনও ডাঙা জায়গাকে তাঁরা বেছে নেন, বিশেষত পুকুরপারের পাশে কোনও ডাঙাকে। তারপর নিদিষ্ট জমির উপর খেজুর গাছের মালিকানা অনুযায়ী, সেই সব খেজুর গাছের মালিকদের কাছ থেকে আফসার, গোফুররা ইজারা নেন এবং ইজারা অনুযায়ী নিদিষ্ট অনুপাতে গুড় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

পূর্ব বর্ধমানের উত্তর রাঢ়দেশ তথা কেতুগ্রাম ও গঙ্গাটিকুরি অঞ্চলে নলেন গুড়ের ইতিহাসের জড়িয়ে আছে এক বিচিত্র পরিযায়ী জীবন। যেমন উত্তরের শীতের দেশগুলি থেকে পরিযায়ী পাখিরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে উড়ে আসে ।

তারপর তাঁরা ভোর রাত থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রস আনা, গুড় তৈরি এবং বিক্রিতে ব্যস্ত থাকেন। বিকালের পর বিভিন্ন খেজুর গাছে গা চেঁচে নরুন দিয়ে ফুটো করে ফাঁকা হাড়িগুলো ঝুলিয়ে দিয়ে আসা হয় আর ভরতি হাড়িগুলো নিয়ে আসা হয়। পরেরদিন ভোরে সেই রস নামিয়ে এনে বিভিন্ন হাড়ি থেকে ঢালা সমস্ত রস একত্র করে বড়ো পাত্রে ফোটানো হয়। ফুটিয়ে ফুটিয়ে ধীরেধীরে রস থেকে গুড় প্রস্তুত করেন তাঁরা। গুড়কে নিদিষ্ট পদ্ধতির মাধ্যমে ঠান্ডা করে পাটালি তৈরি করা হয়, তাই নলেনগুড়ের এই দুই ধরনকে ঝোলাগুড় ও পাটালি গুড় বলেই পরিচিতি পেয়েছে। এই সময়েই আশেপাশে কিছু খদ্দের জুটে যায় তাই বিক্রিবাটাও শুরু হয়ে যায়। বাকি অবিক্রিত গুড় সারাদিনের বিভিন্ন সময়ে বিক্রি হয়। দুপুরের পর আবার গাছ থেকে ভরতি হাড়িগুলো আনা হয় আর ফাঁকা হাড়িগুলো ঝুলিয়ে দিতে আসা হয়। তারপর একইভাবে সকালের মতো বিকালের দিকেও গুড় প্রস্তুত করা হয়। দিনে দুবার এইভাবে প্রস্তুত হয় গুড়।

গুড়প্রস্তুতকারীদের কাছ থেকে সরাসরি নলেন গুড় কিনলে তার দাম এবছর পড়েছে ৭০ টাকা প্রতি কেজি এবং পাটালি ৮০ টাকা প্রতি কেজি। যদিও গুড়প্রস্তুতকারী কাছ থেকে গুড় নিয়ে ফড়ে ব্যবসায়ীরা দোকানে বা বাজারে বিক্রি করে তা ১১০ এবং ১২০ টাকায়। বাজার থেকে সাধারণ ক্রেতারা ১৪০ ও ১৫০ টাকায় ঝোলাগুড় ও পাটালিগুড় কেনে। এখান থেকে দেখলে প্রস্তুতিকারী ও বাজার থেকে কেনা সাধারণ ক্রেতার মধ্যে একই জিনিসের দামে দ্বিগুণ ফারাক লক্ষ করা যায়।

তবে আফসার, গোফুরদের এই সব দাম বিষয়ক তথ্যে কোনও আফশোশ নেই। অল্প দামের বিক্রিতেই তাঁরা খুশি। মাঠের দিকে উঁচু পুকুরপারের পাশে তৈরি পাতার ছাউনিঘরে শীতের দিনে রাত কাটিয়ে ভোররাত থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করেও তাঁদের অভিযোগ নেই তেমন। শীতের শেষে যখন কিছু টাকা পয়সা নিয়ে নিজের ঘরে ফিরবেন, তখন তাঁদের ঘরের লোকের মুখগুলো হাসিতে ভরে উঠবে – তাতেই তাঁরা খুশি। তবে পরের বছর শীত পড়তেই আবার কেতুগ্রাম-গঙ্গাটিকুরিতে ফিরে আসবেন, ততদিন অপেক্ষাটুকু জিয়নো থাক।

Developed by DXDasia