প্রতি শনিবার সংসদ বসে জলপাইগুড়ির এই স্কুলে

নরেন্দ্র মোদী নন, প্রধানমন্ত্রী যখন মেহেন্দু তামাং…

সে-স্কুলের প্রধানমন্ত্রী বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায়। আর গরিব মানুষের সেবা করতে চায়। খাদ্যমন্ত্রী চায় দেশের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশের সেবা করতে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ইচ্ছে শিক্ষক হওয়ার। ক্রীড়ামন্ত্রীর ইচ্ছে পুলিশে নাম লেখানোর, পুলিশে যোগ দিয়ে সব চোর ধরার স্বপ্ন দেখছে সে। শিক্ষা ও পরিবেশ মন্ত্রীর ইচ্ছে বিজ্ঞানী হওয়ার। তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী বড় হয়ে সকলকে নৃত্য শেখাতে চাইছে।

শিলিগুড়ি শহর লাগোয়া জলপাইগুড়ি জেলার বৈকুন্ঠপুর ফরেস্ট এলাকায় চলছে খোলাচাদফাপরি নেপালি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সরকারি এই প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয় ১৯৭০ সালে। প্রথম শ্রেণী থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত এই স্কুলে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা এখন ৬৪ জন। শিক্ষক শিক্ষিকা সংখ্যা ছয়জন। ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্ব দেখানোয় এই স্কুল পরপর নির্মল বিদ্যালয়, শিশু মিত্র বিদ্যালয়, সেরা বিদ্যালয় এবং যামিনী রায় পুরস্কার নিয়ে আসে রাজ্যের স্কুল শিক্ষা দফতর থেকে।

স্কুলের নিয়মশৃঙ্খলাই আলাদা। স্বাস্থ্য ভালো রাখতে খাবার আগে হাত ধোয়ার নিয়ম আছে। স্কুলে সেই হাত ধোয়ার নিয়ম পালন করা হয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের নির্দেশ তো আছেই, পাশাপাশি স্কুলের ছাত্রী-প্রধান মন্ত্রীর নির্দেশে স্কুলের ছাত্রী-স্বাস্থ্য মন্ত্রী নিয়মিত তদরকি করে হাত ধোয়ার পালা। স্কুলে নির্মল বাংলার শৌচালয় ব্যবস্থা আছে। ছাত্রছাত্রীদের নিয়মিত স্কুলেই নয়, বাড়িতেও শৌচালয় ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছে ছাত্রী-স্বাস্থ্য মন্ত্রী। মাঠেঘাটে মলমূত্র ত্যাগ না করার কথা সব ছাত্রছাত্রীকে বলছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কেউ কথা না শুনলে তার নামে রিপোর্ট করা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রী তখন স্কুলের পরিচালন কমিটির কাছে রিপোর্ট করছে।

স্কুলে প্রতি শনিবার করে বসে নকল সংসদ। সেই সংসদে সারা সপ্তাহের রিপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর কাছে করে অন্য মন্ত্রীরা। সেই অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী রিপোর্ট কার্ড তৈরি করে তা প্রধান শিক্ষকের কাছে জমা দেয়। তার ভিত্তিতে স্কুল পরিচালনার অনেক সিদ্ধান্ত হয়।

প্রতি বছর স্কুলের সব ছাত্রছাত্রী মিলে চতুর্থ শ্রেণীর ছয় জন ছাত্রছাত্রীকে মন্ত্রী হিসাবে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে। তারপর স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা মিলে ওই ছয় মন্ত্রীর মধ্যে থেকে যোগ্যতা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী, ক্রীড়ামন্ত্রী, তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী ঠিক করে দেন। শনিবার দুপুর দুটোর পর বসে নকল সংসদের মন্ত্রিসভার বৈঠক। এক ঘণ্টা ধরে তা চলে। বনের ধারে নিঃশব্দে রাজ্যের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এভাবেই রীতিমতো নজির তৈরি করছে।

স্কুলের এই শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই তাদের মধ্যে ছোটো থেকেই দেশের প্রতি ভালোবাসা জাগাতেই এই নকল সংসদের প্রয়াস বলে প্রধান শিক্ষক কৈলাস সুব্বা জানালেন।  এই নকল সংসদকে তাঁরা বলছেন চাইল্ড ক্যাবিনেট। এখন সেখানে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে থেকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে কাজ করছে মেহেন্দু তামাং। খাদ্যমন্ত্রী অঙ্কিতা কুমারি মাহাতো, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিশাখা ছেত্রী, বিনীত মিরধা শিক্ষামন্ত্রী। একইভাবে ক্রীড়ামন্ত্রী অমিত কুমার মাহাতো, সুশেন রাই তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী। এরা সকলেই মূলত পিছিয়ে পড়া এলাকা থেকেই এসেছে। বেসরকারি স্কুলের রমরমার মধ্যেও সরকারি স্কুল চলতে পারে দারুণ ভাবে, দরকার সদিচ্ছা।

চার দিকে যখন শিশু বা নাবালিকাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, সেখানে এই স্কুলে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নকল সংসদে বিস্ময়কর আলোচনা চলছে। তা হল, আমরা এই স্কুলে ছেলেমেয়েরা সকলে ভাইবোন। বোন-ছাত্রীদের পাশে সবসময় থাকবে ছাত্র-ভাইয়েরা। ভাইয়েরা কখনও বোনেদের ওপর নির্যাতন করবে না, কাউকে করতেও দেবে না। সব ক্ষুদে নকল মন্ত্রীরা তাদের জীবনের স্বপ্নের কথা জানানোর পাশাপাশি জানায়, তারা সকলে মিলে স্কুলে জমে থাকা আবর্জনা পরিষ্কার করে। স্কুলে তারা প্লাস্টিক পড়ে থাকতে দেয় না। পালা করে জৈব কৃষির কাজও করে। প্রধান শিক্ষক জানালেন, স্কুলে ছাত্রছাত্রীরা ছোট থেকেই নৈতিকতা ও দেশ প্রেমের আলোচনা করে। প্রায় দিনই স্কুলে কোনো না কোনো মনীষীর জীবনী নিয়ে আলোচনা হয়। কোনো ছাত্র বা ছাত্রী শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অন্য মন্ত্রীরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। ব্যবস্থা বলতে বেত্রাঘাত করা নয়। তাকে বোঝানো, অমনটা করতে নেই। তাতেও কাজ না হলে প্রধানমন্ত্রীর রিপোর্ট পেয়ে প্রধান শিক্ষক সেই ছাত্র বা ছাত্রীর অভিভাবককে ডেকে পাঠান। এই সব মিলিয়ে এক আদর্শ স্কুল হয়ে উঠেছে এটি। ইউনিসেফের এক প্রতিনিধি স্কুলে এসে তাঁদের দেশ লউসে ঠিক এই রকম একটি স্কুল গড়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে যান। প্রধান শিক্ষক বলেন, প্রাথমিক স্কুল যদি ছাত্র বা ছাত্রীদের শৈশব থেকে সুস্থ দেশ গড়ার শিক্ষা দেয় তবে দেশে এতো দুর্নীতি, নারী নির্যাতন থাকবে না।

Developed by DXDasia