গোরাচাঁদ পীর এবং চন্দ্রকেতুগড়ের পতন

তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা অলৌকিক ঘটনার কিংবদন্তীও

চন্দ্রকেতুগড়ের সূত্র ধরে স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে গোরাই গাজী বা গোরাচাঁদ পীরের কথা। শোনা যায়, তাঁর জন্ম আরবের মক্কা নগরীতে। প্রকৃত নাম পীর হজরত শাহ সৈয়দ আব্বাস আলী গাজী। তিনি ভারতবর্ষে আসেন ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে(আরকটি মতে, তিনি দিল্লিনিবাসী ছিলেন)। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরও ২১ জন আউলিয়া। এই ২২ জন প্রথমে বারাসাত মহকুমার রায়কোলা গ্রামের প্রান্তে এসে কিছুদিন অবস্থান করেন এবং তারপর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে যান। স্থানটি এখনও ‘বাইশ আউলিয়ার থান’ নামে পরিচিত।

কেউ কেউ বলেন, গোরাচাঁদ পীর ভারতেই হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং পরে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হন।  তাঁদের মতে, ‘গোরাচাঁদ’ কোনও মুসলমান পরিবার কর্তৃক প্রদত্ত নাম হতে পারে না। আবার আরেকটি সূত্র থেকে জানা যায়, চন্দ্রকেতুর রানি কমলা দেবী তাঁকে দেখে মুগ্ধ হয়ে ‘গোরাচাঁদ’ নামে সম্বোধন করেন। যদিও এই নামকরণের সঙ্গে স্পষ্টতই শ্রীচৈতন্যের কোনও মিল নেই, কেননা তাঁর জন্ম(১৪৮৬) উল্লিখিত ঘটনাবলির অনেক পরে। বাইশ আউলিয়ার সঙ্গে কল্যাণী ঘোষপাড়ার কর্তাভজা সম্প্রদায়ের সংযোগ অনুমান করেছেন কেউ কেউ, তবে আমার মতে, গোরাচাঁদ পীরের সময়কাল চৈতন্য ও সর্বোপরি আউলচাঁদের আবির্ভাবের অনেক আগেই হওয়ায় এই অনুমান অর্থহীন।

প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, গোরাচাঁদ চন্দ্রকেতুগড়ে এসে রাজা চন্দ্রকেতুকে তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন করেন(যেমন লোহার বেড়ায় চাঁপাফুল ফোটানো, যে-কারণে স্থানটি পরিচিত হয়েছে ‘বেড়াচাঁপা’ নামে) এবং রাজাকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বলেন। চন্দ্রকেতু অস্বীকৃত হলে গোরাচাঁদের সঙ্গে যুদ্ধ হয় তাঁর। সেই যুদ্ধে যাওয়ার আগে চন্দ্রকেতু রানিকে বলে গিয়েছিলেন যে তিনি একটি দুটি পায়রা সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন, যদি পরাজিত হন, তাহলে  পায়রা উড়িয়ে দেবেন; যাতে রাজবংশের লোকেরা বিধর্মীর কাছে আত্মসমর্পণ করার পরিবর্তে আত্মহত্যা করে। যুদ্ধে চন্দ্রকেতু জয়লাভ করলেও, শত্রুপক্ষের কৌশলে উড়িয়ে দেয়া হয় পায়রাদুটিকে এবং রাজপরিবারের সকলে সেই পায়রা দেখে অশুভ ইঙ্গিত পেয়ে আত্মহত্যা করেন দীঘিতে। চন্দ্রকেতু ফিরে এসে এসব জেনে পরিবার হারানোর দুঃখে নিজেও সেই দীঘিতে আত্মহত্যা করেন এবং পতন হয় গড়ের।

মোটামুটি এই হল লোককথা অনুযায়ী চন্দ্রকেতুগড়ের পতনের কারণ। ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ থেকে সতীশচন্দ্র মিত্রের কিছু বক্তব্য প্রাসঙ্গিক হবে বোধ করি এই ক্ষেত্রে – ‘কোন রাজবংশের পতন বিবৃত করিতে হইলে, এ দেশের একটা চির প্রচলিত প্রথা আছে। যেখনে প্রকৃত ইতিহাস নির্ব্বাক, সেখানে একটা মামুলী গল্পের অবতারণা করিয়া পাদপূরণ করা হয়। পাঠান ও মোগল আমলে হিন্দু রাজগণ একটু বিদ্রোহী হইলেই তাহার বিরুদ্ধে নবাব-সৈন্য আসিত; ফলে হিন্দু রাজা পরাজিত ও বন্দী হইতেন। বন্দীকে লইয়া যাইবার সময়ে, তাহার সঙ্গে প্রায়ই দুইটি কপোত কপোতী যাইত। ইহা হইতে বুঝা যায়, তখন এই সংবাদবাহী কপোতের বিশেষ ব্যবহার ছিল। বিংশ শতাব্দীর সভ্য ইয়োরোপে সংবাদবাহী কপোত যেমন দুঃসাধ্য সাধন করিতেছে, ৫।৭ শত বছর পূর্বে বঙ্গেও কপোতের সে-গুণের সদ্ব্যবহার করা হইত। কিন্তু প্রভেদ এই, — বঙ্গীয় কপোতেরা পরিণামে উপকার না করিয়া সর্ব্বনাশই সাধন করিত। হিন্দুর নিকট যুদ্ধে পরাজয় অপেক্ষা যবনহস্তে জাতিকুল নাশই অধিকতর অসহনীয় ছিল। কারণ সে যুগে যবনের সহিত যুদ্ধে পরাজয়ের অর্থই জাতিধর্ম্ম নাশ। এ জন্য বন্দী রাজা সঙ্গে দুইটি পারাবত লইয়া রাজধানীতে যাইতেন, যদি তিনি নিস্কৃতি লাভ করিতেন, পারাবত সঙ্গেই থাকিত। আর যদি নিতান্তই তাঁর দেহান্ত হইত, তাহা হইলে তিনি পারাবত দুইটি ছাড়িয়া দিয়া মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিতেন। পারাবত উড়িয়া বাড়ী ফিরিয়া আসামাত্র জানা যাইত যে রাজার দেহান্ত ঘটিয়াছে; সুতরাং তাঁহার পরিবারবর্গ সকলে আত্মহত্যা করিয়া ইতিহাসের পৃষ্ঠা হইতে বংশচিহ্ন মুছিয়া ফেলিতেন। কিন্তু বঙ্গের পারাবতগুলি উড়িয়া আসা ছাড়া অন্য কোন বিশেষ শিক্ষা পাইত না, এবং তাহারা উড়িয়া আসিবার জন্য পাগল হইত। ইহার ফল হইত যে অনেক সময়ে রাজার নিষ্কৃতির আজ্ঞা হইলেও দৈবক্রমে পারাবত উড়িয়া আসিয়া বংশ নির্লোপ করিত, তখন রাজা ফিরিয়া আসিয়া নিজেও আত্মহত্যা করিতেন। …এ অঞ্চলেও কপোতের ভুল দ্বারা বহু রাজবংশ নির্ব্বংশ হইয়াছে; তন্মধ্যে দেবগ্রামের দেবপাল রাজা, দেউলিয়ার চন্দ্রকেতু, মহম্মদপুরের সীতারাম, হরিণাকুণ্ডুর শালিবাহন, ও বাড়ীবাথানের এই মুকুট রায়ের কথা উল্লেখযোগ্য।…’

সতীশচন্দ্রের লেখা থেকে এতটা অংশ উদ্ধৃতি দেওয়ার উদ্দেশ্য একটাই, গোরাচাঁদের সঙ্গে যুদ্ধে চন্দ্রকেতুর পতনের কথা যতই প্রচলিত হোক, ঐতিহাসিক দিক দিয়ে এর সত্যতা যাচাই করতে গেলে অনেক সন্দেহ উঁকি দেয়। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও বলেছেন, ‘বেড়াচাঁপা ও বসিরহাট অঞ্চলের অধিবাসিগণ রাজা চন্দ্রকেতু ও তাঁহার ধ্বংস সম্বন্ধে যে সমস্ত অলৌকিক কাহিনী বলিয়া থাকেন, সে সকল একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য নহে।’  তাহলে কী হতে পারে চন্দ্রকেতুগড়ের ধ্বংসের কারণ? আবার আশ্রয় নিই একটি ঐতিহাসিক উপন্যাসের। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় শ্রীপারাবত(প্রবীর কুমার গোস্বামী)-এর উপন্যাস ‘চন্দ্রকেতুগড়’। সেই উপন্যাসে গোরাচাঁদ পীরের কোনও অস্তিত্বই নেই, বরং মহামারীকেই কারণ বলা হয়েছে জনপদটির ধ্বংসের। এখানেই পার্থক্য ১৮৭৮ সালের উপন্যাসটির সঙ্গে। কেদারনাথ চক্রবর্ত্তী যেখানে প্রচলিত লোককথার ওপর ভিত্তি করে কাহিনী সাজিয়েছেন, বিভিন্ন ঐতিহাসিকের কথাতেও বারবার ফিরে এসেছে চন্দ্রকেতু-গোরাচাঁদ যুদ্ধের কথাই, সেখানে শ্রীপারাবতের উপন্যাসটিতে বর্ণিত কারণ পৃথক দিশা দেয়।

গোরাচাঁদ পীরের দরগা

সতীশচন্দ্র মিত্র প্রচলিত লোককথা থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে জানিয়েছেন, চন্দ্রকেতুর সময় বালাণ্ডা ছিল পীর সাহ নামে এক পাঠানের অধীনে। গোরাচাঁদ চন্দ্রকেতুকে ইসলাম ধর্মগ্রহণে রাজি না করাতে পেরে পীর সাহের কাছে নালিশ করেন চন্দ্রকেতুর নামে। এই পীর সাহের সঙ্গেই চন্দ্রকেতুর যুদ্ধ হয় এবং চন্দ্রকেতু প্রথমে বন্দি হলেও পরে উদ্ধার পান কিন্তু ততক্ষণে পায়রার দেখা পেয়ে চন্দ্রকেতুর পরিবারের সকলে আত্মহত্যা করে। চন্দ্রকেতু পরে মুক্তি পেলেও পরিবারের এহেন গতি দেখে নিজেও আত্মহত্যা করেন। কিন্তু সতীশচন্দ্র মিত্র এই যে পীর সাহের কথা বললেন, তিনি আর গোরাচাঁদ পীর কি অভিন্ন? পীর সাহ কি ‘পীর হজরত শাহ সৈয়দ আব্বাস আলী গাজী’(যা গোরাচাঁদের আসল নাম)-র অপভ্রংশ?

ফিরে আসি গোরাচাঁদ পীরের কথায়। চন্দ্রকেতুর পরে তিনি হাতিয়াগড় পরগনায় উপস্থিত হন এবং রাজা মহিদানন্দের দুই পুত্র আকানন্দ ও বাকানন্দের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন। যুদ্ধে আকানন্দ ও বাকানন্দ মারা যায় এবং গোরাচাঁদ গভীরভাবে আহত হন। জনৈক গোয়ালা কালু ঘোষ শেষ ক’টা দিন তাঁর পরিচর্যা করেন এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় ৮০ বছর বয়সে, ১৩৭৩ খ্রিষ্টাব্দে। গোরাচাঁদের হাড় নিয়ে এসে যেখানে সমাধি দেয়া হয়, সেই স্থানটিই পরিচিত হয়েছে ‘হাড়োয়া’ নামে। এখনও তাঁর মৃত্যুর দিন অর্থাৎ ১২ ফাল্গুন সমাধিক্ষেত্র-কে কেন্দ্র করে মেলা বসে প্রত্যেক বছর।

হাড়োয়া থেকে খানিক দূরে খাসবালান্দা গ্রামে যে অসম্পূর্ণ মসজিদটি ‘লাল মসজিদ’ নামে পরিচিত, তার ভিত্তিতে বৌদ্ধস্তূপ দেখে অনেকেরই ধারণা, প্রাচীন বৌদ্ধস্তূপ ধ্বংস করে গোরাচাঁদের সময়েই গড়ে উঠেছিল এই মসজিদ। এমনকী হিন্দু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ বলেও কেউ কেউ দাবি করেছেন ওই মসজিদটিকে। তবে এই অঞ্চলে বৌদ্ধস্তূপের অস্তিত্ব যে প্রাচীন ‘বালবল্লভী’ রাজ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়, তা অবশ্য স্মরণীয়।

গোরাচাঁদ বেড়াচাঁপা-হাড়োয়া এলাকায় ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে এলেও, তাঁর যে-কটি মূর্তি পাওয়া গেছে, তাতে যোদ্ধাবেশই প্রাধান্য পেয়েছে। পরিধানে চোগা-চাপকান, মাথায় পাগড়ি, হাতে তলোয়ার, বাহন ঘোড়া। আমার ধারণায়, নিজস্ব সৈন্যদলও ছিল তাঁর, নইলে চন্দ্রকেতু বা আকানন্দ বাকানন্দের সঙ্গে যুদ্ধে জয়লাভের লোককথা নিতান্ত ভিত্তিহীন হয়ে যেত। 

(ঋণ – ‘মাস্তুল’ পত্রিকা)

Developed by DXDasia