‘লিটল ম্যাগাজিনের মাথায় তখনও ওঁরা ছাতা ধরেননি’
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
৭৮ সালে বইমেলা ঠিক এখনকার মেলার মত ছিল না। তখন কর্তৃপক্ষ ছিলেন সুরসিক। বিমল ধরের আমলে। বিমল কলেজ স্ট্রিটের ঐতিহ্যশালী প্রকাশক ইউ এন ধরের নাতি। উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ির ছেলে। বইমেলায় শুধু টাই পরে ঘুরে বেড়ালেই হয় না। রক্তে বনেদি হওয়া চাই। যেটা বিমল ছিল। বিমল আমোদ-আহ্লাদ বুঝত। প্রশ্রয়ও দিত। কাজেই সে সময়ে একটা মেলা মেলা ভাব ছিল। লিটল ম্যাগাজিনের মাথায় তখনও ওঁরা ছাতা ধরেননি। শামিয়ানা খাটিয়ে ৬০০-৮০০ টাকা নিয়ে টেবিলের বন্দোবস্ত করেননি। মেলায় যেমন পাঁপড়ভাজাওয়ালা, আমরাও তেমনি ঝুলি-ঝোলা থেকে আমাদের জিনিসপত্রগুলো বের করে যে যেখানে খুশি বসে যেতাম। এখন তো শুনছি, মমার্তে অনুষ্ঠানের জন্য সময় নিলেও টাকা দিতে হয়। বিমল আমাকে বলত, ‘আরে মশাই, কীসব ছাইপাঁশ বের করেন আপনারা… এই লিটল ম্যাগাজিনওয়ালারা। আর সেই জন্যই তো বইমেলা কাগজে রেফার্ড হয় রোজ।’ ঠোঁটের কোণ মুছে ওর নর্থ ক্যালকাটান হাসি হেসে নিজেই আবার হুশ করে সেটা আবার টেনে নেওয়ার কায়দা সত্যিই অননুকরণীয়।
রেফার্ড বলে রেফার্ড! কবিদের পঙক্তি নিয়ে শিল্পীদের দিয়ে ছবি আঁকিয়ে ৭টা পোস্টার বের করলাম সেবার ১৯৭৮ সালের বইমেলায়। দ্বিতীয় দিনে স্টেটসম্যানের প্রথম পাতার টঙে ৪ কলম ছবিঃ পোস্টার ড্রন বাই এমিনেন্ট আর্টিস্ট আর বিয়িং সোল্ড অ্যাট বুক ফেয়ার ফর রুপিস টেন ইচ। সে বছর আমি বইমেলায় ‘সোনার তরী’ নামে একটা বিরাট স্টল নিই (প্যাভেলিয়ান বিশেষ)। ছ’জন কবি এবং এবং দু’জন গল্পলেখকের একটা করে পঙক্তি নিয়ে ৮ জন শিল্পী এঁকেছিলেন ৮টি – বহুবর্ণ পোস্টার। বলা বাহুল্য, বইমেলায় প্রথম এরকম। বোধহয়, বাংলাদেশেও। সুনীলের কাব্য-পঙক্তি নিয়ে ২টো পোস্টার হয়। একটি করেন অমরেন্দ্রলাল চৌধুরি (পঙক্তি – স্মৃতিনিবাসিনী, তুমি যেখানেই যাও, আমি সঙ্গে আছি’)। আহা, কী মেঘমেদুর কাজ যে করেছিল অমরেন্দ্র। সুনীলের দ্বিতীয় পঙক্তিটি ছিল, ‘শীতের মদিরেক্ষণ আমাদের ওষ্ঠে লেগে আছে’। অমর কবি তুষার রায়ের উচ্চারণে পোস্টারটি হয়েছিল একদম ‘মারহারা’। ওই পোস্টারটি করে প্রকাশ আমাকে বাজেটীয় ব্যাঙ্করাপ্টসি থেকে বাঁচায়। কেননা, এটি করতে খরচ পড়ে সিল্ক স্ক্রিনে পার প্রিন্ট মাত্র ৩ টাকা। অথচ রবীন্দ্রনাথের পঙক্তি ( দ্যাখো সখা, ভুল করে ভালোবেসো না) নিয়ে দিল্লি থেকে যোগেন চৌধুরী যে পোস্টার পাঠিয়েছে তাতে ৯টা রঙ। এবং ছাপাই খরচ ১৩ টাকা। মনে আছে, যোগেন পোস্টারটি পাঠিয়েছিল C/O কফি হাউস এই ঠিকানায়। কারণ, তখন বইমেলা শিয়রে। আর ও আমার ঠিকানা হারিয়ে ফেলে। প্রতিটি পোস্টার ১০ টাকা দামে বিক্রি হয়েছিল। অন্য শিল্পীরা ছিলেন সুনীল দাশ, বিকাশ ভট্টাচার্য। এখানে বলতে ইচ্ছে করে যে, সীমা আর্ট গ্যালারিতে যোগেন চৌধুরীর যে একক প্রদর্শনী হয়েছিল তাতে ওর করা পোস্টারটির একটা প্রিন্ট ভাল ফ্রেমে বাঁধিয়ে প্রদর্শনীতে রাখা হয়। ৭৮ সালে বইমেলায় ১০ টাকা দামের পোস্টারটি ৯৬ সালে নাকি ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ‘সোনার তরী’ স্টলটি পাওয়া গিয়েছিল কর্নার প্লটে। পাশেই একচিলতে মাঠ। স্টল থেকে মাঠ জুড়ে টাঙানো হয়েছিল কাপড়ের রঙিন ফ্লাটার। এসব জ্যোতির্ময় দত্ত করেছিল। স্টলের সামনে ছিল ওর করা বউ মীনাক্ষীর কাঠের ভাস্কর্য। একটা পোস্টার বিক্রি হলেই বেজে উঠত ঘণ্টা। ঘণ্টা? হ্যাঁ, ঘণ্টা। সারা বইমেলা শুনতে পেত সেই ঘণ্টাধ্বনি। দমকলের ফায়ার অ্যালার্ম।
দুজন গদ্য লেখকের পঙক্তি নিয়ে পোস্টারের কথা বলেছি। একটি ছিল কমলদার পঙক্তিঃ ‘আঃ, কী সুন্দর এই পৃথিবী’। ওটা করেছিল আনন্দবাজারের বিপুল গুহ – আর আমারটা ছিলঃ একটি অথবা দুটি উপন্যাস; তিনটির বেশি কখনই নয় – এটা করেছিল শুভাপ্রসন্ন। দেখতে দেখতে আমার উপন্যাস সংখ্যা ১৮ পেরিয়ে গেছে। বিকাশ ভট্টাচার্য এঁকেছিলেন জীবনানন্দ দাশের পঙক্তি নিয়েঃ ‘একটি বিপ্লবী তার সোনারুপো ভালবেসেছিল’। পোস্টারগুলির সাইজ ছিল ৩০x২০ ইঞ্চি।
(সৌজন্যঃ আজকাল)