বাঙালি মনীষীদের খাদ্যরসিকতা

“এই শীতে মুগের খিচুড়ি যেই খায় / সে জন ভোজনে আর কিছুই না চায়।”

খাদ্যরসিক বাঙালি মনীষী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের ভোজন প্রিয়তার একটা তালিকা দেওয়া হল। উনিশ শতকের রাজা রামমোহন রায় থেকে বিংশ শতকের সুকুমার রায় প্রত্যেকেই বাঙালির রন্ধনপ্রাচুর্য এবং রন্ধনকুশলতাকে শুধুই স্মরণ করেননি, এঁদের মধ্যে অনেকের খাওয়ার শক্তিও ছিল অপরিসীম। অমিতশক্তির অধিকারী রাজা রামমোহন রায় গোটা একটা পাঁঠার মাংস খেতে পারতেন। তাঁর প্রাত্যহিক খাদ্যতলিকায় ছিল একসঙ্গে পঞ্চাশটি আম, এক কাঁদি নারকেল আর বারো সের দুধ।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ এক সময়ে দুর্ভেদ্য পর্বতে গিয়েছিলেন। মরী পর্বতে থাকাকালীন দেবেন্দ্রনাথের পোষ্য গরু থেকে পাওয়া দশ-বারো সের দুধ একলাই প্রতিদিন খেতেন।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ছিলেন ভোজনরসিক। নিজে যেমন খেতে ভালোবাসতেন তেমনি ভালোবাসতেন মানুষকে খাওয়াতে। বাঙালির খাদ্যতালিকায় এত রকমের খাবারের কথা উল্লেখ করেছিলেন যে নাম শুনেই মুখে জল আসে। ঈশ্বরচন্দ্রের খাদ্যরসিকতার কথা বলতে গিয়ে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর জীবনচরিতে উল্লেখ করেছেন- ‘ঈশ্বরচন্দ্রের বাটীর দ্বার অবারিত ছিল। দুই বেলাই ক্রমাগত উনুন জ্বলিত, যে আসিত, সেই আহার পাইত। তিনি প্রায়ই ভোজের অনুষ্ঠান করিয়া আত্মীয়, মিত্র এবং ধনী লোকদিগকে আহার করাইতেন।’ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের লেখা ‘হেমন্তে বিবিধ খাদ্য’ কবিতায় খাদ্যের নানাবিধ নাম ও রন্ধন প্রণালীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

‘সুঁটির খিচুড়ি করে, খেয়েছে যে জন
ভুলিতে না পারে আর, তার আস্বাদন।

…………………………………

এই শীতে মুগের খিচুড়ি যেই খায়
সে জন ভোজনে আর কিছুই না চায়।

………………………………

এই মুগের ভাজাপুলি মুগ্ধ করে মুখ
বাসি খাও, তাজা খাও, কত তার সুখ।’

 

প্যারীচরণ সরকারও অপরিসীম ভোজনরসিক এবং খাদ্য পরিপাক শক্তির অধিকারী ছিলেন। জীবনীকার নবকৃষ্ণ ঘোষ প্যারীচরণের জীবনচরতিতে লিখেছেন – ‘বারাসতে হুগলী ব্রাঞ্চ স্কুলের শিক্ষক যোগেশচন্দ্র ঘোষের বাড়িতে প্যারীচরণ নিমন্ত্রিত হয়ে লুচি পাঠার মাংস পেটপুরে খেয়েও একসের ছানাবড়া খেয়ে নিতেন।’ তিনি নাকি একধামা মুড়ি ও মুলো নিমেষের মধ্যেই শেষ করে দিতেন। খাবার খেতে পারা ছিল তাঁর কাছে শিল্প। তিনি বলতেন ‘আমের আঁটি দাড়ি পর্যন্ত না ঠেকলে আম খাওয়া মঞ্জুর নহে।’ বারাসতের নবকৃষ্ণ মিত্রের বাড়িতে পাঁঠার মাংস রান্না হলে সেই মাংসের অর্ধেক খেতেন প্যারীচরণ এবং বাকি অর্ধেক খেতেন বিদ্যাসাগর মশাই।

পাঁঠার হাড়ের অম্বল কেউ কোনদিন শুনেছেন? দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় খাবার ছিল পাঁঠার হাড়ের অম্বল। তিনি তাঁর ‘গুম্ফ-আক্রমণ’ কাব্যে উল্লেখ করেছেন

‘বৃহৎ রূপার থালে    পাচক ব্রাহ্মণ ঢালে
মাংসের পোলাও গাদা গাদা
কি গুণ পাঁঠার হাড়ে    অম্বলের তার বাড়ে
কে বুঝিবে ইহার মর্যাদা।’

ঠাকুরবাড়িতে রান্না নিয়ে চর্চা হত। দেশ-বিদেশ নানা খাবার তৈরির প্রচলন ছিল। অবনঠাকুর একবার রান্নাশিক্ষার ক্লাস শুরু করলেন। সেখানে বাড়ির ছোটদের সঙ্গে বাড়ির বউ এমন কি পাচকঠাকুরদেরও আসতে হত। সেইসময় ঠাকুরবাড়িতে তৈরি হত পুডিং, আইসক্রিম। নবীন বাবুর্চি ছিল ঠাকুরবাড়ির মহলের প্রসিদ্ধ সূপকার। সে ছিল খাঁটি বার্মাদেশী বাবুর্চি। কিন্তু ইংরেজি রান্নার ওস্তাদ। তার অপূর্ব রান্না ঠাকুরবাড়িতে আমন্ত্রিত মানুষদের রসনাতৃপ্তি ঘটাত। নিত্য নতুন রান্না খেতে ভালোবাসতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেই সম্পর্কে প্রতিমাদেবী তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন- ‘নিত্য নতুন রান্না হলে তিনি ভারি খুশি হতেন, তাছাড়া নিজেও নানা প্রকারের রন্ধন তালিকা আমাদের বলতেন। সেই তালিকা অনুসারে রান্না উতরে গেলে তাঁর স্ফূর্তি হোত।’

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন পেটভরে মাংস পোলাও খেয়ে দু’সের রসগোল্লা খেয়ে ফেলতেন। তাঁর মায়ের হাতের রাবড়ী রসগোল্লা এবং পাটিসাপ্টা পিঠে যেমন প্রিয় ছিল তেমনি ভালোবাসতেন স্ত্রী বাসন্তি দেবীর হাতের তৈরি কপিছেঁচকি, ডিমের খগিনা আর চিংড়িমাছের কাটলেটকারি। ছড়া-রচয়িতা যোগীন্দ্রনাথ সরকার তাঁর ভোজন রসিকতাকে ছড়ার মাধ্যমে তৈরি প্রকাশ করেছিলেন-

দাদখানি চাল,      মুসুরির ডাল,
চিনি-পাতা দই,
দু’টা পাকা বেল,    সরিষার তেল,
ডিম ভরা কই,
সুকুমার রায় সরাসরি বাঙালিদের মতো করেই খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতের পক্ষপাতী –
খাইখাই কর কেন, এস বস আহারে-
খাওয়াব আজব খাওয়া, ভোজ কয় যাহারে।
যত কিছু খাওয়া লেখে বাঙালির ভাষাতে
জড় করে আনি সব, – থাক সেই আশাতে।
ডাল ভাত তরকারি ফলমূল শস্য,
আমিষ ও নিরামিষ, চর্ব্য ও চোষ্য,
রুটি লুটি, ভাজা-ভুজি, টক ঝাল মিষ্টি,
ময়রা ও পাচকের যত কিছু সৃষ্টি।

<এভাবেই যুগ যুগ ধরে মনীষীরাও তাঁদের ভোজনরসিক সত্তাটিকে সযত্নে লালন করেছেন। বাঙালির স্বভাব থেকে নিজেদের বিচ্যুত হতে দেননি একটুও।

Developed by DXDasia