শীতের রোদে কতদিন হল পিঠ পেতে গল্পের বই পড়া ভুলে গেছি কুলমাখা খেতে খেতে
ব্যাঙ্গালোরে এখন মোটে রোদ্দুরের বালাই নেই। দিনের আলোর রংটা কেমন কম জ্বাল দেওয়া গাওয়া ঘিয়ের মতো আর আকাশের পরনে সব সময়েই ইস্ত্রিবিহীন পুরোনো ম্যাড়ম্যাড়ে ছাইরঙের বিনিপাড়ের ধনেখালি শাড়ি। জলে হাত দিলেই শিরশিরানি। এই এক জায়গা বটে! বারো মাস গিজারে গরম জল চাই! প্যাচপ্যাচে গরমকাল নেই, সেটা ভালো… কিন্তু আমার বর্ষা আর শীতও থাকবে না তা বলে? সদ্য স্নান করে ওঠা গাছের সবুজ পাতা থেকে শুরু করে থাবাচাটা ভিজে বেড়াল… কিচ্ছুই নেই। শীতের রোদে কতদিন হল পিঠ পেতে গল্পের বই পড়া ভুলে গেছি কুলমাখা খেতে খেতে।
যেমন এখন। খালি খালি চা তেষ্টা পাচ্ছে আমার। বইপত্তরে পর্যন্ত মন বসছে না। আসলে আমার খুব বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করছে। তা যে চুলোতেই হোক! তবে ট্রেনে চেপে, জানলার ধারের সিট এবং অবশ্যই একা একা। সঙ্গে একরাশ মিষ্টি কমলালেবু, প্রচুর ছোলা-বাদাম – নারকেলকুচি – আলুসেদ্ধ কুচি – ধনেপাতা – পেঁয়াজ -কাঁচালঙ্কা ইত্যাদি ইত্যাদি ছড়ানো ঝালমুড়ি… সেটা মাখা হবে ঝাঁঝালো সর্ষের তেল বোতল থেকে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বের করে অ্যালুমিনিয়ামের সামান্য তোবড়ানো মগে হিন্ডালিয়ামের চামচ দিয়ে ঘটঘট করে নেড়ে এবং আমাকে দেওয়া হবে খবরের কাগজের ঠোঙা উপচিয়ে। আর চাই চা। কিন্তু খবরদার প্লাস্টিক বা থার্মোকলের দু-আঙুল মাপের ওই হতচ্ছাড়া পরিবেশদূষণকারী গ্লাসফাস নয়, স্রেফ পাতি মাটির ভাঁড়ে জিভ পুড়িয়ে দেওয়া বিটনুন ছড়ানো লেবু চা।
সোনাদানা নয়, তাড়া তাড়া দু-হাজার টাকার নতুন নোট নয়, ঋতু কুমার বা নীতা লুল্লা নয়, এমনকী টাটকা নতুন ইংরিজি বাংলা বেস্টসেলারও নয়…
আচ্ছা, আমি খুব কিছু তো চাইছি না! কিন্তু পাচ্ছিও না! ইচ্ছেপূরণ করার ঠাকরুনটি কোন চুলোয় গেছেন, কে জানে!
ও হ্যাঁ, ঝালমুড়ি খেয়ে ঝালের চোটে হুশহাশ, গরম চায়ে সেই ঝাল লাগা বেড়ে যাওয়া আর হাত ধুতে যথারীতি ভুলে গিয়ে চোখে হাত দিয়ে ফেলা আর সে অজুহাতে ট্রেনের জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে উল্টোদিকে গাছগুলোকে দৌড়ে পালাতে দেখে আমি কেন সব ছেড়েছুড়ে অমনি পালানো তো দূরের কথা… পালানোর ভানটুকুও করতে পারি না ভেবে নিজের কাছে নিজেকে আড়াল করে ঘনঘন চোখ মোছা… ওটুকু না হয় 'ইতি'র পরে 'পুনশ্চ' হয়েই থাক!