নগর কলকাতায় চাঁদের আলো

‘রাজধানী কলকাতা শহর এত দিনে জাঁকাইল / পথে ঘাটে আসতে-যেতে, দিবা রাতে ভাবনা গেল’

যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের চড়কডাঙার ক্যাসেলে সেদিন চলছে একটি বিশেষ গানের মহড়া। আসলে লেখাটিকে কবিতার মতো করে পড়া চলবে না, তাকে গানের মতো করেই গাইতে হবে। এমনটাই জানিয়েছেন যতীন্দ্রমোহনের সভাকবি রাধানাথ মিত্র। আর গানের রীতিটি হবে রামপ্রসাদী সুরে হেলেদুলে দুলকি চালে কিন্তু শাক্ত আমেজে। তাই এমন মহড়ার আয়োজন আর কী! সেই গানের আড়ে বহরে জুড়ে আছে এক নয়া উদ্ভাবনের প্রশস্তি কাব্য। গানে লেখা হল –

‘কি বাহার গ্যাসের আলো।
বিজ্ঞান প্রভাবে বটে ভালো কীর্তি প্রকাশ হ’ল।
রাজধানী কলকাতা শহর এত দিনে জাঁকাইল।
পথে ঘাটে আসতে-যেতে, দিবা রাতে ভাবনা গেল।
মরি কি কলকারখানা, তেল সলতে কিছু লাগে না,
ধোঁয়াতে জ্বলছে আলো, বাতির চেয়ে দেখতে ভালো।
সুচিকন আলোকছটায় পূর্ণিমার চাঁদ লজ্জা পায়।
দিন-রাত্রির নাই ভেদাভেদ দেখেশুনে প্রাণ জুড়াল।’

এর পর থেকেই একে একে শুরু হল গ্যাসের আলোর প্রশস্তি কাব্য। আর নয়ই বা কেন? ততদিনে কলকাতার রাস্তা জুড়ে বসতে শুরু করেছে গ্যাসবাতির নকশাদার স্তম্ভগুলি। তার ব্র্যাকেট, স্তম্ভ, কাঁচের মোড়ক সব মিলিয়ে রাজা-রাজা একটা ব্যাপার। আর তার সাথে রাস্তার মোড়ে মোড়ে আলোর কী বাহার! ১৮৫৭ সালের জুলাই মাস থেকে পাকাপাকি ভাবে রাস্তায় বসতে লাগল গ্যাসের বাতি। সঙ্গে বাতি নিয়ে কলকাতাবাসীর কথার শেষ নেই। রূপচাঁদ পক্ষী এসব দেখে শুনে কলকাতাকে বললেন ‘ধন্য ধন্য কলিকাতা শহর, স্বর্গের জ্যেষ্ঠ সহোদর’ বলে তিনি আরও বললেন ‘পরিষ্কার পথ নাইকো ময়লা, সারি সারি গ্যাস লাইট আলা।

চন্দ্রদেবের ষোলকলা, হতে উজ্জ্বলা, শুক্লপক্ষে উদেন শশী,
এর পক্ষপাত নাই কোন নিশি, কৃষ্ণপক্ষ, শুক্লপক্ষ উভয়পক্ষ নয় অন্তর।
(চাঁদেতে তার ‘তাতে’ তুলা কল্লে ইংরাজ কারিকর)।।’

এটি আবার গাইতে হয় রাগিণী সিন্ধু কাফিতে আর তাল যৎ-এ। এভাবেই চলতে লাগল উৎসাহের আলোকময় প্রকাশ। চার বছরের মধ্যে দেখা গেল আমড়াতলা স্ট্রিটে চারটি, ব্যাঙ্কস হল স্ট্রিটে দুটি, বারানসী ঘোষ স্ট্রিটে তেরোটি, বউবাজার স্ট্রিটে একত্রিশটি, চৌরঙ্গী স্ট্রিটে ছাপ্পান্নটি। বলতে গেলে সেদিনের কলকাতায় ১৮৬১-র হিসেব বলছে, গ্যাসবাতির সংখ্যা মোট ৮৪৮টি। এসব বুঝেশুনে মহারাজ সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরই বা বসে থাকেন কেমন করে! ১৮৭৭-এ তিনি ঘটা করে প্রকাশ করলেন ‘ভিক্টোরিয়া গীতিমালা’ গ্রন্থ। আর তাতে মহারানীর প্রতি ভৈরবীর সুরে নিবেদন করে বললেন “এ হেন গ্যাসের আলো হেরিনু তব কৃপায়।”

মোট কথা, নগর কলকাতায় সেদিন পথেঘাটে চাঁদের আলো। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম খুব কম নাগরিক উদ্যোগ আছে যাকে কেন্দ্র করে এত গান এত কবিতা রচনা হতে পেরেছে। কলকাতার এক নিবিড় গবেষক সিদ্ধার্থ ঘোষ গল্পের মতো করে বললেন কত অজানা কাহিনী। তারই খানিকটা এরকম – ‘যাইহোক, আলোকদাতা হিসেবে নারকোল, সরষে ও রেড়ির তেলকে বিদায় করার প্রথম বড় ষড়যন্ত্রের সুচনা ১৮৫৪-য়। এই বছরেই প্রতিষ্ঠা হয় ওরিয়েন্টাল গ্যাস কোম্পানির। বর্তমান মহম্মদ আলি পার্কের জায়গায়(হ্যলিডে স্ট্রিটে) বসেছিল কোম্পানির প্রথম প্ল্যান্ট – গ্যাস তৈরির কারখানা। এই কারখানা পরে ওয়েলিংটন স্কোয়ারে উঠে আসে এবং শেষ পর্যন্ত ১৮৭০ থেকে পাকাপাকি ভাবে রয়েছে তার বর্তমান ঠিকানায় – ক্যানাল রড(ইস্ট)-এ’।

নারকেলডাঙা থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ার পরে ‘সুলভ সমাচার’(৫ মাঘ ১২৭৭) লিখল, “কলিকাতায় একেবারে আলোর কুরকুট্টি। ময়রারা পর্যন্ত গ্যাসের আলো জ্বালিয়া… দু’হাত ছুঁড়িয়া মশা মারিতে মারিতে রাত্রি পর্যন্ত লুচি, তরকারি, সন্দেশ, মেঠাই, ছানাবড়া কতই ভিয়ান ও বিক্রয় করিতেছে…।” খবরে প্রকাশ, ময়রাদের জন্য গ্যাস কোম্পানি গভীর রাত অবধি আলোর বাতিস্তম্ভে গ্যাস সরবরাহ করার ব্যাবস্থা করেছিল। দপ করে ফুলের মতো আলো জ্বলে ওঠা দেখে সেদিন মানুষের আবেগ আর ধরে না। কিন্তু এবার বাঁধল ঝামেলা। হিন্দু প্যাট্রিয়টে গিরিশ ঘোষ গর্জে উঠলেন। কারণ নতুন আইনের পাণ্ডুলিপিতে লেখা হয়েছে যে যে রাস্তায় গ্যাসের আলো বসবে সেই সব রাস্তার বাড়ি থেকে অতিরিক্ত কর আদায় করা হবে। সর্ব শুভকরী পত্রিকাও আপত্তি জানিয়ে সংবাদ করল।

আর এসবের মাঝে ‘সন্ধ্যার সময় একটা সিঁড়ি ঘাড়ে করিয়া কে একটা লোক দৌড়িতে দৌড়িতে এই রূপ ঝাঁ ঝাঁ করিয়া গ্যাস লণ্ঠন সকল জ্বালাইয়া যায় অনেকেই তাহা দেখিয়াছেন’।

চলে গিয়েছে সেই দিন। কিন্তু রেখে গিয়েছে কিছু সোনার জলের আলপনা। যা আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে চলে। কিছু রেশ থেকে যায় মাত্র। একটা দাগ পড়া যায় শুধু। আজও যখন রাজবল্লভ পাড়ার গলিতে কিম্বা নির্মলচন্দ্র স্ট্রিটের কোনও বাড়ির দেওয়ালের গায় একা প্রহর গুণে যায় কোনও গ্যাসের বাতির খাঁজ কাটা হাতল তখন কিন্তু মনে পড়ে যায় সেই লোকটির কথা যে লোকটির ডিউটি খাতায় লেখা আছে তাঁর অবসরের শেষ দিনটির হিসেব। কিন্তু সেই লোকটি আর তাঁর গ্যাসবাতির স্তম্ভগুলি আমাদের জন্য রেখে গেল আরও অনেক কিছু। রেখে গেল সেদিনের নগরবাসীর এক গুচ্ছ সৃষ্টিশীল প্রতিক্রিয়া। একটা আলোর আড়ালে সেদিন তাঁরা আন্দাজ করেছিল অন্ধ গলি থেকে বেড়িয়ে এসে আলো দেখার হাল হদিশ। তাই তো গ্যাসের আলোকে কেন্দ্র করে নগরে এত প্রতিক্রিয়ার ধুম। যে কারণেই রয়ে গেল গ্যাসবাতিকে সম্বল করে গড়ে ওঠা নগরের কবি শিল্পী আর সাহিত্যিকদের সৃষ্টির এক বিরাট নথিপুঞ্জ – এই যা! তাই মনে হয় আজ ঈশ্বর গুপ্ত থাকলে হয়তো একটু পাল্টে নিয়ে লিখতেন ‘কি বাহার গ্যাসের আলো, আজ তার দিন ফুরালো’…।

অলংকরণ – পার্থ দাশগুপ্ত

Post Tags
Developed by DXDasia