‘গভীর নির্জন পথে’ পাড়ি দিলেন গ্রাম ও গানপ্রিয় সাহিত্যিক সুধীর চক্রবর্তী

লোকায়ত জীবনকে পিছনে রেখে লোকোত্তরে চলে গেলেন সুধীর চক্রবর্তী, ১৫ ডিসেম্বরের বিকেলে

‘গভীর নির্জন পথে’ ঘুরে বেরিয়ে আমাদের জন্য মণিমুক্তো তুলে আনতেন তিনি। লোকায়ত জীবনকে পিছনে রেখে লোকোত্তরে পাড়ি দিলেন সুধীর চক্রবর্তী, ১৫ ডিসেম্বরের বিকেলে।

জন্ম ১৯৩৪ সনের ১৯ সেপ্টেম্বর, শিবপুরে। বাড়ির কাছেই গঙ্গার ঘাট৷ সেখানে নিতান্ত বালকবেলায় দেখেছিলেন অন্তর্জলী যাত্রা। আসন্ন মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থাকা মৃত্যুপথযাত্রীদের দিনের পর দিন দেখবার অভিজ্ঞতা তাঁর লেখকসত্তায় জারিত করেছিল বিবিক্তি, এক গভীরতর নির্বেদ।

তখন আসন্ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। বোমা পড়ল শিবপুরে। বাবার সঙ্গে দাদার কাঁধে চেপে রওনা হলেন নদিয়ার দিগনগরে, পৈতৃক বাস্তুভিটেয়। দিগনগর তখন ফাঁকা, মারিতে প্রায় সারা গ্রাম উজার হয়ে গেছে। গ্রামের রাঘবেশ্বর মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার অনবদ্য সাজ, তার মধ্যে একটু একটু করে অজান্তে ঢুকিয়ে দিচ্ছে লোকশিল্প সম্পর্কে অমোঘ আকর্ষণ যা তাঁর ভবিষ্যৎ সাহিত্যজীবনের নিয়ন্তা হয়ে উঠবে। কিন্তু একবছর পরেই চলে গেলেন কৃষ্ণনগর। গ্রামের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এড়াতে পিতৃদেব সপরিবারে পাড়ি দিলেন সেখানে। তখন থেকেই তিনি পাকাপাকি কৃষ্ণনাগরিক। সালটা ১৯৪২, সুধীরের বয়স মাত্র আট।

দিগনগরের আপার প্রাইমারি ছেড়ে ভর্তি হলেন কৃষ্ণনগরের দেবনাথ স্কুলে। এই স্কুল থেকেই ১৯৫১ সালে শেষ ব্যাচের ম্যাট্রিকুলেট। অতঃপর কৃষ্ণনগর কলেজ। সহপাঠী পুলু, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। মনে করতেন জীবনের ভিত গড়বার কাজে এই কলেজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। তাই অধ্যাপনা শুরুর দিনে প্রেসিডেন্সিতে পড়াবার সুযোগ পেলেও নির্দ্বিধায় বেছে নিয়েছিলেন কৃষ্ণনগর কলেজ। মনে করতেন তাঁর বেড়ে ওঠার দিনগুলিতে কলেজের মাস্টারমশাইদের শিক্ষা এবং পরিবেশের বড়ো ভূমিকা আছে।

স্নাতক হয়ে কৃষ্ণনগর থেকে এমএ পড়তে এলেন কলকাতায়। সহপাঠী হিসেবে পেলেন শিশিরকুমার দাশ, অমিয় বাগচি-সহ আরও অনেককে৷ এ যেন সংস্কৃতির সিংহদ্বারে প্রবেশ। দেখছেন শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্তের নাটক, সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালি। কলেজের শিক্ষক হিসেবে পাচ্ছেন প্রমথনাথ বিশী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শশিভূষণ দাশগুপ্ত-সহ বিখ্যাত অধ্যাপকদের। থাকতেন ওয়েলিংটন কলেজের হোস্টেলে। যেখানে আনাগোনা ছিল তরুণ শিল্পী ও লেখক বন্ধুদের। যাঁরা ভবিষ্যতে কলকাতা শাসন করবেন।

কলেজস্ট্রিটের মিত্র ও ঘোষ প্রকাশনা সংস্থায় দেখা পেতেন মনোজ বসু, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ি, কালিদাস রায়, কুমুদরঞ্জন মল্লিকের। কবিতা ভবনে গিয়ে বুদ্ধদেব বসুর সস্নেহ প্রশ্রয় তাঁকে নিশ্চিতভাবে টেনে নিল সাহিত্যিক হিসেবে নিশ্চিত প্রতিষ্ঠা পাওয়ার দিকে। ১৯৫৮-তে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান বেহালার বরিষা বিবেকানন্দ কলেজে। ১৯৬০ থেকে কৃষ্ণনগর সরকারি চাকরিতে যোগদান।

লেখকজীবনের সলতে পাকানো ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। কৃষ্ণনগর কলেজে ছাত্রাবস্থার প্রথম বর্ষে কলেজ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রথম লেখা 'পথে যেতে যেতে'। তারপর স্থানীয় মাসিক পত্রিকা ‘হোমশিখা’-য় জীবনানন্দ দাশের স্মরণিকা। কলকাতায় প্রথম লেখা 'নতুন সাহিত্য' পত্রিকায়, সম্পাদক প্রয়াত অনিলকুমার সিংহর আগ্রহে। পরবর্তীকালে 'দেশ' পত্রিকায় লিখেছেন ৫০টিরও বেশি প্রবন্ধ।

লেখকজীবন সম্পর্কে বলেছেন, “আমার দুটি বিষয়ে মূল আগ্রহ, গান এবং গ্রাম।”

প্রথম বই প্রকাশ ৫০ বছর বয়সে। একইসঙ্গে দুটি বই, ‘গানের লীলার সেই কিনারে’ এবং ‘সাহেবধনী সম্প্রদায় ও তাদের গান’। লেখকজীবনের শুরুতে প্রতিটি নাম-করা পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশ পেলেও খুবই তাড়াতাড়ি থামিয়ে দিয়েছিলেন কবিতার কলম। কলকাতার ছাত্রজীবনের প্রথমদিকে নীরেন্দ্রনাথ, নরেশ গুহ, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ-র কবিতাবই কেনার জন্য মফসসলের পত্রিকার প্রুফ দেখেছেন। ২৫ টাকা রোজগারের পুরোটাই খরচ হত কবিতার বইয়ে।

নদিয়া জেলার লোকসংগীত দিয়ে তাঁর সংগীত বিষয়ক গবেষণার শুরু। আরম্ভটা বেশ মজার। ১৯৭০ সালে কৃষ্ণনগর কলেজে পড়ানোর সময় ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন থেকে নোটিশ এল স্কলারশিপ দেওয়া হবে। সহকর্মী অধ্যাপক বললেন, ‘অ্যাপ্লাই করুন’। করলেন এবং অচিরে এসে গেল গ্রান্ট। হঠাৎ করেই বিশেষ কিছু না ভেবে বিষয় স্থির করলেন — ‘নদিয়া জেলার লোকসংগীত’। 

এভাবেই শুরু। তারপর বিবিধ বিষয়ে গবেষণা। লোকধর্ম, লোকভাষা, লালন, বাংলা কাব্যগীতি, রবীন্দ্রনাথ, সংস্কৃতি, নৃতত্ত্ব তাঁর আগ্রহ ক্রমশ পরিব্যাপ্ত হয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। তিন দশকেরও বেশি নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, বীরভূম, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল পায়ে হেঁটে চষে বেড়িয়েছেন। অক্ষয়কুমার দত্তের ক্ষেত্রসমীক্ষার ধারাটিকে আরও বিস্তৃত করেছিলেন সুধীর চক্রবর্তী। মাঠে-ঘাটে ক্ষেত্রসমীক্ষায় দেশের লোকজ সংস্কৃতিকে চেনবার এক দর্পণ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। এই চর্চার ফসল ‘বাউল ফকির কথা’, ‘সাহেবধনী সম্প্রদায় ও তাদের গান’, ‘ব্রাত্য লোকায়ত লালন’, ‘বলাহাড়ি সম্প্রদায় আর তাদের গান’, ‘মানিনী রূপমতী কুবির গোঁসাই’, ‘বাংলা দেহতত্ত্বের গান’, ‘বাংলায় বাউল ফকির’ ইত্যাদি অসংখ্য কোষগ্রন্থ। ‘বাউল ফকির কথা’-র জন্য ২০০২ সালে পান আনন্দ পুরস্কার, ২০০৪-এ সাহিত্য আকাদেমি। এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে সুকুমার সেন গোল্ড মেডেল, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরোজিনী বসু স্বর্ণপদক, রবীন্দ্রভারতী থেকে দীনেশচন্দ্র সেন নামাঙ্কিত পুরস্কার ছাড়াও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘এমিনেন্ট টিচার’ পদক৷ এছাড়াও শিরোমণি পুরস্কার ও নরসিংহদাস পুরস্কার।
 
নিজেকে অবিরত সাহিত্যকর্মে নিরত রেখেছেন তিনি। অবসর নেওয়ার পর ১৯৯৬-২০০৮ সালে কৃষ্ণনগর থেকে প্রকাশ করেছেন ‘ধ্রুবপদ’ নামক বার্ষিক সংকলন। বিষয়-বৈচিত্র্যে  অতুলনীয় ওই সংকলনগুলি আকরগ্রন্থের মর্যাদা পেতে পারে। যৌনতা ও সংস্কৃতি, দৃশ্যরূপ, ব্যতিক্রমী বাঙালি সংকলনগুলো গবেষকদের পরম সহায়। সম্পাদনা করেছেন ১০-১২টি গ্রন্থ।

রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৯০। রচিত গ্রন্থের সম্ভার, স্ত্রী এবং দুই কন্যাকে রেখে পাড়ি দিলেন ‘গভীর নির্জন পথে’। আমাদের জন্য রেখে গেলেন বাংলা গদ্যে তাঁর নিজস্ব বয়ান, অসংখ্য বক্তৃতার সুখস্মৃতি, গ্রন্থবদ্ধ গভীর মণীষার রত্নসম্ভার, যা ভবিষ্যৎ গবেষক পাঠককে প্রাণিত করবে গভীর থেকে গভীরতর অনুসন্ধিৎসার দিকে।
 

Developed by DXDasia