শতবর্ষে রমাপদ চৌধুরী : ‘বনপলাশির পদাবলী’, ‘বাড়ি বদলে যায়’, ‘খারিজ’-এর লেখক

‘না লিখে লেখক’, বাংলা সাহিত্য-সমাজে এই ছিল তাঁর পরিচিতি

সাহিত্য অকাদেমী (Sahitya Akademi) পরিবেশিত, রাজা মিত্র পরিচালিত একটি তথ্যচিত্রের শুরুতেই যাঁকে দেখা যায়, বাংলার অতি সাধারণ কোনও নাগরিক বলেই মনে হবে তাঁকে।  সাধারন ধুতি-পাঞ্জাবি, হাই পাওয়ারের চশমা আর হাতে বাজারের থলে নিয়ে, উদাসীন বার্ধক্যে সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসছেন। ‘না লিখে লেখক’ – একসময় বাংলা সাহিত্য-সমাজে এই ছিল তাঁর পরিচিতি । রমাপদ চৌধুরী (Ramapada Chowdhury)। শোনা যায়, তিনিই সম্ভবত বাংলা ভাষার একমাত্র লেখক, যিনি ‘ঘোষণা’ করে লেখা থেকে অবসর নিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্যসৃষ্টিতে ‘পরিমাণ’-এর থেকে ‘মান’ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কতটা লিখলাম তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ— কী লিখলাম।  

১৯২২-এ খড়গপুরে জন্ম, সেখানেই স্কুল, ১৯৩৯-এ মেট্রিকুলেশন। তারপর কলকাতা, প্রেসিডেন্সি কলেজ, হিন্দু হস্টেল, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। তখনও তিনি লেখক অওয়ার কথা ভাবেননি। তথ্যচিত্রে দেখা যায়, সঙ্কোচের সঙ্গে হালকা হাসি মিশিয়ে মৃদু স্বরে তিনি বলছেন, “আমি নিজে কোনও দিন লেখক হওয়ার কথা ভাবিনি। কীভাবে যেন হয়ে গেলাম।” প্রেসিডেন্সিতে পড়ার সময় অনেকেই তাঁর বন্ধু হয়ে ওঠে, যাঁদের সঙ্গে নিয়মিত সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতেন। বন্ধুদের মধ্যে দু’জনের সঙ্গে একটু বেশিই ভাব ছিল। একজন প্রাণতোশ ঘটক এবং অন্যজন স্বরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়। কলেজের ক্যান্টিনে ঢোকার সাহস পেতেন না তাঁরা। কারণ সেখানে যাঁদের আড্ডা ছিল, একজনের নাম সত্যজিৎ রায়; আর একজন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়।

আনন্দবাজারে যখন রবিবাসয়ীয় ও পুজো সংখ্যা সম্পাদনার দায়িত্বে তিনি, তখন ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। সাগরময়বাবু তাঁকে প্রায়শই অনুরোধ করতেন, “একটা গল্প লিখুন না।”

বেশিরভাগ সময়ই তাঁরা গিয়ে বসতেন হ্যারিসন রোডের YMCA বিল্ডিং-এর ‘পাবলিক রেস্টুরেন্ট’-এ। সেখানে দুপুরের দিকে তাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতেন। বন্ধুদের মধ্যে কেউ গল্প লিখেছে, তাঁকে পড়ে শোনাতো। তিনিও নির্মম ভাবে সমালোচনা করতেন। সেইসব মর্মাহত বন্ধুরা নাকি তাঁকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে চেয়ে তাঁকে বলেছিল, “তুই লেখ না একটা গল্প”।  পরপর বেশ কয়েকদিন এই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে অবশেষে মুখ ফস্কে বলে দেন, “ঠিকাছে লিখব”। চ্যালেঞ্জ স্বীকার করার শর্তও রেখেছিলেন বন্ধুদের কাছে। বলেছিলেন তাঁকে যেন সিগারেট আর চায়ের পর্যাপ্ত জোগান দিয়ে যাওয়া হয়। লেখালিখি এমন কিছু কঠিন কাজ নয়, একথা বিশ্বাস করে একটা সিগারেট ধরিয়ে বসে পড়েন লিখতে। কী লিখবেন সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে লিখে ফেলেন খড়্গপুরকে কেন্দ্র করে একটা গল্প। দু’লাইন লেখার পর কলম আর থামাতে পারেননি। সেই লেখা দু’সপ্তাহ পর একটি পত্রিকায় ছাপা হয়, নাম- ‘ট্র্যাজেডি’। কিন্তু লেখায় প্রথম আত্মপ্রকাশ তাঁকে নেশা ধরাতে পারেনি, তারপর প্রায় দু’বছর কোনও লেখালিখি করেননি। 

তবু কিছু একটা বিস্ময়কর ঘটে গিয়েছিল। ঘটেছিল বলেই না তাঁর ভিন্ন ধারার লেখনী থেকে পাঠক পেয়েছে ‘প্রথম প্রহর’ (তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস), ‘বনপলাশীর পদাবলী’, ‘বাড়ি বদলে যায়’, ‘দ্বীপের নাম টিয়ারং’, ‘লালবাঈ’-এর মতো উপন্যাস। ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর আত্মকথামূলক রচনা ‘হারানো খাতা’। উপন্যাসের পাশাপাশিই লিখেছেন অবিস্মরণীয় সব ছোট গল্প। ‘রেবেকা সোরেনের কবর’ গল্পে আদিবাসী কন্যা রূপমতীর রেবেকা সোরেন হয়ে যাওয়া, ‘উদয়াস্ত’ গল্পের প্রবীণ স্টেশনমাস্টার বিষ্ণুরাম, ‘দরবারী’ গল্পের জোনাথন ম্যাক্লাস্কি,  ‘তিতির কান্নার মাঠ’ গল্পের অরুণিমা সান্যাল, ‘তালাক’ গল্পের চাঁদবানু এবং ‘কাসেম বা ভারতবর্ষ’ গল্পের মাহাতো বুড়ো আমাদের সাহিত্যে অনন্তকাল বেঁচে থাকবে। কোনও বিশ্বাসহীনতা, কোনও শূন্যবাদ তাঁর কথাসাহিত্যে নেই। কিন্তু নিষ্প্রশ্ন বিশ্বাসেও তিনি আক্রান্ত হননি কোনও দিন। বার বার মধ্যবিত্ত জীবনের কিছু মূল্যবোধকে প্রশ্ন করেছেন তিনি। আর সে কারণেই হয়তো ১৯৭০-এর দশকে নতুন রাজনৈতিক দর্শনের মুখোমুখি বাঙালি সমাজজীবন নিয়ে তৈরি হওয়া মৃণাল সেন-এর ‘খারিজ’ কিংবা ‘একদিন অচানক’-এর আখ্যানকার হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর লেখা ‘অভিমন্যু’ নিয়ে তপন সিংহ তৈরি করেন স্মরণীয় ছবি ‘এক ডক্টর কি মওত’। ৪০-এর দশকে নিজের নামে প্রকাশ করেন অভিনব আঙ্গিকের ছোট কাগজ ‘রমাপদ চৌধুরীর পত্রিকা’। ইংরেজি ও হিন্দিতে অনূদিত হয়েছে তাঁর বহু রচনা। সাড়ে ছয় দশকের লেখকজীবন। পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। স্বীকৃতি এসেছে নিজের নিয়মেই। ১৯৬৩ সালে আনন্দ পুরস্কার, ১৯৭১-এ রবীন্দ্র পুরস্কার, অকাদেমি পুরস্কার ১৯৮৯-এ, ওই একই বছরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘জগত্তারিণী পদক’ অর্পণ করে, ১৯৯৯ সালে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় দেয় সাম্মানিক ডি লিট।

আনন্দবাজারে যখন রবিবাসয়ীয় ও পুজো সংখ্যা সম্পাদনার দায়িত্বে তিনি, তখন ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। সাগরময়বাবু তাঁকে প্রায়শই অনুরোধ করতেন, “একটা গল্প লিখুন না।” কিন্তু কখনও উপন্যাস লিখতে অনুরোধ করেননি, তা নিয়ে রমাপদবাবুরও আপেক্ষ ছিল না। ১৯৬০ সাল। একদিন সাগরময়বাবু রমাপদবাবুকে একটা ধারাবাহিক লেখার নিদান দেন, যেটা নাকি কমপক্ষে একবছর টানতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নাম ঠিক করে ফেলতে বললেন। ঘন ঘন তাগাদা আসতে লাগলো। কী লিখবেন, কী নাম দেবেন ভাবতে ভাবতে পেয়ে যান ধারাবাহিকের প্লট। নামও ঠিক করে ফেলেন। “পলাশবনীর পদাবলী”। নামটা রাখার পর থেকে শুরু হল খুঁতখুঁত। কিছুতেই যুতসই হচ্ছে না। নামটার মধ্যে অনুপ্রাস-এর জোর থাকায় নামটা নিয়ে কিছুতেই মনস্থির করতে পারছিলেন না। সেই রাতেই পেয়ে গেলেন মনের মতো নামটা—“বনপলাশির পদাবলী”।

লেখা নিয়ে এতোটাই খুঁতখুঁতে ছিলেন। ব্যতিক্রমী তিনি অনেক দিক থেকেই ছিলেন। ‘ঘোষণা’ করে লেখা থেকে অবসর নিচ্ছেন যখন, তখনও তিনি সুস্থ, দেশ বা আনন্দবাজার পত্রিকা-র পুজোসংখ্যায় তাঁর উপন্যাস পড়ার জন্য তখনও পাঠক মুখিয়ে। ২০০৫-এ শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রমাপদ চৌধুরী জানালেন, অনেক গল্প-উপন্যাস লিখেছেন সারা জীবন, আর লিখবেন না। আজকের পৃথিবী তিনি জানেন না, তাই সেই পৃথিবী সম্পর্কে কিছু বলার নেই তাঁর। বেশি লিখলে, বা একটা সময়ের পর কলম তুলে না রাখলে যে স্বাভাবিক নিয়মেই লেখার মান পড়ে যেতে পারে, সে ব্যাপারে সচেতন ছিলেন তিনি— তাঁর নিজের কথায়, “থামতে জানাটাও একটা আর্ট।” গত বছর ২৮ ডিসেম্বর শতবর্ষে পদার্পণ করেছেন এই সাহিত্যিক-সম্পাদক।

তথ্যসূত্রঃ

তথ্যচিত্র, রাজা মিত্র

শুভমানস ঘোষ, পুনর্জিৎ রায়চৌধুরী, আনন্দবাজার পত্রিকা

সমকাল

Developed by DXDasia