তুমি চলেছো ঢেউয়ে ঢেউয়ে কোথায়?

প্রয়াত বাংলার ‘প্রথম সিঙ্গার সং রাইটার’ অরুণেন্দু দাস

শূন্যের ভিতর যে এত অন্ধকার, তা তো অরুণেন্দু দাসের গান না শুনলে বুঝতেই পারতাম না। শূন্য তবু শূন্য নয়, আলো তবু আলোর মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা যে অন্ধকার তার মধ্যেই হাতড়ে বেড়ানো বেঁচে থাকার রসদ। পৃথিবীতে গান আছে, সুর আছে, কণ্ঠ আছে, তার চেয়েও স্পষ্ট হয়ে আছে দর্শন। যা দেখায়, যা ভাবায়, যা এগিয়ে চলার চওড়া রাস্তা দেখায়। শরীরের গোপন থেকে উঠে আসে আলতো বাঁশির সুর, সেই সুর তো মর্ডান গিটারেরও হতে পারে। বাংলা গানের তখন মধ্য গগন। এসে পড়লেন একঝাঁক তরুণ। কারোর হাতে গিটার, কারোর হাতে বাঁশি, কারোর হাতে স্যাক্সোফোন। ১৯৫৬-১৯৬১। বাংলা গানে জ্বলজ্বল করছেন হেমন্ত-মান্না-সন্ধ্যা-লতা-সলিল। ঠিক সেই সময় বাংলা গানের শ্রোতাকে গিটার ধরতে শেখালেন এক যুবক। বাংলা নতুন গানের ধারা তখনও অভ্যাসে পরিণত হয়নি। আলোর থেকেও দ্রুত বেগে ছুটে এলেন অরুণেন্দুরা। ওই যে, শূন্য তবু শূন্য নয়। শূন্যের ভিতরেই যে এত ঢেউ, তা তো বাংলা গানের শ্রোতা বুঝতেই পারতেন না। ভাগ্যিস, অরুণেন্দুরা এলেন! 

পাঁচের দশকের মাঝামাঝি সময়। কলেজের বারান্দায় একজন ছাত্র গিটারে টুংটাং করে গান শোনাতেন বন্ধুদের। কলেজের অনুষ্ঠানে গান গাইতেন। এক্কেবারে নতুন ফ্রেশ গান নিয়ে যে বিপুল শ্রোতার কাছাকাছি পৌঁছাবেন, এক মুহূর্তের জন্যেও ভাবেননি। তাই অচেনা সেইসব গানগুলো পড়ে থাকত বন্ধুদের মধ্যেই। অরুণেন্দু পরবর্তীকালে বলেছেন, “গানগুলো রচিত হয়েছিল গিটারের উপর আঙুল চালানোয় পারদর্শিতা অর্জনের উদ্দেশে।” তিনি আরও বলেছেন, নতুন কোনও কর্ড সিকোয়েন্স, স্ট্রামিং বা পিকিং-এর কায়দা কোথাও দেখলে বা শুনলে সঙ্গে সঙ্গে কম্পোজ করতে শুরু করতেন। কানে লাগা কোনো গানের সুর ও ভাবের অনুকরণে নয়, অনুসরণে বাংলায় কথা গুছিয়ে তুলতে। যাতে ছয়তারের সঙ্গতে নিজেদের মতো করে সহজ ভাবে গাইতে পারা যায়। 

ছয়ের দশকে অরুণেন্দু দাস চলে যান ইংল্যান্ডে। সেখানে আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডের বহু লোকসঙ্গীতের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। অক্সফোর্ডশায়ারের মার্কেট টাউনের একটা ফোক ক্লাবের সদস্য হয়ে গিটার বাজানোর কিছু কিছু নতুন কায়দা আয়ত্ত করেন। তারপর সেই গানগুলিকেই মজিয়ে মজিয়ে নিজের মতো সাজিয়ে, লিখে, কম্পোজ করে রাখতেন। ১৯৮৬ সালে মহীনের ঘোড়াগুলির গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয় অরুণেন্দুর। তারপর থেকে চারটি গানের সংকলন, যেমন- আবার বছর কুড়ি পরে, ঝরা সময়ের গান, মায়া এবং ক্ষ্যাপার গান- প্রত্যেকটিতেই তাঁর গান ব্যবহৃত হয়। 

মহীনের ঘোড়াগুলির এক একটি গানের মাত্রা এক একরকম। অরুণেন্দু দাসের লেখা এবং সুর করা গানগুলির মধ্যে একধরনের মাদকতা ছিল। যা শুধুই তরুণ-তরুণীর নিজস্ব। গান নয়, যেন কথোপকথন। তার পাশ দিয়ে নদীর মতো বয়ে বেড়াচ্ছে সুরের মূর্চ্ছনা। তাঁর একটি বিখ্যাত কালজয়ী গান- “দিশেহারা যে মোর মন কীসে সার্থক এ জীবন/ খুঁজে ফিরি কোথা নেবো ঠাঁই/ চারিদিকে সবাই মোর, কেউ ভালো কেউ মন্দ ঘোর/ আপন মান যেচে সেথা বেড়াই/ মনে ভাবনা তবু ঘিরে রয়েছে সদাই/ এত চাওয়া নিয়ে কোথা যাই!” এই গান এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য গানগুলির মধ্যে রয়েছে, “ও গঙ্গা তুমি চলেছো ঢেউয়ে ঢেউয়ে কোথায়”, “আমার প্রিয়া ঝর্ণা খুশির, পানীয় নেশার/ কানে মোর শোনায় সদাই সে আমার, আমার, আমার”, “কে কে যাবিরে”, “আমার প্রিয়া খুশির পানীয় নেশার” আরও কত কি। এই সব গানগুলিই ছয় তারের। ‘ছয় তারের গান” নামে তাঁর একটি গানের সংকলনও আছে। 

এত চাওয়া নিয়ে অরুণেন্দু দাস গত ২ ফেব্রুয়ারি কোথায় হারিয়ে গেলেন! আপনার সুর বা কথার ঢেউ- গঙ্গার মতোই আমাদের প্রাণ দিক, চওড়া রাস্তা দেখাক, জ্বলজ্বল করুক আপনার গিটার আর শূন্যের ভিতরে হাজার হাজার আলো।

Developed by DXDasia