চার বাঙালি গোয়েন্দা

বাংলায় প্রথম গোয়েন্দা গল্প লিখেছিলেন পাঁচকড়ি দে

গোয়েন্দা গল্প পড়তে আমরা সবাই কম-বেশি ভালবাসি। বাংলা সাহিত্যে গোয়েন্দা গল্পের ইতিহাস অনুসন্ধান করে জানা যায় বাংলায় প্রথম গোয়েন্দা গল্প লিখেছিলেন পাঁচকড়ি দে। উনার গল্পে ছিলেন দু'জন প্রধান গোয়েন্দা। একজন 'অরিন্দম বসু' আরেকজন 'দেবেন্দ্রবিজয় মিত্র'। তবে গোয়েন্দাকাহিনীর দিক থেকে সর্বপ্রথম সাফল্যের চূড়ায় ওঠে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ব্যোমকেশ’। তারপর একে একে সত্যজিৎ রায়ের 'ফেলুদা', নীহাররঞ্জন গুপ্তের 'কিরীটী', সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কাকাবাবু' বাঙালি পাঠকের মন জয় করে নেয়।

আজ সেই চার বিখ্যাত বাঙালি গোয়েন্দা ব্যোমকেশ, ফেলুদা, কিরীটী আর কাকাবাবুর কিছু জানা অজানা কথা।

ব্যোমকেশ বক্সী
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সৃষ্ট জনপ্রিয় চরিত্র ব্যোমকেশ। ব্যোমকেশ বক্সীর প্রথম আবির্ভাব 'সত্যান্বেষী' গল্পের মধ্য দিয়ে। শোনা যায়, একসময় শরদিন্দু এবং জীবনানন্দ দাশ হ্যারিসন রোডের একই মেস বাড়িতে থাকতেন। সেই মেসবাড়ির প্রেক্ষাপটেই জন্ম নেয় ব্যোমকেশ চরিত্রটি। আর ব্যোমকেশই একমাত্র গোয়েন্দা চরিত্র যার লাভস্টোরি আছে। ব্যোমকেশের স্ত্রীর নাম সত্যবতী। 

ব্যোমকেশ বক্সীর বন্ধু অজিত বন্দ্যোপাধ্যায় সাহিত্যিক। তাঁর কলমে ব্যোমকেশের অভিযানগুলোর বর্ণনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যোমকেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ব্যোমকেশকে নিয়ে গোয়েন্দা গল্পের সিরিজ লেখা শুরু করেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। শরদিন্দু লিখতেন খুব সহজ সরল এবং সাবলীল ভাষায়। বেশ কয়েক বছর ধরে ১০ টি গল্প লেখার পর পাঠকদের হয়ত আর ভাল লাগছে না এই ভেবে দীর্ঘ ১৫ বছর ব্যোমকেশকে নিয়ে তিনি গল্প লেখা বন্ধ করে দেন। দীর্ঘদিন পর পাঠক আর প্রকাশকদের অনুরোধে ‘চিত্রচোর’ গল্পটি দিয়ে ব্যোমকেশ সিরিজ আবার শুরু করেন। তিনি ব্যোমকেশ সিরিজের মোট তেত্রিশটি গল্প লিখেছিলেন। এর মাঝে 'বিশুপাল বধ' গল্পটি তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। ব্যোমকেশ বক্সীকে নিয়ে তৈরি হয়েছে একাধিক সিনেমা। যার মধ্যে সত্যজিৎ রায় বানান 'চিড়িয়াখানা'। ব্যোমকেশের চরিত্রে অভিনয় করেন উত্তম কুমার।

ফেলুদা
সত্যজিৎ রায়ের নিজ হাতে গড়া চরিত্র ফেলুদা ওরফে ফেলু মিত্তির। ফেলুদার পুরো নাম প্রদোষচন্দ্র মিত্র। ফেলুদার ঠিকানা ২১, রজনী সেন রোড। ফেলুদার প্রধান সহকারী খুড়তুতো ভাই তোপসে এবং লেখক লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ু।এই জটায়ুও আবার গোয়েন্দা কাহিনি লেখেন, তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্রটির নাম 'প্রখর রুদ্র'।

ফেলুদা শার্লক হোমসের বড় ফ্যান ছিলেন যা সত্যজিত রায়ের লেখায় বারবার উঠে এসেছে। ফেলুদার প্রধান সহকারী তপেশরঞ্জন মিত্র বা তোপশে চরিত্রটিও শার্লক হোমসের রচয়িতা স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের জন ওয়াটসন চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত। শুধু তাই নয়, ফেলুদা গল্পে যে সিধু জ্যাঠাকে দেখা যায় যার পরামর্শ নিতে যান ফেলুদা, এই সিধু জ্যাঠা চরিত্রটিতে শার্লক হোমসের দাদা মাইক্রফট হোমসের ছায়া লক্ষ্য করা যায়।

১৯৬৫ সালের ডিসেম্বর মাসে 'সন্দেশ' পত্রিকায় “ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি” প্রথম প্রকাশিত হলে চারদিকে সাড়া পড়ে যায়। ফেলুদার সব মিলিয়ে ৩৫টি সম্পূর্ণ এবং ৪টি অসম্পূর্ণ গল্প এবং উপন্যাস প্রকাশিত হয়।

ফেলুদা রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে সাধারণত শারীরিক শক্তি বা, অস্ত্র ব্যবহার করেন না। ব্যবহার করেন "মগজাস্ত্র"। ফেলুদার পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণী ক্ষমতা অসাধারণ। ফেলুদা সিরিজের সমস্ত গল্প এবং উপন্যাস ইংরেজি ভাষাতেও অনূদিত হয়েছে। ফেলুদাকে নিয়ে সত্যজিৎ রায় নিজে বানান দুখানি সিনেমা – 'জয় বাবা ফেলুনাথ' এবং 'সোনার কেল্লা'। ফেলুদার চরিত্রে অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

কিরীটী
নীহাররঞ্জন গুপ্ত বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র কিরীটীর স্রষ্টা। নীহারবাবু পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি রহস্য গল্প লেখিকা আগাথা ক্রিস্টির সাথে দেখা করেন। আগাথা ক্রিস্টির কাছ থেকে গোয়েন্দা গল্প লেখার অনুপ্রেরণা পান। ভারতে ফিরে নীহাররঞ্জন লেখেন তাঁর প্রথম গোয়েন্দা উপন্যাস 'কালো ভ্রমর '। বাঙালি পেল আরেক নতুন গোয়েন্দা কিরীটী।

এক জমিদারবাড়ির সত্যিকারের ঘটনা থেকেই জন্ম নিয়েছিল নীহাররঞ্জনের প্রথম গোয়েন্দা উপন্যাসের প্লট। জমিদারবাড়িতে এক দুপুরে খুন হয়ে যান বাড়ির বউমা। অন্তঃস্বত্ত্বা বিধবা সেই রমণীকে গুলি করে খুন করে তার সুপুরুষ দেওর। সে আবার যক্ষ্মায় আক্রান্ত। বউদিকে খুন করে নিজেকেও রেওয়াত করেনি। ওই বন্দুকেরই গুলিতে শেষ করে দেয় নিজেকেও।

এক সময় ঘটে যাওয়া এই ঘটনা দাগ কাটে নীহারের মনে। সেখান থেকেই জন্ম নেয় কিরীটী।

কিরীটী চরিত্রে মুগ্ধ ছিলেন উত্তমকুমার। একদিন নীহারবাবুর বাড়িতে এসে কিরীটী চরিত্রে অভিনয় করার ইচ্ছে জাহির করেন। কিন্তু নীহারবাবু উত্তমকুমারকে স্পষ্টত জানিয়ে দেন যে, ‘কিরীটী’ চরিত্রে তাঁকে কিছুতেই মানাবে না।

নীহারবাবু মনে করতেন কিরীটী চরিত্রের জন্য পারফেক্ট নাট্যকার অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়! 

কাকাবাবু
বিখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এক অনবদ্য গোয়েন্দা চরিত্র কাকাবাবু। কাকাবাবুর আসল নাম রাজা রায়চৌধুরী। কাকাবাবু মধ্যবয়েসি এক গোয়েন্দা। তিনি ভারত সরকারের প্রত্নতত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা। কাকাবাবু একবার আফগানিস্তানে গাড়ি চালানোর সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। সেখানে কাকাবাবুর একটি পা ভেঙে যায়। তারপর থেকে তিনি হাঁটেন ক্র্যাচে ভর দিয়ে। বাংলায় প্রথম কোনো গোয়েন্দা চরিত্র যিনি দৈহিক ভাবে সামান্য অক্ষম হলেও মনের দিক থেকে, সাহসের দিক থেকে সব সময় এগিয়ে। কাকাবাবু কিছুদিন সিবিআই এর উপদেষ্টাও ছিলেন। বিয়ে করেননি।

কাকাবাবু অসম্ভব সাহসী। তিনি তাঁর ভাইপো সন্তু আর সন্তুর বন্ধু জোজোকে নিয়ে অনেক রোমহর্ষক অ্যাডভেঞ্চার করেছেন। কাকাবাবু শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হলেও বুদ্ধির জোরে বিভিন্ন জটিল সব সমস্যার সমাধান করেন। কাকাবাবুকে নিয়ে প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৭৯ সালে, 'আনন্দমেলা' পত্রিকায়। গল্পের নাম ছিল “ভয়ঙ্কর সুন্দর”। ২০১২ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মোট ৩৬টি কাকাবাবুর কাহিনী লিখেছেন। কাকাবাবুকে নিয়েও হয়েছে একাধিক সিনেমা।

Developed by DXDasia