শিক্ষিকা অন্নপূর্ণা তরখড়, কিশোর রবি ভালোবেসে নাম দিয়েছিলেন ‘নলিনী’

সামান্য কয়েক বছরের বড়ো এই কিশোরী বেশ মুগ্ধ ছিলেন তাঁর ছাত্রের কবিপ্রতিভায় এবং রূপেও

‘একটি অগ্নি—আনন্দ মৃত্যুর। 
এই মুহূর্তে লতাপাতা পুড়ে মরো
স্পর্শমাত্র শক্ত চন্দ্রচূড় 
পরমুহূর্ত বলে আর কিছু নেই
করো চুম্বন করো
মৃত্যুর চেয়ে আনন্দ মৃত্যূর
আগের পলকে।’

এমনই কয়েক মুহূর্তের প্রেমের গল্প লিখি আজ। একটি আপনভোলা কিশোর ছেলে আর একটি প্রগলভা কিশোরী। ওরা নিজেরাও বোঝেনি দুজনের মধ্যে পঞ্চশর এসে নতজানু হয়ে বসেছিলেন কয়েক মুহূর্তের জন্য। অনেক পরে, কিশোর ছেলেটি যখন প্রায় বৃদ্ধ, তখন স্মৃতির উতল বাতাস ভেসে এলো তাঁর মনে। তিনি তখন বিশ্বকবি! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। স্মৃতিকথনে বললেন, এক অপরূপ জ্যোৎস্নামাখা সন্ধেবেলার কথা। মেয়েটি হঠাৎ এসে হাজির সেই কিশোরের ঘরে। কিশোর রবির উপর  তখন ভর করেছে ‘হোমসিকনেস’! বাংলাদেশের জন্য মনখারাপ করছে তাঁর। তখন মেয়েটির অনেক আবদার। প্রথমে বললো, তার হাত ধরে টানতে— টাগ অফ ওয়ার হবে। তারপর শোনালো এক আশ্চর্য রীতির গল্প। কোনো ছেলে যদি কোনো ঘুমন্ত  মেয়ের দস্তানা চুরি করতে পারে, তাহলে নাকি সে মেয়েটিকে চুম্বনের অধিকার পায়। এই বলেই সেই কিশোরী মুহূর্তে অতল ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েছিলো। অথচ অবোধ সেই ঘুমঘোর থেকে জেগে উঠে দেখেছিলো, কেউ তার দস্তানা চুরি করেনি। গল্পটা অসমাপ্ত চুম্বনের রূপকথা হয়েই রইলো।

মেয়েটি আনা তরখড়। ভালো নাম অন্নপূর্ণা তরখড়। মারাঠি পরিবারের মেয়ে। তাঁর বাবা ছিলেন আত্মারাম পাণ্ডুরং তরখড়। বম্বের প্রার্থনা সমাজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। আনা কিন্তু প্রাথমিকভাবে  ছিলেন রবীন্দ্রনাথের গৃহশিক্ষয়িত্রী। তারপর তিনিই হয়ে উঠবেন রবীন্দ্রনাথের মুগ্ধ ছাত্রী। রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজি শেখাতে গিয়ে নিজেই শিখে ফেলবেন অনেকটা বাংলা। গভীর আবেগে বলবেন, ‘কবি, তোমার গান শুনলে আমি বোধহয় মরণদিনের থেকেও প্রাণ পেয়ে জেগে উঠতে পারি।’

বয়সে রবীন্দ্রনাথের থেকে কয়েক বছরের বড়োই ছিলেন আনা। রীতিমতো সুন্দরী, বিদুষী। যেন প্রাণবন্ত সরস্বতী। রবীন্দ্রনাথ তখন বিলেত যাওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই বিষয়ে প্রধান উদ্যোক্তা তাঁর মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রথমে আমেদাবাদের শাহিবাগ প্রাসাদের একাকিত্বে তাঁর সাধনা শুরু হয়। এইসময়কার একাকিত্ব রবীন্দ্রনাথকে আরো সৃষ্টিশীল করে তুলেছিলো। আমেদাবাদে বিভিন্ন গানে সুর দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।’ সত্যেন্দ্রনাথ যখন তাঁকে ইংরেজি ভাষা শেখানোর জন্য প্রবল তৎপর হয়ে উঠেছেন, তখনই রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র দাবি — ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস বাংলায় লেখার বই চাই।  পড়ে ফেলছেন অ্যাংলো স্যাকশন সাহিত্য, অ্যাঙ্গলো নর্মান সাহিত্য ইত্যাদি। ইংরেজি শেখার জন্যই প্রথমে বম্বের এক পারসি পরিবারে গৃহবিদ্যার্থী হয়ে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই গৃহকর্তার সঙ্গে পরিচিতির সূত্রেই আনার বাবা আত্মারাম পাণ্ডুরঙের সঙ্গে  আলাপ হয়। আত্মারামের তিন কন্যা—আনা, দুর্গা এবং মাণিক। এদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী ছিলেন আনা। আনা হলেন কিশোর রবির গৃহশিক্ষিকা। কিন্তু সামান্য কয়েক বছরের বড়ো এই কিশোরী বেশ মুগ্ধ ছিলেন তাঁর তথাকথিত ছাত্রের কবিপ্রতিভায় এবং রূপেও। রবীন্দ্রনাথকে দাড়ি রাখতে নিষেধ করেছিলেন আনা। কবির মুখের সীমানা যেন কোনোভাবেই ঢাকা না পড়ে, এই ছিলো তাঁর ইচ্ছে। সে ইচ্ছেকে যে রবি ঠাকুর গুরুত্ব দিতে পারেননি, তা সকলের জানা। রবীন্দ্রনাথ আনার কথা মনে করেই লিখেছিলেন, ‘আমার বিদ্যে সামান্যই, আমাকে হেলা করলে দোষ দেওয়া যেতে পারত না, তা করেননি। পুঁথিতে বিদ্যে ফলানোর মতো পুঁজি ছিল না। তাই সুবিধা পেলেই জানিয়ে দিতুম যে কবিতা লেখার হাত আমার আছে। আদর আদায় করবার ঐ ছিল আমার সবচেয়ে বড়ো মূলধন।’ আদরের একটি ডাকনাম চেয়েছিলেন আনা। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাম দিয়েছিলেন, ‘নলিনী।’ ‘কবিকাহিনী’-র নায়িকাকে এই নামটিই দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর আরও কয়েকবার রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে ফিরে ফিরে আসবে নলিনী নামটি। সুন্দরী আনার স্তাবক সংখ্যা কিছু কম ছিলো না। তবু, এই আবেগপ্রবণ কিশোরীর মনে কিশোর রবির বিশেষ এক প্রশ্রয়ের জায়গা ছিলো। এইটিই প্রেম কীনা বলা কঠিন। আসলে ওই বয়সে মনটা রঙিন কাচের মতো থাকে। তিনটি ভুবন রঙিন দেখায়। তাই আনা আর রবীন্দ্রনাথের গল্পটা এক কবির জীবনের রূপকথার সোনালি উপক্রমণিকা হয়ে। রবি ঠাকুর রইলেন আনার মনের সোনালি দিনের ভালো লাগা হয়ে। রবীন্দ্রনাথও বারবার স্মরণ করবেন এই ভালোবাসার ঋণ। কিশোরদিনে যাঁরা তাঁকে কাঁদিয়েছে, হাসিয়েছে, গান লুঠ করে ছড়িয়ে ফেলেছে কবি কৃতজ্ঞ ছিলেন তাঁদের প্রতি। আনা তাঁদেরই একজন। আনার বিয়ে হয়েছিলো বরোদা কলেজের অধ্যাপক লিটলডেলের সঙ্গে। আনা নিজেও বরোদার রাণীর গৃহশিক্ষিকা ছিলেন আর সারাজীবন রবীন্দ্রনাথের লেখার  ভক্ত ছিলেন। ‘ভারতী’ পত্রিকায় যখন ‘কবিকাহিনী’ প্রকাশিত হচ্ছে, আনা তখন রবীন্দ্রনাথের কাছে তার অনুবাদ শুনতেন। কিন্তু এই কাব্যের এবং তার কবির জন্য আনা বাংলা শেখা শুরু করেন। পরে ‘কবিকাহিনী’ প্রকাশিত হলে রবীন্দ্রনাথ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সাহায্যে আনাকে তার একটি খণ্ড উপহার পাঠিয়েছিলেন। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে আনা চিরঘুমে ঘুমিয়ে পড়েন, ঠিক যেন ঘুমন্ত রাজকন্যা।  কবির গানেও আর তাঁর জেগে ওঠা হয়নি আর কোনো রাজপুত্র তাঁর শুভ্র ললাটে চুম্বন করে তাঁকে জাগিয়ে তোলেনি সেই মরণঘুম থেকে। 

তথ্যসূত্রঃ
কবিমানসী (১ম এবং ২য় খণ্ড), জগদীশ ভট্টাচার্য
কবিতা সংগ্রহ, জয় গোস্বামী
ইন্টারনেটের সূত্র

Developed by DXDasia