রাত আটটার সময়ে মোহনদার সঙ্গে দেখা করার কথা| সঙ্গীতশিল্পী শ্রী মোহন সিং খঙ্গুরা
কোনো রক্তমাংসের মানুষ যখন কারো শিরা আর ধমনীর রক্তে নেশার ঝিলিক আনেন, সে বড় সর্বনেশে অবস্থা| রবীন্দ্রনাথ ঠিক তেমন এক নেশা| আমার কাছে| দুর্দমনীয়| যাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকা| সকাল হলেই একটা না একটা গানের পংক্তি অবিরাম বেজে যায় মাথার ভেতরে| তারপর সারাদিনে যা ভাবি, বলি, লিখি, গুনগুন করি… তাতে নিজস্বতা বলতে কিচ্ছু দেখি না| এই অধমর্ণ-জীবন, বেশ আছি| ঋণ বেড়ে চলে চক্রবৃদ্ধি নিয়মে, শোধ দেবার প্রশ্নই নেই|
বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবছিলাম, বর্ষায় যাব শান্তিনিকেতন| আরও একবার দেখে আসি| লোকে যেমন তীর্থ করতে যায়| তবে এবার শুধু পথেঘাটে ঘুরব| এবার শুধু লাল ধুলোমাটি ছুঁয়ে থাকা| ওই যে গেলেই দেখতে হবে ..রবি ঠাকুর কোথায় থাকতেন, খেতেন, ঘুমোতেন, লিখতেন… তেমনটা এবার আর নয়| কারণ তিনি এই শান্তিনিকেতনের সর্বত্রই আছেন|
শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস| বড্ড আশা করেছিলাম, পথে ঝুমঝুমাঝুম বৃষ্টি পাব| হল না| তবে আদিগন্ত সবুজ ধানজমি ছিল, জায়গায় জায়গায় বৃষ্টির জল জমে কাকচোখ খুদে খুদে ঝিল| সেই জলে রোদ্দুর বিছিয়ে থাকে রুপোলি সরের মতো| মাঝে মাঝেই ত্রিভুজ নকশা এঁকে উড়ে যাচ্ছিল বক| দূরে ছবি হয়ে ছিল অচেনা বসতি| শুধু স্বপ্নের মাঝে তালভঙ্গ করছিল গ্রামের মানুষগুলোর পরনের নকল ছাপমারা নাইকে, রীবকের জামা| কী ভীষণ বেমানান! ভাগ্যিস মা বোনেরা শাড়িতে! ওতে বিশ্বায়ন উঁকিঝুঁকি মারেনি এখনও|
ঝালমুড়ি, লেবু চা| মাটির ভাঁড় নেই, প্লাস্টিক চাপা পড়েই মরব আমরা! জেলি ভরা রংবেরঙের লজেন্স| আমার লিস্টে চিটচিটে শোনপাপড়িও ছিল, কপাল মন্দ ! ওঠেনি| আমার উল্টোদিকে একটা বড় দল বসেছে| একজনের স্ত্রী তার স্বামীকে বলছেন, "ওগো শুনছ, এরা জিজ্ঞেস করছে আমাদের ঝগড়া হয় কিনা|'' ভদ্রলোক বললেন, "বলে দাও, হয় না|"
এত গরম, কিন্তু প্রাণের আরাম যেখানে, সেখানে সবসময়েই সুবাতাস| থাকব রতনকুঠিতে| সবে বর্ষামঙ্গল শেষ হয়েছে, তাই জায়গা পেতে অসুবিধা হয়নি| খেয়েদেয়ে সোনাঝুরির হাট|
সোনাঝুরি পৌঁছলাম বিকেল বিকেল| খানিক গরম, খানিক পড়ন্ত রোদ, খানিক ঝলক দেয় বাতাস| ডোকরা আছে, আছে কাঁথা কাজ… সিল্ক, সুতি আর খেসে, পট, কাঠের চেয়ার, নীচু টেবিল, ছবি আঁকা লন্ঠন| পোড়ামাটির কাজ| আর দেখলাম ঘাসের গয়না| বুনে বুনে তৈরি| "আমার সে দিন ভেসে গেছে"… দীর্ঘশ্বাস উড়ে যায় পথচলতি হাওয়ায়| হাতে নিয়েও তাই রেখে দিই| একজন ডোকরা শিল্পীর সঙ্গে গল্প জুড়েছিলাম| তিনি বললেন, "আমি নব্বই সালের কলাভবনের ছাত্রী| আমার স্বামী ব্যাঙ্কে চাকরি করত| কী যে ভূত চাপল মাথায় এই বাউল গানের, সব ছেড়েছুড়ে গান সম্বল করেছে| এখন আমি ডোকরার কাজ করি| সংসার চালাতে হবে তো!" কিনলাম| একজোড়া লক্ষ্মী-সরস্বতী| আসনপিঁড়ি হয়ে বসা| নিখুঁত ডাগর চোখে আমায় হাতছানি দিল তারা!
গাড়ি অপেক্ষা করছিল একটু দূরে| ভাগ্যিস একটু দূরে! তাই হাঁ করে ক্যানালে জল ছাড়া দেখতে পেলাম| মনে মনে আমি ওকে ঝর্না বলে ধরে নিলাম|
"তোমায় একটা নাম দিই ঝর্না? না হলে ডাকব কী করে?"
"দাও|"
"আজ এক্ষুনি থেকে তোমার নাম… ভালোবাসা|"
ঝর্নায় ঘোলা গঙ্গাজল রঙা বিকেল ঘনিয়ে আসে| এই সব আলো আঁধারির সন্ধিক্ষণে একা থাকতে জানতে হয়|
একদম নিশুতি রাত্রির মতো রেশমি শাড়ির খুব শখ ছিল আমার| ঘন নিকষ কালো অন্ধকার তার রং| পরলে মনে হবে রাত্রি জড়িয়ে আছে গায়ে| আর তাতে ফুটে থাকবে ফুল| অনেক ফুল| ইচ্ছেঠাকরুন বললেন, "তাই হোক!" শান্তিনিকেতনে রাতের আকাশ আমাকে সেই শাড়ির রূপটি চিনিয়ে দিল|
রাত আটটার সময়ে মোহনদার সঙ্গে দেখা করার কথা| সঙ্গীতশিল্পী শ্রী মোহন সিং খঙ্গুরা| আগে থেকেই ঠিক করা ছিল| গেট খুলে ঢুকছি… কানে ভেসে এল বন্দিশ| ভাবছি, ডাকঘন্টি বাজাব কিনা… দরজা খুলে গেল| ভেতরে গিয়ে প্রণাম করে বসলাম| কিছু টুকরো কথা, গল্প চলছে| মোহনদার গুনগুনানিও চলছে| রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনিনি| তেমন আবহ ছিল না সেদিন| ছিল বন্দিশ| আমার মুঠোফোনে উঠে যাচ্ছিল সেই লহরী| রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে কথা হচ্ছিল অনেক| আমি নিজে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পক্ষপাতী নই আদৌ| আমার ওই সাবেকী স্বরলিপিই ভালো| মোহনদাও একই কথা বললেন| অনেক প্রয়াত শিল্পীদের কথা উঠে আসছিল একে একে| যে সব কণ্ঠের গান শুনে আমাদের বোধ তৈরি হয়েছে| মোহনদা বললেন, "গানের কথা ঠিক প্রতিমার কাঠামোর মতো| সুর হল মাটির প্রলেপ| আর তাতে রং মিশিয়ে প্রাণ দেবার দায়িত্ব শিল্পীর| যে গান এই সম্পূর্ণতা নিয়ে আমাদের সামনে আসে, তাই কিন্তু সত্যিকারের গান| ক'জনই বা পারে প্রতিমায় প্রাণসঞ্চার করতে?"
রাত ঘন হয়| ফিরে আসি রতনকুঠিতে| রাতে হঠাৎ কে যেন ডাক দিয়ে বলে, "বাইরে এসে দেখো একটিবার!"
দরজা খুলে বারান্দায় এসে দেখি, বৃষ্টি এসেছে নূপুর পরে| গাছের সবুজ পাতার ঝালর ভিজিয়ে অন্ধকারের শরীর বেয়ে জলের ধারা| একপাশে তির্যকভাবে| অন্যপাশে যেন সোজা টানটান জলের চাদর| লাল ধুলো ভিজে যাচ্ছে| কালো সরু সাপের মতো পীচরাস্তা চিকমিক করছে, ছোট ছোট নুড়িপাথরে ছিটকে যাচ্ছে জলের মিশ্রিদানা| এতক্ষণ কিন্তু আকাশে কেমন আধখানা সোনালি পিরিচের মতো চাঁদ উঁকি দিচ্ছিল ওই উঁচু গাছের পাতার ভুলভুলাইয়া দিয়ে| কোথায় হারিয়ে গেল? এখন আকাশ আর বৃষ্টির একান্ত কথোপকথন| চাঁদ তারা সব বাইরের লোক!
চুপিচুপি আড়ি পেতেছি বারান্দায়| লাল সিমেন্টের ধাপিতে বসে| সেই না-বলা বাণী শোনার আশায়| আচমকা পেয়ে যাওয়া এই নিঝুম ঘন যামিনীর মাঝে| যে কথা শুধু রবীন্দ্রনাথ নামের আশ্চর্য মানুষটি চিরকাল শুনে এসেছেন…
এবং একা একাই!