সেই সময় বিশ্বভারতীর উপাচার্য ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু
শান্তিনিকেতনে সেবার যা হয়েছিল, তা সত্যিই অবাঞ্ছিত একটি ঘটনা। এই ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক এবং রামকিঙ্কর বেইজের ঘনিষ্ঠ বিশ্বজিৎ রায়ের একটি প্রবন্ধে। ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘বিশ্বভারতীর শিক্ষকদের মধ্যে একমাত্র আমিই ওই শোচনীয় ঘটনার দর্শক ছিলাম।’ ঠিক কী ঘটেছিল ১৯৫৭ সালের ২৬ অক্টোবর?
রামকিঙ্কর বেইজ ছিলেন শিল্পীর শিল্পী। মূর্তি গড়া, আঁকাআঁকির পাশাপাশি শিল্পের অন্যান্য পথেও অবাধ যাতায়াত করেছেন। একাধিক নাটক পরিচালনা করেছিলেন রামকিঙ্কর। আর নাটকের সঙ্গেই জুড়ে রয়েছে সেই ‘বিচ্ছিরি’ দিনটি।
নভেম্বর মাসে যুব উৎসবে নাটক পরিবেশনের জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছিল বিশ্বভারতী। উপাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নিযুক্ত করা ইংরেজির অধ্যাপক সুধীন ঘোষের তত্ত্বাবধানে শুরু হয়েছিল ‘আন্তিগোনে’ নাটকের মহড়া। রিহার্সালের জায়গা ছিল সঙ্গীত ভবন। সুধীন ঘোষ হয় নিজের আগ্রহে বা অন্য কারো পরামর্শে রামকিঙ্করকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানান ‘আন্তিগোনে’ প্রযোজনায় সাহায্য করতে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সুধীন ও রামকিঙ্করের বাদানুবাদ শুরু হয় স্ক্রিপ্টের খুঁটিনাটি নিয়ে। ব্যস! ছুঁড়ে ফেলার ভঙ্গিতে স্ত্রিপ্ট রেখে মঞ্চ থেকে নেমে আসেন রামকিঙ্কর। সুধীন ঘোষও একটা লাঠি হাতে তেড়ে আসেন রামকিঙ্করের দিকে এবং সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ নেমে এসে বেশ কয়েকবার আঘাত করেন শিল্পীকে।
বিশ্বজিৎ রায় তাঁর প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘আমি পরিচালকটির হাত থেকে কিঙ্করদাকে উদ্ধার করি। তার পরের ঘটনা আরও লজ্জাকর। শান্তিনিকেতনের অনুপযুক্ত কয়েকটি ছাত্র তার শোধ তুলল অত্যন্ত গর্হিতভাবে ওই পরিচালকের গায়ে হাত তোলে। সম্পূর্ণ সত্য এবং শান্তিনিকেতন আশ্রমের আদর্শের কথা বিস্মৃত হয়ে এক বাংলা কাগজ ছাপাল কেবল কিঙ্করদার ওপর আক্রমণের বিবরণ।’
প্রাক্তন উপাচার্য ইন্দিরাদেবী চৌধুরানিও এ সম্পর্কে বিবৃতি দিয়েছিলেন। তাতে ছিল, ‘আমাকে জানানো হয় যে, হট্টগোল শুনিয়া শ্রীশান্তিদেব ঘোষ বাহির হইয়া আসেন এবং সমবেত জনতাকে চলিয়া যাইতে বলেন। তিনি ড. ঘোষকে রিক্সা করিয়া তাঁহার গৃহে পাঠাইয়া দেন।’
আরও পড়ুন: অরণ্যের দিনরাত্রে ‘দুটো বন্ধু’

এ নিয়ে প্রচুর টানাপড়েন চলে শান্তিনিকেতনে। ছাত্রদের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় উপাচার্যকে। কলকাতার বাংলা ও ইংরেজি খবরের কাগজে এবং সাময়িকপত্রে প্রচুর প্রতিবেদন বেরোয়। এমনকি এই ঘটনায় বিরক্ত হয়েছিলেন জহরলাল নেহেরুও। নেহেরুর অনুরোধে এল্মহার্স্ট তদন্ত করে যে রিপোর্ট এসেছিল তাতে উপাচার্য সত্যেন্দ্রনাথকে অভিযুক্ত করে বলা হয় যে ভালো বিজ্ঞানী হলেও দক্ষ প্রশাসক নন তিনি। হ্যাঁ, ঘটনার জল এতদূর অবধি গড়িয়েছিল।
তথ্যঃ-
প্রকাশ দাস সম্পাদিত রামকিঙ্কর : অন্তরে বাহিরে
মানস প্রতিম দাস: অন্য সত্যেন্দ্রনাথ, মনোরমা ইয়ারবুক ২০১৯