গল্প ভাঙে গল্প জোড়ে

কাহিনির সূত্রে আমরা চিনি একটা জাতি, জনসমাজ ও ভূখণ্ডের পরম্পরাকে

ইতিহাস আদতে জীবন্ত ওঠে গল্পে। তা কমাতে পারে বিভেদ।

পথ চলতে চলতে চারদিক দেখে শুনে, ঠেকে শিখে মনের মাঝে যা জমা হয় তার ডাকনাম হল অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার কথা যখন অন্যদের বলি তখন তার নাম হয় গল্প। গল্পের হাত ধরেই একের অভিজ্ঞতা পৌঁছয় অন্যের কাছে। বয়ে যায় এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে। মানুষের একটা বড় সুবিধা নানা ভাষায়, নানা ভঙ্গিতে, নানা মাধ্যমে গল্প বলতে পারে সে। কথক, শ্রোতা আর তাদের চারপাশের মানুষজন হয়ে ওঠে সেই গল্পের চরিত্র। জীবনের রঙ্গমঞ্চে একেক সময় একেকরকম ভূমিকা নিতে হয় আমাদের। গল্পের চরিত্রগুলি ভাষার ডানায় ভর দিয়ে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। মানুষজন তা শোনে, মনে রাখে, কখনও অন্য কোন ঘটনার সূত্রে তা আচমকা মনে পড়ে যায়। কোনও না কোনও সময় তা সে অন্যের কাছে বলে। অভিজ্ঞতা, চরিত্র, দেশ, কাল ও সংযোগ এসবকিছুর সাহায্যে গল্প অনিবার্যভাবেই হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক উপকরণ। আজকের সংযোগশাস্ত্রে গল্পের কদর বাড়ছে।

অভিজ্ঞতা, চরিত্র, দেশ, কাল ও সংযোগ এসবকিছুর সহযোগে গল্প অনিবার্যভাবেই হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক উপকরণ। তা তো হওয়ারই কথা। স্বাধীনতা সংগ্রাম বলুন বা কোনও সামাজিক আন্দোলন তা তো আদতে এক বা একাধিক গল্পের সম্ভার। চেষ্টা, ধৈর্য, ত্যাগ, রোমাঞ্চ, সংগ্রাম, বিশ্বাসঘাতকতা সবকিছুই তার খাঁজে খাঁজে জড়িয়ে থাকে। আবার যে কোন ধর্মগুরু বা সমাজ সংস্কারক, বড় সাহিত্যিক বা শিল্পীর জীবনের দিকে তাকান, তাঁদের জীবনও আদতে তাই। সাল তারিখ বাদ দিলে তাঁর সাফল্য, ব্যর্থতা, চেষ্টার কাহিনিগুলিই তো আমাদের মনে জেগে থাকে। নিজেদের জীবনের কোন সংকটের মুখে সেগুলি সামনে এসে দাঁড়ায়, অনুপ্রেরণা দেয়, হঠাৎ আলোর ঝলকানির মত এক লহমায় উদ্ভাসিত করে তোলে সত্যকে। ইতিহাস সবচেয়ে সহজভাবে ধরা দেয় গল্পের মধ্যে দিয়ে। স্কুলের ইতিহাস বইয়ে পড়া বিজিত রাজা পুরুকে মনে আছে বন্দী অবস্থাতেও আলেকজান্ডারের কাছে তার আত্মসচেতন মন্তব্যের সুবাদেই। বিবাদী বাগ কি শুধুই বিজ্ঞাপনের নিচে এক চিলতে পরিসরে জেগে থাকা একটি স্থানের নাম! বরং তা শুনলেই তো আমাদের মনে পড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামী তিন অকুতোভয় যুবকের অলিন্দ যুদ্ধের কাহিনি।

অথচ অ্যাকাডেমিক গাম্ভীর্য, সাল তারিখের বাইরে বেরিয়ে ইতিহাসকে মাটির কাছাকাছি পৌছতে দেয় না। এর পাশাপাশি আরও একটা সমস্যা আছে। এখানে ঐতিহাসিকরা মূলত লেখেন পণ্ডিতদের জন্য। আর তার বাইরে যাঁরা, তাঁরা লেখেন আম জনতার জন্য। তথ্য সঠিক অথচ পড়তে আকর্ষক এমন লেখা খুব কমই হয়। আমাদের দেশে বিজ্ঞান বিষয়ক নিবন্ধ কিংবা কল্পবিজ্ঞানের কাহিনিতে মেশে অনৈতিহাসিক মশলা। বলিউড ফিল্মে যা আকছার হয়। যেমন মহেঞ্জোদারো, যোধা আকবর। অবশ্য উল্টোটাও আছে। যেমন, বেদব্রত পাইনের চিটাগঙ্গ। অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের রোমাঞ্চ সেখানে কোনও গালগল্প তৈরি করেনি।

এই এক সমস্যা আমাদের দেশে। কিন্তু ভারতের মত দেশ, যেখানে ইতিহাস এত বর্ণময়, গল্প বলার ধরন এত শক্তিশালী সেখানে গল্প এবং ইতিহাস ঠিকঠাক মিশবে না কেন? বুদ্ধ থেকে রামকৃষ্ণ সবই তো গল্পের ছলেই একাধারে ইতিহাস ও লোকশিক্ষা সবই দিয়েছেন। নিজেদের সংস্কৃতি ও অতীতকে চিনি না বলেই আমরা সহজে প্ররোচিত হই। বাড়ে অন্যের ভাষা সংস্কৃতি ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে নিজের সিদ্ধান্তকে চাপিয়ে দেবার প্রবণতা।

আমরা দেখছি প্ররোচনামূলক আজগুবি গল্পে বাড়ছে দাঙ্গা আবার মানুষের কাছে ভাল দৃষ্টান্ত গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরলে তা তাদের মিলেমিশে বাস করতে শেখাচ্ছে। এমন গুণ আছে বলেই সারা পৃথিবী এখন গল্পের দিকে ঝুঁকেছে। মজা লাগে যখন দেখি, আমাদের কথকঠাকুরদের দেশে, ঠাকুমার ঝুলির দেশে গল্প বলা শেখাতে আসছেন ভিনদেশি স্টোরি টেলাররা। আক্ষেপ হয় কিন্তু কিছু করার নেই। আমাদের গল্প আমরাই তো অযত্নে অবহেলায় একপাশে সরিয়ে রেখেছি।

গল্প আমাদের অতীতকে মনে করায়, চেনায় বর্তমানকে। কাহিনির সূত্রে আমরা চিনি একটা জাতি, জনসমাজ ও ভূখণ্ডের পরম্পরাকে। তাদের কাজ ও ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ে। কোন সরকারি নির্দেশিকা, আইন বা বক্তিমেতে একাজটা হওয়াটা অসম্ভব। আসুন, এই অসহিষ্ণু সময়ে সহনশীলতার পাঠ নেবার জন্য আমরা আবার আমাদের গল্পগুলোর দিকে তাকাই। সেই জাতকের, পঞ্চতন্ত্রের, হিতোপদেশের, কথাসরিৎসাগরের গল্প। বিভেদ কমানোর এমন ভালো একটা উপায় তো আমাদের হাতের কাছেই আছে।

Developed by DXDasia