পাঁচলাখি স্যুট পরা উলঙ্গ রাজা, আর সব নির্লজ্জ দামড়ার দল

ক্ষুধার সূচকে দেখা যাচ্ছে সমীক্ষা করা ১১৯টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০০ নম্বরে

দেশের রাজধানী নয়াদিল্লির সুসজ্জিত মুখমণ্ডলে কপালের তিলক হল রাজপথ। সেই রাজপথে প্রতি বছর সাধারণতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ টেলিভিশনে প্রচারের কল্যাণে আপামর ভারতবাসীর এতই পরিচিত, যে চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাওয়া যায়। ভারতের রাষ্ট্রশক্তির ধুমধাড়াক্কা ওই প্রদর্শনে গর্বে নাগরিকের বুক ফুলে ওঠে। ওঠারই কথা। কী বিশাল বিশাল সব কামান। দীর্ঘদেহী সবল সৈনিকদের দৃপ্ত লেফ্ট রাইট। এমনকী মেয়েদেরও কী চমৎকার আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি। স্বাস্থ্য, শক্তি, সাহস, সাফল্য ও উদ্যমের এই প্রদর্শনে প্রতিটি নাগরিকের অংশীদারি রয়েছে। এই ভারত ১২৫ কোটি নাগরিকের প্রত্যেকের।

আমরা আগামী ২৬ জানুয়ারি দিল্লির রাজপথে গোটা বিশ্বের সামনে একটা বিকল্প প্রদর্শনীর প্রস্তাব করছি এই নিবন্ধে। তার শুরুতে থাকবেন দেশের প্রধানমন্ত্রী, তারপর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীরা, তারপর দেশের প্রতিটি রাজ্যের বর্তমান এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীরা, তারপর বর্তমান এবং প্রাক্তন সমস্ত সাংসদ এবং রাজ্য আইনসভার সদস্যরা, তারও পরে প্রশাসক থেকে বিচারক, শিক্ষক থেকে সাংবাদিক, শিল্পপতি থেকে পুরপিতা— সমাজের হোমরা চোমরা, কেষ্ট বিষ্টু সক্কলে। কুচকাওয়াজরত সৈনিকের হাতে বেয়নেটের মতো মিছিলের এই অগ্রপুরুষদের (সামান্য কিছু নারীও যদিও থাকবেন এঁদের মধ্যে) হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে একটি করে ভিক্ষাপাত্র। পরিচিত ছবিতে যেমন এক এক রেজিমেন্টের এক একটি পতাকা থাকে, তার বদলে সকলের হাতেই থাকবে একটি নিশান, তাতে লেখা, ‘আমি আমার সন্তানদের খেতে দিতে পারি না’। এই মিছিলে কারও পরনে পাটভাঙা ধুতি পাঞ্জাবি, কারও শেরওয়ানি, কারও বিলিতি কেতাদুরস্ত থ্রি–পিস স্যুট, কারও এক কেজি সোনার জরির কাজ করা কোটি টাকা দামের শাড়ি, কারও বা নিজের নাম লেখা পাঁচ লাখ টাকা দামের গলাবন্ধ স্যুট। আসলে কিন্তু আমরা সবাই জানি, এটা উলঙ্গ রাজাদের মিছিল।দর্শক হিসেবে আমন্ত্রিত দেশের কোটি কোটি অপুষ্ট, অর্ধভুক্ত, রুগ্ন শিশু খিদের যন্ত্রণার মধ্যেই একটা দিন এই আমুদে মিছিল দেখে হাততালি দিয়ে বলবে, ‘রাজা, তোর কাপড় কোথায়’?

রাজনীতি যেমন সত্য বলে না, অঙ্ক তেমনই মিথ্যা বলে না। অঙ্ক কষে দেখা যাচ্ছে ক্ষুধার সূচকে ২০১৪ থেকে ১৫, ১৬ হয়ে ২০১৭ এই চার বছরে ভারতের অবস্থান যথাক্রমে ৭২, ৭৬, ৮২ এবং ৮৪। তার মানে ভারত সত্যিই সারা বিশ্বের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। রাজনীতির লোকদের সর্ব বিষয়ে অশেষ জ্ঞান থাকে বলে এই শিশুদের খেতে টেতে না পাওয়ার মতো ছোটখাটো বিষয়ে তাঁদের নজর পড়ে এই ধরনের একটা রিপোর্ট প্রকাশিত হলে।

গত সপ্তাহে ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের ২০১৭ সালের বিশ্ব ক্ষুধা রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। তাতে ক্ষুধার সূচকে দেখা যাচ্ছে সমীক্ষা করা ১১৯টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০০ নম্বরে। মানে ৯৯টি দেশের পিছনে। যে সংবাদে দেশের শাসককুলের লজ্জায় অধোবদন হয়ে দেশের বাচ্চাদের কীভাবে পেট ভরানো যায়, পুষ্টিকর খাবার খাওয়নো যায় তা নিয়ে সিরিয়াস চর্চায় নেমে পড়া উচিত ছিল, তা এই হতভাগ্য দেশে দলীয় রাজনীতির কাদা ছোড়াছুড়ির নতুন একটি রাউন্ডের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কংগ্রেস সহ বিরোধীদের বক্তব্য, ২০১৪ সালে ভারতের স্থান ছিল ৫৫ নম্বরে (যদিও তা সমীক্ষা করা ৭৬টি দেশের মধ্যে), সুতরাং মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকারের আমলে বাচ্চারা বেশি বেশি করে অনাহার ও অপুষ্টিতে ভুগছে। তা হলে স্বাধীনতার পর ৭০ বছরের মধ্যে ৫৪ বছরের কংগ্রেস শাসনে কী কাজ হয়েছে এই বিষয়ে? ২০১৪ সালের আগের অব্যবহিত দশ বছরে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ–র শাসনে তখন বাচ্চারা যে দুধ ডিম কলা খাচ্ছিল, মোদি ক্ষমতায় এসে কি তা কেড়ে নিয়েছেন? রাজনীতির কারবারিরা এর উত্তর দেওয়ার দরকার বোধ করেন না। উল্টোদিকে বিজেপি–র মুখপাত্ররা বলছেন, জগৎসভায় ভারতকে হেয় করার জন্য অপপ্রচার চলছে, মোদির ‘সুশাসনকে’ কলঙ্কিত করার এ এক ষড়যন্ত্র। তার মানে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার যে রিপোর্ট সারা বিশ্বে গ্রাহ্য হয়, যে রিপোর্ট তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে সারা পৃথিবীর দিকপাল অর্থনীতিবিদরা জড়িত, তার লক্ষ্য ১১৯টির মধ্যে একটি দেশকে বেছে বেছে হেয় করা? রিপোর্ট প্রস্ততকারকরা ভোটে দাঁড়াবেন না, কোন স্বার্থে তাঁরা একটি বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার মিথ্যা রিপোর্টে দেবেন? রাজনীতির কারবারিরা এই প্রশ্নেরও উত্তর দেওয়ার দরকার বোধ করেন না।

রাজনীতি যেমন কখনও পুরো সত্য বলে না, অঙ্ক তেমনই কখনও মিথ্যা বলে না। ভারত কি ক্ষুধার সূচকে আগের চেয়ে সত্যিই পিছিয়ে পড়ছে? ২০১৪ থেকে ১৫, ১৬ হয়ে ২০১৭ এই চার বছরে ভারতের স্থান ছিল যথাক্রমে ৫৫ (৭৬), ৮০ (১০৪), ৯৭ (১১৮) এবং ১০০ (১১৯), বন্ধনীর মধ্যে সংখ্যাগুলো হল মোট কতগুলো দেশ সমীক্ষার আওতায় ছিল। এই সংখ্যাটা এক এক বার এক এক রকম মানে হল পরীক্ষায় ফুল মার্কসটাই বারবার বদলে গিয়েছে। এখানে ভারতের অবস্থানের সঠিক ছবিটা পেতে হলে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পার্সেন্টাইলের হিসেবটার মতো নিতে হবে দেখতে হবে মোট কত শতাংশ দেশের পরে ভারত অবস্থান করছে। অঙ্ক কষে সেই সংখ্যাটা ২০১৪ থেকে ১৫, ১৬ হয়ে ২০১৭ এই চার বছরে দাঁড়াচ্ছে যথাক্রমে ৭২, ৭৬, ৮২ এবং ৮৪। তার মানে ভারত সত্যিই সারা বিশ্বের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে, তা সে শাসকবর্গ যত জোর গলায় অন্য যে কোনও পরিসংখ্যানের কারিকুরিই পেশ করুক না কেন। রাজনীতির লোকদের সর্ব বিষয়ে অশেষ জ্ঞান থাকে বলে এই শিশুদের খেতে টেতে না পাওয়ার মতো ছোটখাটো বিষয়ে তাঁদের নজর পড়ে এই ধরনের একটা রিপোর্ট প্রকাশিত হলে। দারিদ্র্য, অপুষ্টি, অনাহার নিয়ে বিশ্ব জুড়ে অর্থনীতি চর্চার একটা যথেষ্ট জোরদার পরম্পরা আছে এবং অমর্ত্য সেনকে সেই ধারার অগ্রগণ্য পণ্ডিত বলে পৃথিবী মেনে নিয়েছে। সেন এবং তাঁর মতাবলম্বীরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছেন ভারতীয়দের ক্যালরি গ্রহণ এবং পুষ্টিকর ক্যালরি গ্রহণ ক্রমশ কমে আসছে। ২০০৯ সালে ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি পত্রিকায় এক প্রবন্ধে জঁ দ্রেজ এবং অ্যাঙ্গাস ডিটন তা পরিষ্কার প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।

ক্ষুধার নিরিখে শিশুরা কেমন আছে? এটা দেখার জন্য মাপা হয় ক্ষুধার সূচক। এর চারটি অংশ: শিশু মৃত্যুর হার, যথেষ্ট (পরিমাণে এবং গুণগত বিচারে) খাবার পাচ্ছে কিনা, সে বয়সের তুলনায় খর্বকায় কিনা, এবং সে অতি অপুষ্ট অর্থাৎ উচ্চতার তুলনায় তার ওজন কম কিনা। এই অতি অপুষ্ট অবস্থার প্রচলিত ইংরেজিটা খুবই ইঙ্গিতবাহী— wasted, যার বাংলা হতে পারে ‘অপচয় হওয়া’। ওয়েস্টেড এবং অতীব (সিভিয়ারলি) ওয়েস্টেড বাচ্চা মানে আক্ষরিকভাবেই তাই, যে মনুষ্যসন্তানের কোনও দিন সম্ভাব্য পূর্ণ বিকাশ হবে না। সে বড় হয়ে কাগজকুড়ানি হতে পারে, ফুটপাথের গণিকা হতে পারে, কিন্তু কখনই ওই উলঙ্গ রাজাদের মিছিল অবধি পৌঁছতে পারবে না। আসলে তার পরিণত বয়স অবধি সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাই কম। এখান থেকেই ওয়েস্টেড শব্দটা আসে। আর এই এই জন্যই অমর্ত্য সেনের দৃষ্টিতে দারিদ্র্যের মধ্যে নিহিত সবচেয়ে বড় অন্যায়টা হল তার ফলে মানুষের প্রতিভার সম্ভাব্য বিকাশ বন্ধ হয়ে যাওয়া। ক্ষুধার সূচকে গত কয়েক বছরে ভারতের পিছিয়ে পড়ার কাহিনী জনচর্চায় চলে আসার পর শাসকবর্গ বলছে, তিনটি মাপকাঠিতেই ভারত আগের থেকে উন্নতি করেছে, শুধু ওয়েস্টেড বাচ্চার হারে পিছিয়ে পড়েছে, তাই সব মিলিয়েও পিছিয়ে পড়েছে। যেন আমাদের সন্তানরা আরও বেশি করে অপচয় হচ্ছে, এই সত্যটা কোনও তথ্যের কারিকুরি দিয়ে ঢাকা যায়!

ছবিটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (চতুর্থ এবং সর্বশেষ পর্যায়, ২০১৫–১৬) রিপোর্টে চোখ রাখলে। এই সার্ভের আগের তৃতীয় পর্যায়টা হয়েছিল ঠিক এক দশক আগে ২০০৫–০৬ সালে। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে শিশু মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে দশ বছরে অগ্রগতি হলেও ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সের মধ্যে প্রতি দশজন শিশুর মধ্যে নয় জনই যথেষ্ট পরিমাণ এবং যথেষ্ট পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে না। এমন শিশুরা বড় হলে তাদের দিয়ে ভোটে জেতা যদি সম্ভব হলেও হয়, ভারতকে জগৎসভায় এক নম্বর করা যাবে কি? মাত্র দশ শতাংশ বাচ্চাকে জন্ম থেকে ঠিকমতো খেতে দিয়ে উলঙ্গ রাজার দল কি গোড়াতেই ছিক করে রাখছে না কোনটা দুয়োরানির মেয়ে, কোনটা সুয়োরানির ছেলে?

আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় খর্বাকৃতি শিশুর হার দশ বছরে প্রায় ১০% কমলেও এখনও ৩৮ শতাংশের বেশি। ভারতীয়রা বংশানুক্রমে জিনগতভাবে খর্বাকৃতি এমন একটা তত্ত্ব ইদানীং খুব চলছে। আমেরিকায় দু প্রজন্মের বেশি বসবাসকারী ভারতীয়দের মধ্যে কিন্তু দেখা গেছে আন্তর্জাতিক মানের সমান লম্বা বাচ্চাই জন্মাচ্ছে, যদিও তাদের বাপ–ঠাকুরদা বা মা–দিদিমা ভারতীয়র বাইরে বিয়ে করে বংশগতিতে লম্বা জিন গ্রহণ করেননি।

ক্ষুধার সূচকের শেষ অঙ্গ, শিশু ওয়েস্টেড হচ্ছে কিনা, সেই বিচারে দুটি সার্ভের মধ্যে দশ বছরে আমরা ১৯.৮ থেকে পিছিয়ে এসেছি ২১ শতাংশে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নতির হারে যে দেশে দুনিয়ায় এক নম্বর হওয়ার বড়াই করছে, তার প্রতি পাঁচটি শিশুর মধ্যে একটি এখনও বড় হচ্ছে মনুষ্যেতর জীবন কাটাবে বলে। আমরা হয়তো তখন থাকব না। কিন্তু আমাদেরই দেশের এই শিশুরা বড় হবে, বেঁচে থাকবে এমন একটা সময়ে যখন দুনিয়াটা সর্ব অর্থেই ক্রমাগত এগিয়ে চলছে।

আমাদের সন্তানদের জন্য এ কোন উত্তরাধিকার আমরা রেখে যাচ্ছি?

Developed by DXDasia