সুস্থ মনোরোগীদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে নির্মিত আবাস প্রত্যয়-এর বর্ষপূর্তি
প্রত্যয়ের আবাসিকদের স্থাপনা শিল্প
“অচিন মনের ভাষা শোনাবে অপূর্ব কোন আশা,
বোনাবে রঙিন সুতোয় দুঃখ-সুখের জাল,
প্রাণে নতুন গানের তাল—
নতুন বেদনায় ফিরব কেঁদে হেসে
এলেম নতুন দেশে…”
এ দেশ আমাদের। যেখানে সমস্ত সুখ-দুঃখ আশা-আকাঙ্ক্ষা চেতনা-বোধ সব এক হয়ে যায়। এ দেশের কথাই আসলে রচিত হবার কথা ছিল। অথচ এ মহাবিশ্বে আমরা ‘তাদের’ করে রাখলাম, বলতে পারলাম না ‘আমাদের’। আমরা-ওরা নয়, বরং সকলেই এক ও অভিন্ন। এ মস্ত বড়ো দুনিয়ায় এই-ই মজা। মানসিক অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠা মানুষদের ঘর প্রত্যয়। সে ঘরের বাসিন্দারা নিজেরা মিলে হইহই করে কয়েকদিন উদযাপন করলেন শিল্পচর্চার মধ্যে দিয়ে। এ উদযাপন আসলে নিজেদের ফিরে পাওয়ার। প্রত্যয়ের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে স্বমেজাজে সেখানকার আবাসিকরা। কেউ নিজেদের তৈরি করা স্থাপনা শিল্প চমৎকার ভাবে বোঝাচ্ছেন দর্শককে, কেউ অতিথিদের চা-জল আপ্যায়নে ব্যস্ত, কেউ আগত অতিথিদের দিয়ে সই করিয়ে নিচ্ছেন। সকলেই সকলের বন্ধু।

প্রত্যয়ের আবাসিকদের স্থাপনা শিল্প
ছক ভাঙার এ কাজটি করেছেন প্রত্যয়ের কর্ণধার ও একাধারে সমাজকর্মী রত্নাবলী রায়। এই গোটা প্রদর্শনীটি নিবেদন করেছে অঞ্জলি – মেন্টাল হেলথ রাইটস অর্গানাইজেশন। প্রত্যয়ের দরজা দিয়ে ঢুকতেই নজরে আসবে একটি বায়স্কোপ। সেখানে আস্ত একটা ছোটোবেলার দুনিয়া। চোখ দিয়ে উঁকি মারলে দেখা যায় আবাসিকদের নানান কর্মকাণ্ড চমৎকার ভাবে ধরা হয়েছে বায়স্কোপের মধ্যে। চারপাশে সুতো দিয়ে খণ্ড করে রাখা একফালি আয়না; যেন টুকরো জীবন। আসলে টুকরো তো নয়, এ যেন বিচ্ছিন্নতার মধ্যে একজোট আর অনেকগুলো ‘আমি’-র প্রতিফলন। হাঁটাপথ ধরে এগোতে থাকলে ক্রমশ চোখের নাগালে আসে বিস্ময়। ‘এলেম নতুন দেশে’। এ দেশে আছে জুড়ে জুড়ে থাকার আর্তি। দৃশ্য, শ্রুতি ও তার প্রতিফলনের মধ্যে ধারণ করে রাখা প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা এবং জীবন সম্পর্কে বোধ। প্রত্যয়ের আবাসিক সিদ্ধান্ত গোস্বামী বলছিলেন, “প্রতিদিন আমরা একটা নতুন জীবনের জন্য তৈরি হচ্ছি।”

প্রত্যয়ের আবাসিকদের স্থাপনা শিল্প

বায়স্কোপ থেকে দেখা অন্য এক ভুবন
আবাসিকদের মেধা ও মননে নির্মিত হয়েছে অপূর্ব দৃশ্য-শ্রাব্য সমন্বয়। সমস্ত ‘আমি’ মিলে তৈরি হয়েছে একটি সমান্তরাল বিশ্ব। প্রত্যয় পরিচালনার ভারপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার রত্নাবলী রায় বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “সক্ষম সমাজ যদি এগিয়ে এসে প্রশ্ন করার গুরুত্বটুকুও দেয়, বেশিরভাগ সময়েই উত্তর থাকে না, কারণ প্রশ্নকর্তাকে এটা বোঝানো মুশকিল হয়, যে স্বাভাবিকতার বোধ থেকে প্রশ্নগুলো তিনি করছেন, আর এই মানুষগুলোর দৈনন্দিনতা দুটো অনেকটাই আলাদা। প্রশ্নগুলোর মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন দাবি থাকে, অনেক সময়ই সেটা যথেষ্ট প্রকটও বটে – আগে স্বাভাবিকতার তূল্যমূল্যতায় এসো, তারপরে কথা হবে।”

ভাস্কর মিত্র
ছক ভাঙার এ কাজটি করেছেন প্রত্যয়ের কর্ণধার ও একাধারে সমাজকর্মী রত্নাবলী রায়। এই গোটা প্রদর্শনীটি নিবেদন করেছে অঞ্জলি – মেন্টাল হেলথ রাইটস অর্গানাইজেশন। প্রত্যয়ের দরজা দিয়ে ঢুকতেই নজরে আসবে একটি বায়স্কোপ। সেখানে আস্ত একটা ছোটোবেলার দুনিয়া।
প্রত্যয়ের আবাসিকরা তাঁদের এই প্রদর্শনীতে সেই সমস্ত অভিজ্ঞতাগুলিকেই সংহত করে কিছু জবাব দিয়েছেন তাঁদের মতো করে। প্রত্যয়ের আবাসিকদের এই কাজে সাহায্য করেছেন শিল্পী শ্রীকান্ত পাল। তাঁকে সঙ্গত করেছেন অনিতেশ চক্রবর্তী এবং অলোক হালদার। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, প্রত্যয় এক বছর পূর্ণ করল। এই পরিক্রমাকেই প্রদর্শনীর মধ্যে ধরতে চেয়েছেন আবাসিকরা। রত্নাবলী রায় বলেন, “ক্রমাগত অপরায়ন থেকে একটা প্রান্তিক পরিচিতির মানুষ কীভাবে মূলধারার সমাজের মুখোমুখি হন, সেটাই মূল বিষয়। কেউ প্রামাণ্যতার দায় চাপিয়েছেন, সক্ষম সমাজে অন্তর্ভুক্তির শর্ত চাপিয়েছেন। এই মানুষগুলো কী চান, তাঁদের মতামতের তোয়াক্কা করতে চাননি। সেটাই অবশ্য সব নয়, কেউ কেউ সহৃদয়ভাবে কাঁধে হাত রেখেছেন, সাহস যুগিয়েছেন। কিন্তু এখনও অবধি সেগুলো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি অভিজ্ঞতা বলাটাই ঠিক হবে।”

সিদ্ধান্ত এবং অনির্বাণ
গত ৮-১৪ জুলাই প্রত্যয়ের মনের মতো ঘরে হয়ে গেল ‘এলেম নতুন দেশে’ শীর্ষক এই প্রদর্শনী। আবাসিকদের মধ্যে অন্যতম একজন ভাস্কর মিত্র। সুগায়ক। কলকাতার বাসিন্দা। প্রত্যয়ের পুরোনো আবাসিক। গত ১২ জুলাই ঘরের এক মঞ্চে হারমোনিয়াম সহযোগে তিনি গান ধরলেন, “শ্রাবণ ঘনায় দু-নয়নে/ আকাশেরও মতো আঁখি,/ মগন বরিষনে…”। গানের পর বঙ্গদর্শন.কম-এর মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, “আমার বাবা-মা গত হয়েছেন। বাগবাজারে কাকারা আছেন। ওখানে খুব তাড়াতাড়ি ফিরে যাব।” সদা হাস্যময় ভাস্করের মতোই পরিচয় হয় প্রত্যয়ের অন্যান্য আবাসিক সিদ্ধান্ত, অনির্বাণের সঙ্গেও। সকলেই দর্শকদের সঙ্গে কথা বলছেন, বুঝিয়ে দিচ্ছেন, কারোর কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা খতিয়ে দেখছেন। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যসচিব মলয় দে উদ্বোধনী সন্ধ্যায় বলেন, “সক্ষম সমাজ যে শুধু শেখানোর দায়িত্ব নিয়ে বসে নেই, তাকেও প্রতিনিয়ত শিখতে হয়। শিখতে হয় এই আবাসিকদের কাছ থেকেই, তাঁদের সঙ্গে চলার অভিজ্ঞতা থেকে। সেই শেখায় ভুল হলে শুধরে নিতে হয়।”

প্রত্যয়ের আবাসিক, শিল্পী ও দর্শকদের সঙ্গে রত্নাবলী রায় ও অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রবেশ পথ
লুম্বিনী পার্ক মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র-র ঠিক বিপরীতে রয়েছে রাজ্য সরকারের নারী ও শিশু বিকাশ এবং সমাজ কল্যাণ দপ্তর এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের অধীনে সুস্থ মনোরোগীদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে নির্মিত আবাস প্রত্যয়। এহেন উদ্যোগ রাজ্যে এই প্রথম। প্রত্যয়ের প্রকল্প ব্যবস্থাপক অভিজিৎ রায় বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “মানসিক হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে কয়েকজন নির্বাচিত মানুষ প্রত্যয়ে আসেন। আসাটাই শেষ কথা নয়। তাঁদের ভবিষ্যৎ কী, কী কাজ করবেন – এটাই তখন মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। সেইসঙ্গে প্রতি মুহূর্তে নিজেকে প্রমাণ করার একটা দায় থেকে যায়। কারণ বাইরের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রের অনেক মানুষই তাঁদের বিশ্বাস করতে চান না। সেখান থেকেই ‘এলেম নতুন দেশে’-র ভাবনা।” যদিও আর পাঁচজন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে প্রত্যয়ের আবাসিকদের দৈনন্দিনতার পার্থক্য কিছু নেই। এখানে প্রত্যেকটি স্থাপনা শিল্পের মধ্যেই একধরনের দৈনন্দিনতার ছাপ স্পষ্ট। মানসিকভাবে অসুস্থ থাকা মানুষরা এক জায়গা বা অবস্থান থেকে এলেও তাঁদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা আলাদা। তাঁরা যখন একটা জায়গায় আসছেন, তখন তাঁদের মধ্যে একটা আদানপ্রদান তৈরি হচ্ছে। একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি হচ্ছে। কে আবাসিক আর কেই বা তাঁদের সহায়তা করছেন, এই গোটা প্রক্রিয়াটা আসলে অনেকের কাছে গুলিয়ে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে সমাজের চোখে তথাকথিত স্বাভাবিক আর অস্বাভাবিকের একটা বোঝাপড়া। স্বাভাবিক/অস্বাভাবিকের চিরাচরিত এই দ্বন্দ্বটিকেই কাজে লাগাতে চেয়েছেন প্রত্যয়ের আবাসিকরা। এখানে যেভাবে আবাসিকরা নিজেদের কাজগুলিকে বর্ণনা করছেন, তাঁদের সঙ্গে আর পাঁচজন পেশাদার শিল্পীর কোনো পার্থক্য নেই। এটাই ছিল এই প্রদর্শনীর মূল লক্ষ্য। ‘অপর’ করে রাখা নয়, বরং এক হয়ে একসঙ্গে সবটা দেখব, ভাবব, বুঝব। সমগ্র কর্মকাণ্ডটির প্রস্তুতি চলেছে মোটামুটি একমাস ধরে।

“শ্রাবণ ঘনায় দু-নয়নে” গাইছেন ভাস্কর মিত্র
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন সংগীতশিল্পী স্যমন্তক সিনহা। বঙ্গদর্শন.কম-কে তিনি বলেন, “ভাস্কর মিত্র আমার সঙ্গে গান গাইলেন ‘এলেম নতুন দেশে’। চমৎকার অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর সঙ্গে গান গেয়ে। যাঁদের বাড়ি ফেরা হয়নি কিংবা কেউ কেউ ভবিষ্যতে বাড়ি ফিরবেন – সকলের জন্যই প্রত্যয় যেন একটা পরিবার। মূলধারার মানুষরাও তো এমন বেঁধে বেঁধে থাকতে পারেন না, সঙ্ঘবদ্ধ হতে পারেন না। প্রত্যয়ের আবাসিকদের থেকে অনেককিছু শেখার আছে আমাদের।”

প্রত্যয়ের আবাসিকদের স্থাপনা শিল্প
মনের মতো ঘর পায় কজন! আর প্রান্তিক মানুষদের লড়াইয়ে তো অনেককিছুই প্রমাণ করার একটা দায় থাকে। বারবার প্রমাণ দিতে হয় যে তাঁরাও একটা ঘর বা আশ্রয়ের লড়াইয়ে সামিল হতে পারেন। প্রদর্শনী কক্ষের মাঝখানের সিলিংয়ে যে ভাসমান ঘড়ির প্রত্যেকটি সময়কে খণ্ড খণ্ড করে দেওয়া হয়েছে, ওই খণ্ড সময় আসলে অনেকগুলো ‘আমি’। সেই ‘আমি’ ডানা মেলে বাইরে বেরোতে চাইছে। প্রত্যেকদিন একটা নতুন জীবনের জন্য প্রস্তুতি চলছে। এই সমস্ত টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতাগুলোকে জুড়ে প্রত্যয়ের একবছরের উদযাপন যেন নিজেদের না বলতে পারা গল্পগুলোকে ফ্রেমবদ্ধ করা। সেখানে রয়েছে বন্ধুত্বের কান ফিসফিস আর আনন্দে জড়িয়ে ধরার কিছু সহজ ছবি। এ জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের অথবা মাথার ভিতরে স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে।
______
ছবি: প্রতিবেদক