বিয়ে থেকে দুর্গাপুজোর মণ্ডপ – সমাজ পরিবর্তনের ডাক দিচ্ছেন মহিলা পুরোহিতরা?

এবছর দুর্গাপুজোয় জেলায় জেলায় মাতৃবন্দনা করেছেন একাধিক মহিলা পুরোহিত

কথায় আছে, সামাজিক পরিকাঠামো — ‘কাঠামো’ অর্থাৎ ছকে বাঁধা — সেখান থেকে সরলেই সমাজের জেঠুসুলভ জুজুরা ধরে ফেলবে — এই ধরে ফেলার অর্থ অনেকসময় মৃত্যু অবধিও গড়ায়। মহিলা পুরোহিত (Woman Priest) আসলে শিকল ভেঙে জীবনের জয়গান গাওয়ার আহ্বান। কেউ এগিয়ে কেউ পিছিয়ে — এ তর্কের চেয়েও সেখানে বড়ো হয়ে ওঠে সবাই সমান৷ আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দিনাতিপাত করেছে। তারপর ধীরে ধীরে পুরুষরা হয়ে উঠেছে সর্বের সর্বা। নারীদের তারা ভোগ্যবস্তু হিসেবে দেখতে চেয়েছে। রামায়ণ থেকে মহাভারত সর্বত্র মেয়েদের জয়গান গাওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু সীতাকেও তো অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে প্রমাণ করতে হয়েছিল নারীত্ব; দ্রৌপদীকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তার শরীর থেকে খুলে নেওয়া হয়েছিল কাপড়। ঠিক এইরকম সমাজব্যবস্থায় মহিলা পুরোহিতরা আসেন খানিক স্বাধীন চিন্তাভাবনা নিয়ে। তাঁদের সমস্ত আচারে ধরা পড়ে লিঙ্গসমতার কথা। বিবাহ, অন্নপ্রাশন, উপনয়ন এমনকি দুর্গাপুজোতেও ধীরে ধীরে মূলস্রোতে জায়গা করে নিচ্ছে মহিলা পুরোহিতদের আধুনিক চিন্তাভাবনা। এবছর দুর্গাপুজোয় কলকাতা ছাড়িয়ে জেলায় জেলায় মাতৃবন্দনা করেছেন একাধিক মহিলা পুরোহিত। তাহলে কি সমাজ পাল্টাচ্ছে?

নন্দিনী ভৌমিক (Nandini Bhowmik) দুর্গাপুজোর মহাষ্টমীর অঞ্জলির জন্য বাংলায় মন্ত্রোচ্চারণ করলেন৷ সকল ভক্ত তাতে গলা মেলাল। পাঠে লেখা ছিল, “নমঃ বিষ্ণু নমঃ বিষ্ণু নমঃ বিষ্ণু, আকাশে তাকালে সেই স্বর্গত দিশারি চক্ষু যেমন করে দ্যাখে, জ্ঞানীরা সেইভাবে বিষ্ণুর সেই পরমপদ সর্বদা দেখতে পান। পবিত্র বা অপবিত্র যে কোনো অবস্থাকেই যিনি স্মরণ করেন, তিনি অন্তরে ও বাহিরে শুদ্ধময়।” — দক্ষিণ কলিকাতার ৬৬ পল্লির পুজো মুখরিত হল এই বাংলা উচ্চারণে। গত বছর থেকেই ৬৬ পল্লির দুর্গাপুজোয় অংশগ্রহণ করছেন নন্দিনী ভৌমিক, রুমা রায়, সেমন্তী ব্যানার্জি, পৌলমী চক্রবর্তীরা। দলের নাম ‘শুভমস্তু’।

কলকাতা ৬৬ পল্লির দুর্গাপুজোয় চার মহিলা পুরোহিত

পুরুষশাসিত সমাজে চেনা ছকের বাইরে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছিলেন বাংলার প্রথম বৈদিক বিবাহ গবেষক-লেখক গৌরী ধর্মপাল। পরবর্তীতে তাঁরই উত্তরসুরীরা যেমন রোহিনী ধর্মপাল, নন্দিনী ভৌমিক নতুন স্বপ্নের দিকে যাত্রা করেছিলেন। পৌরহিত্যের জন্য কেন শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ পুরুষ? প্রশ্ন তুলেছিলেন গৌরী-নন্দিনীরা। সমাজের ভাবনায় জোর আঘাত হেনেছিলেন। পুরোহিতের বেশে মন্ত্রোচ্চারণে সমাজের ছুৎমার্গকে ফুৎকারে উড়িয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। এবার আর শুধুমাত্র বিয়ের ছাদনাতলা নয়, দুর্গাপুজোর মণ্ডপেও দেবীকে পুজো করলেন মহিলা পুরোহিত। দেবীর আরাধনা হল মায়েদের/মেয়েদের হাতেই। মহিলা পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে মুখরিত হল আশ্বিনের শারদপ্রাত।

পুরুষশাসিত সমাজে চেনা ছকের বাইরে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছিলেন বাংলার প্রথম বৈদিক বিবাহ গবেষক-লেখক গৌরী ধর্মপাল। পরবর্তীতে তাঁরই উত্তরসুরীরা যেমন রোহিনী ধর্মপাল, নন্দিনী ভৌমিক নতুন স্বপ্নের দিকে যাত্রা করেছিলেন।

ঋকবেদে লেখা বিয়ের সংস্কৃত মন্ত্রগুলিকে ছন্দবদ্ধ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন প্রবাদপ্রতিম লেখিকা এবং লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের সংস্কৃত বিভাগের প্রাক্তন প্রধান গৌরী ধর্মপাল (Gouri Dharmapal)। ঋকবেদের মূল লেখা থেকে বাদ দিয়েছিলেন নারীদের অবমাননাকর আচার। সেই বিবাহপদ্ধতিতে মালাবদল, শুভদৃষ্টি, সপ্তপদী, সিঁদুরদান সবই আছে। নেই কেবল সম্প্রদান বা পিঁড়িতে করে কনেকে নিয়ে আসার মতো নিয়ম। যে রীতিতে দেখানো হয় কন্যাকে সম্প্রদান করে নয়, পুত্র ও কন্যা একে অপরকে গ্রহণ করে নেয় এই বিবাহ পদ্ধতিতে। আবার এই বিবাহ পদ্ধতিতে স্বামী যেমন স্ত্রীকে সিঁদুর পরিয়ে দেন, তেমনভাবেই স্ত্রীও স্বামীর কপালে সিঁদুর লাগান। বিয়ে নামক সামাজিক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে তাঁরা লিঙ্গসাম্যতার কথা বলতে চান বারবার। পরবর্তীকালে গৌরী ধর্মপালের অনুবাদ করা বাংলা মন্ত্রগুলি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সতী চট্টোপাধ্যায়।

গৌরী ধর্মপাল

বিয়ের বাইরে দুর্গাপুজোর মতো বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবেও এবার কলকাতা (Kolkata) ছাড়িয়ে জেলায় জেলায় মন্ত্রোচ্চারণ করছেন নন্দিনী ভৌমিকের মতো অসংখ্য মহিলা পুরোহিত। কলকাতার ৬৬ পল্লি ছাড়িয়ে আমাদের চোখ পৌঁছাল বাংলার প্রান্তরে।

ঋকবেদে লেখা বিয়ের সংস্কৃত মন্ত্রগুলিকে ছন্দবদ্ধ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন প্রবাদপ্রতিম লেখিকা এবং লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের সংস্কৃত বিভাগের প্রাক্তন প্রধান গৌরী ধর্মপাল। ঋকবেদের মূল লেখা থেকে বাদ দিয়েছিলেন নারীদের অবমাননাকর আচার।

নদিয়া-হাঁসখালির (Nadia) গ্যাড়াপোঁতা শান্তিপাড়ার মহিলা পরিচালিত শান্তি সংঘের পুজো এবছর সকলের নজর কেড়েছে। কারণ এখানকার প্রধান পুরোহিত একজন মহিলা। কৃষি প্রধান এই এলাকায় কাছে পিঠে দুর্গাপুজো হয় না। তাই এই পুজো ঘিরে থাকে বাড়তি উন্মাদনা। এবার পুজো বাইশ বছরে পড়েছে। পুজোর সমস্ত আয়োজন করেছেন মহিলা সদস্যরা। সাবেকি ঘরানার মাটির সাজের প্রতিমা ও অন্যরকম পুজো দেখতে আশপাশের গ্রামের মানুষজন মণ্ডপে ভিড় করেছেন। ক্লাবের মহিলা সদস্যরাই ঢাক বাজানো থেকে পুজোর সমস্ত আয়োজন করেন। এখানকার পুরোহিতের নাম কানন বালা।

শিলিগুড়ির (Siliguri) চম্পাসারিতে একটি আবাসনের দুর্গাপুজোয় পৌরহিত্য করলেন তনুশ্রী চক্রবর্তী। বহুদিন ধরে পুজো করলেও এবার প্রথম তাঁর হাতে দুর্গাপুজো হল। এই পুজোয় কুমারী হিসেবে পূজিতা হলেন আদিবাসী কিশোরী খুশি মুণ্ডা। আদিবাসী কিশোরীকে কুমারী হিসেবে পুজো করার ঘটনাও নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়।

শিলিগুড়ির এক দুর্গাপুজোয় মহিলা পুরোহিত

অন্যদিকে শিলিগুড়ির সূর্যনগরে মহিলা পরিচালিত এক পুজোতেও এবার পৌরহিত্য করলেন মহিলা পুরোহিতই। স্থানীয় সূত্রে খবর, গত কয়েকবছর ধরে মহিলা পুরোহিত দিয়েই পুজো হচ্ছে এখানে। নারীশক্তির জয়গানের বার্তা দিতে এহেন উদ্যোগ।

দুর্গাপুজোর চারদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে এঁরা কেউ ছিলেন শিরোনামে, কেউ ছিলেন না। হয়তো আরও অনেক নাম রয়ে গিয়েছে আড়ালে। ক্রমশ মূলস্রোতে চলে আসা মহিলা পুরোহিতের ভাবনা চিন্তার ফলে আদৌ কি বদলাচ্ছে সমাজের চেহারা? ২০০৯ সাল থেকে প্রথম বিয়ের পৌরোহিত্য করা শুরু করেন নন্দিনী ভৌমিক। চলার পথ যে খুব সুখের ছিল, এমন নয়। একজন ‘মহিলা পুরোহিত’ বিয়ে দেবেন, পুজো করবেন এই ব্যাপারটাই বেশ আশ্চর্যের। মানতেও পারেন না অনেকে। মেয়েরা আবার এসব করে নাকি! নন্দিনী ভৌমিকের মতে, “সমাজের ধারণা, পুরোহিত মানেই পুরুষ। এই ধারণাই এতদিন চলে এসেছে। এটায় বদল আনতে গেলে তো একটু ধৈর্য ধরতে হবে। সময় দরকার। আমরা সেটাই করার চেষ্টা করেছি। আমাদের কোনো লড়াই নেই। বরং যখনই প্রয়োজন হয়েছে, যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছি সবটা”।

বিবাহনুষ্ঠানে মন্ত্রোচ্চারণ করছেন নন্দিনী ভৌমিক

প্রশ্ন ওঠে বিয়ে বা পুজোর রীতি যেখানে ‘সিস্টেম’-এর অংশ, সেখানে দু-একটা নিয়মকানুন বদলে সামাজিক চেহারা সর্বোপরি মানসিকতার আধুনিকীকরণ কতটা সম্ভব! পুরোহিত সুলতা মণ্ডল বলছেন, “আমার মতো আরও মেয়ে পুজো করতে এগিয়ে আসুক। সমাজের বাঁধাধরা রীতি সরিয়ে মেয়েরাও পুরোহিত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক, মায়ের কাছে এই প্রার্থনা করি।”

উল্লেখ্য, এর আগে একাধিকবার মহিলা পুরোহিতদের নানান কর্মকাণ্ড নিয়ে ‘বঙ্গদর্শন.কম’ লেখালেখি করেছে৷ সেখানে একবছর আগের একটি কমেন্টের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। মহিলা পুরোহিতদের মন্ত্রোচ্চারণ শুনে মানসী চক্রবর্তী আমাদের লিখেছিলেন, “আমি পুরোহিত হতে চাই। কীভাবে এগিয়ে যাব?” হাজার মেয়ের এই ইচ্ছাপ্রকাশই হয়তো একদিন মূলস্রোতে ঢেউ তুলবে।

Developed by DXDasia