১৯২৮ সালে নিউবেরি পদকটি এসেছিল তাঁরই ঝুলিতে
তিনি ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম সফল ভারতীয় ‘বুদ্ধিজীবী’ এবং ১৯২৮ সালে নিউবেরি পদকটিও এসেছিল তাঁরই ঝুলিতে। তিনি ধন গোপাল মুখোপাধ্যায়। স্কটিশ চার্চ কলেজের স্নাতক ধন গোপাল তাঁর মেধার মাধ্যমে জয় করেছিলেন সারা বিশ্ব। এই স্বনামধন্য বাঙালি বুদ্ধিজীবী টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছিলেন।
১৮৯০ সালের জুলাই মাসে, কলকাতার কাছাকাছি কাজঙ্গল নামে একটি জঙ্গলের প্রান্তে এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। তাঁর বাবা ছিলেন একজন আইনজীবী (যাঁকে তিনি ‘পৃথিবীর বুকে হারিয়ে যাওয়া অলিম্পিয়ান’ বলে উল্লেখ করেছিলেন), কিন্তু অসুস্থতার কারণে অনুশীলন ছেড়ে দিয়ে তিনি গানবাজনা শিখতে শুরু করেন এবং গ্রামের মন্দিরে পুরোহিত হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৩৩ সালে লেখা আত্মজীবনী ‘কাস্ট অ্যান্ড আউটকাস্ট’-এ ধন গোপাল তাঁর শৈশব এবং কৈশোরের বর্ণনা দিয়ে লিখেছিলেন, কীভাবে পূর্বপুরুষদের নিয়ম অনুযায়ী ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলেদের এক বছরের জন্য কঠোর সন্ন্যাসজীবন পালন করতে হত এবং তাঁর নিজের সন্ন্যাস-অভিজ্ঞতা।
তবে, প্রথাগত হিন্দু সমাজের ভূমিকা, তাঁদের পিছিয়ে পড়া চিন্তাভাবনা আর কঠোর নিয়মের জাল কেটে, সন্ন্যাস জীবন ত্যাগ করে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য চলে আসেন। সেখানে তিনি তাঁর দাদা যদু গোপাল মুখোপাধ্যায়ের বন্ধুদলের সংস্পর্শে এসে বঙ্গ প্রতিরোধের ধারণা পেয়েছিলেন। যদু গোপাল বিনা বিচারে ১৯২৩ সাল থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত জেলে বন্দি ছিলেন। পরে ধন গোপাল ‘মাই ব্রাদার্স ফেস’ শিরোনামে যদু গোপাল সম্পর্কে একটি স্মৃতিকথাও লিখেছিলেন।
১৯১০ সালে, দাদাকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচানোর আশায় ধন গোপাল মুখোপাধ্যায়ের পরিবার তাঁকে যন্ত্রশিল্প বিষয়ে পড়ার জন্য জাপানে পাঠায়। প্রথমে শিল্পায়নের ইতিবাচক মনোভাবে মুগ্ধ হলেও, পরবর্তীকালে তিনি অ্যাসেম্বলি লাইনের উত্পাদন এবং প্রবর্তনের দিকগুলি প্রত্যক্ষ করে হতাশ হন এবং তাঁর মনে হয় এই পুরো বিষয়টাই অমানবিকতা, অবক্ষয় ও অবজ্ঞার প্রতিরূপ। বিশেষত তিনি হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন এটা ভেবে যে, কীভাবে একটা গুরুতর দুর্ঘটনার শিকার হওয়া অ্যাসেম্বলি লাইনের কর্মীদের চিকিৎসা, স্বাস্থ্য সুবিধাসমূহ বা পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের কথা বিবেচনা না করে কারখানার মালিক বা নিয়োগকর্তারা শ্রমিকদের চাকরি কেড়ে নিয়েছিল। জাপানে কিছু সময় কাটানোর পর তিনি সান ফ্রান্সিসকোর দিকে রওনা দেন।
তিনি কৈশোরেই বিপ্লবী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন এবং তাঁর দাদার দেখানো পথে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। ধন গোপাল স্বেচ্ছায় ভারত ত্যাগ করেননি। তাঁর আদর্শকে সঙ্গে নিয়েই আমেরিকা চলে যান এবং তাঁর মতো মতাদর্শের কিছু মানুষের সংস্পর্শে আসেন। সান ফ্রান্সিসকোতে গিয়ে তিনি সাবলম্বী হতে চেয়েছিলেন। সেইমত কলেজে পড়ার টাকা জোগাড়ের জন্য লেখালেখি শুরু করেন। ১৯১৬ সালের দিকে তিনি ‘সন্ধ্যা’, ‘গোধূলির গান’ এবং ‘রজনী’ বা রাতের গান নামে কবিতার বই এবং ‘লায়লা মজনু’ নামে একটি গীতিনাট্য রচনা করেছিলেন, যেগুলি প্রকাশিত হয় সান ফ্রান্সিসকোর ‘পল এল্ডার এবং কোং’ নামে প্রকাশনী থেকে।
বার্কলেতে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি, কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ তাঁকে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত করে। সেখান থেকে তিনি ১৯১৪ সালে মেটাফিজিক্স-এ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বামপন্থী, অ্যানারকিস্ট ও মুক্তচিন্তাকদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন এবং অচিরেই সচেতন হয়ে উঠেছিলেন নিম্নবিত্ত শ্রেণি, শ্বেতাঙ্গ মধ্যবিত্ত শ্রেণি, কৃষ্ণাঙ্গ এবং অন্যান্য পূর্ব এশীয় অভিবাসী গোষ্ঠীর দুর্দশা নিয়ে। ১৯১৮ সালে আমেরিকান চিত্রশিল্পী এথেল রে ডুগানকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের একটি পুত্র সন্তানও হয়। নিজের নামেই সন্তানের নাম রাখেন- ধন গোপাল। পরবর্তীকালে সেই ছেলেই ‘ড্যান’ মুখার্জি নামে পরিচিতি পান এবং প্যান আমেরিকান এয়ারলাইন্সের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একজন হয়ে ওঠেন।
১৯২০-তে ধন গোপাল নিউইয়র্ক শহরে চলে আসেন এবং তাঁর লেখার সবচেয়ে সুদীর্ঘ সময় সেখানেই কাটান। তাঁর লেখা ছোটদের বইয়ের মধ্যে রয়েছে ১৯২২ সালে ‘করি দ্য এলিফ্যান্ট’, তারপর ‘হরি’, দু’বছর পর ‘জঙ্গল ল্যাড’ এবং ১৯২৭ সালে ‘গে নেক’, একটি পায়রার কাহিনি। ‘গে নেক’ আমেরিকা থেকে ১৯২৮ সালে নিউবেরি পদক জিতে নেয় বছরের ‘বেস্ট আমেরিকান চিলড্রেনস বুক’ হিসাবে। গল্পটিতে একটি পায়রার বর্ণনা দিয়েছিলেন তিনি, যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় চিঠি দেওয়া-নেওয়া করত। ধন গোপালের অন্যান্য ছোটদের বইয়ের মধ্যে রয়েছে- ঘন্ড, দ্য হান্টার (১৯২৮), দ্য চিফ অফ দ্য হার্ড (১৯২৯), হিন্দু ফ্যাবলস ফর লিটল চিলড্রেন (১৯২৯), রাম, দ্য হিরো অফ ইন্ডিয়া (১৯৩০-এ ডালটন স্কুলের শিশুদের জন্য লিখেছিলেন, যেখানে তাঁর স্ত্রী শিক্ষকতা করতেন), মাস্টার মাংকি (১৯৩২), এবং ফিয়ার্স-ফেস, স্টোরি অফ আ টাইগার (১৯৩৬)।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তাঁর লেখাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য- অ্যা সন অফ মাদার ইন্ডিয়া অ্যান্সার (১৯২৮) (আংশিকভাবে ক্যাথরিন মেয়োর ‘মাদার ইন্ডিয়া’র প্রতিক্রিয়া হিসাবে), ডিভোশনাল প্যাসেজেস ফ্রম থে হিন্দু বাইবেল এবং ভিজিট ইন্ডিয়া উইথ মি (১৯২৯), ডিসিলিউশনড ইন্ডিয়া (১৯৩০) এবং মাই ব্রাদার্স ফেস (১৯৩২)। ফেস অফ সাইলেন্স (১৯২৬) লেখেন উনিশ শতকের সাধক রামকৃষ্ণ পরমহংস সম্পর্কে। বইটি রোমা রোল্যাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল বলেও জানা যায়।
শেষদিকে তাঁর জীবন ছিল দুঃখজনক। বেশ কিছু প্রমাণ থেকে বোঝা যায় শেষজীবনে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কঠিন পর্যায়ে পৌঁছেছিল। অনেক বন্ধু থাকা সত্ত্বেও আমেরিকাতে তিনি বিচ্ছিন্ন ও একা হয়ে পড়েছিলেন, জীবনে পছন্দমতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তিনি ভারতে ফিরে আসতে পারেন না এবং এই না পারার জন্যই তাঁর জন্মভূমির জঙ্গল এবং পশুপাখির কথা তাঁর লেখায় বেশি করে উঠে এসেছিল। ১৯৩৬ সালের ১৪ জুলাই তাঁর স্ত্রী নিউ মিলফোর্ডের পৈত্রিক বাড়ি থেকে ফিরে এসে ধন গোপালকে তাঁর নিউইয়র্ক শহরের অ্যাপার্টমেন্টের বাথরুমে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় আবিষ্কার করেন।