"আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল , শুধাইল না কেহ …"
সে অনেককাল আগের কথা। সাদা-কালো টেলেরামা টিভি-র আমল। এক সন্ধেতে কলকাতা দূরদর্শনে দেখি একটি সাক্ষাৎকার চলছে। কোনও বৃদ্ধা যে এমন নজরকাড়া হতে পারেন তাঁর সম্ভ্রান্ত সৌন্দর্য দিয়ে, এমন আবিষ্ট করতে পারেন তাঁর কণ্ঠমাধুর্য দিয়ে …সাধারণ সরু নকশাপাড় ধবধবে সাদা শাড়ি আর সাদা মলমলের ব্লাউজ পরেছিলেন তিনি …ওই কিশোরী বয়সে তা আমার স্বপ্নের অগোচর ছিল। তাঁর মুখের বলিরেখাগুলি গানের বাণী আর সুরে ভর করে ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছিল সেই রাত্রিতে, আমার ঘরের জানলার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা কালচে নীল আকাশে, ইতিউতি টিমটিমিয়ে জ্বলতে থাকা একমুঠো নাম-না -জানা তারা আর ফিনিক-ফোটা জোছনা সম্বল করে।
বেশ কয়েকটি গান ছিল সেদিন তাঁর মধুক্ষরা কণ্ঠে। আমাকে সে সম্ভারের যে গান আজও ওই সন্ধেতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, উতল করে তোলে..সেটি হল, "আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল , শুধাইল না কেহ …"।
সে এক এমন বয়স তখন আমার, বড় অস্থির সন্ধিক্ষণ। বালিকাবেলার নিরাপদ আহ্লাদ আর আব্দারের ছোট্ট ঘরটির চৌহদ্দি পেরিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি কিশোরীকালের চবুতরায়। অমিয়া ঠাকুর গাইছিলেন, " যার বাঁশরি ধ্বনি শুনিয়ে আমি ত্যজিলাম গেহ…" আর আমার মনে হচ্ছিল, একছুটে পেরিয়ে যাই এই বিস্তীর্ণ উঠোন … পা রাখি সেই বয়সে ..যেখানে মরশুমী ফুলের মতো আমার গোপন ইচ্ছেরা আলো করে রাখবে আমার ঘর-দুয়ার …যেখানে শাসন নেই, বকুনি নেই, লুকোচুরি নেই…আমি যে কবে বড় হব …!
সেই গানটি খুঁজে পেলাম না। তবে সে অনুষ্ঠানে এই গানটিও ছিল …. এও তো ভুলে যাওয়ার মতো নয়!