সুজনবাবুকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন তাঁর প্রবাসী বন্ধু পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আমেরিকার বাঙালি সমাজে আমাদের পরিচিতরা অনেকেই একে একে চলে গেছেন, চলে যাচ্ছেন। সুজনদা (সুজন দাশগুপ্ত) চলে গেলেন গত সপ্তাহে।
শ্রী দাশগুপ্তর মৃত্যুর খবর পেয়ে আমি স্তম্ভিত, হতবাক। অন্তত পঁচিশ বছর ধরে এই আমেরিকায় সুজনদা, তাঁর স্ত্রী শমীতা দাশগুপ্ত, আর তাঁদের মেয়ে সায়ন্তনীকে চিনি। প্রথম তাঁদের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আমরা যখন অলব্যানি শহরে থাকি, তখন থেকেই।
তাঁরা তখনই নিউ জার্সির বাসিন্দা। ওই তথাকথিত বঙ্গ সম্মেলন নামক হট্টমেলায় উনিশশো চুরানব্বইতে আমরা একটা অন্যরকম কাজ করার চেষ্টা করেছিলাম। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের নিয়ে এসে তাদের ইমিগ্রেন্ট জীবনের অস্থিরতার কথা, সমস্যার কথা, সমাধানের রাস্তা খোঁজার আলোচনার একটা অনুষ্ঠান করেছিলাম। সায়ন্তনী ছিল সেই আলোচনার এক বক্তা। তখন বোধহয় সে হাই স্কুলে পড়ে, অথবা কলেজে সদ্য প্রবেশ করেছে। তারপর দেখলাম, সায়ন্তনী ও শমীতা দাশগুপ্ত বাংলার রূপকথার গল্প অনুবাদ করে ইংরেজিতে প্রকাশ করেছেন। খুব আনন্দ হলো, কারণ আমিও সেই পথের এক পথিক। সায়ন্তনী নিজেই লেখিকা হিসেবে নাম করেছে। আমাদের এদেশে জন্মানো ও বড়ো হওয়া ছেলেমেয়েরা বাবা-মায়ের রাস্তাতেই হাঁটে।
আমার বাবা যখন নিউ ইয়র্কে এসেছিলেন, তখন সুজনদা-শমীতাদি আমাদের বাড়িতেও ঘুরে গেছেন। আমরা রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালন করেছিলাম।
শমীতাদির সঙ্গে যোগাযোগটা বেশি হয়েছিল, যখন আমি এগারোই সেপ্টেম্বরের মর্মান্তিক ঘটনার পর রাস্তায় নেমে ইমিগ্রেন্ট অধিকাররক্ষা আন্দোলনে কাজ করছি। দিদি সেই সময়ে ‘মানবী’ নামে একটি দক্ষিণ এশীয় নারীদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার সংগঠন গড়ে তুলেছেন। আমাদের বিভিন্ন কনফারেন্সে তিনি এসেছেন, আমিও তাঁদের নানা অনুষ্ঠানে গেছি। যেখানেই গেছি, দেখেছি সুজনদা শমীতাদির সঙ্গে আছেন, পাশে আছেন। তিনি কাজ করেন টেলিফোন এবং আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে। কিন্তু সময় করে এসব জায়গায় তিনি গিয়েছেন তাঁর স্ত্রীর পাশে থাকার জন্যে।
আমার বাবা যখন নিউ ইয়র্কে এসেছিলেন, তখন সুজনদা-শমীতাদি আমাদের বাড়িতেও ঘুরে গেছেন। আমরা রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালন করেছিলাম। আমার বাবা আবৃত্তি করেছিলেন, “হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছো অপমান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।” আমরাও তাঁদের নিউ জার্সির বাড়ি গেছি। হইহই করে এসেছি।
সুজনদার বহুদিনের কাজ ছিল বাংলা ভাষায় একটা জ্ঞানভাণ্ডার গড়ে তোলা। একটা এনসাইক্লোপিডিয়ার মতো সম্পূর্ণ বাংলা ভাষার জ্ঞানভাণ্ডার। ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প। এরকম বাংলা নলেজ স্টোরহাউস খুব কমই আছে

বিদেশে বসেও আমরা যারা বাংলা ভাষায় লেখালেখি করি, সুজনদা তার মধ্যে ছিলেন একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। একেনবাবুর স্রষ্টা বলে তাঁকে এখন সবাই চেনে।
কিন্তু তাঁর বহুদিনের কাজ ছিল বাংলা ভাষায় একটা জ্ঞানভাণ্ডার গড়ে তোলা। একটা এনসাইক্লোপিডিয়ার মতো সম্পূর্ণ বাংলা ভাষার জ্ঞানভাণ্ডার। ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প। এরকম বাংলা নলেজ স্টোরহাউস খুব কমই আছে। এই অবসর ডট নেট (https://abasar.net/) তাঁর আসল সৃষ্টি। প্রায় কুড়ি বাইশ বছর ধরে তিনি এই কাজটা করে এসেছেন। আমিও তাঁর অনুরোধে বিভিন্ন বিষয়ে সেখানে দু-একবার লিখেছি। সুজনদা আমাকে অনেকবার বলেছেন এই মহৎ প্রচেষ্টায় সামিল হতে। কিন্তু নিজের জীবনের নানা সংগ্রামে ও নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের মধ্যে যুক্ত থাকায় বেশি সময় আমি দিতে পারিনি। তারপর যোগাযোগটা ক্ষীণ হয়ে গেছে।
সুজনদা হঠাৎ চলে গেলেন। পিছনে ফেলে গেলেন দীর্ঘকালের কাজ। শমীতাদি ও সায়ন্তনীকে আমাদের সমবেদনা জানাই।
প্রবাসে আমাদের যে ক্রমক্ষীয়মান সমাজ, যেখানে কথা বলার সমধর্মী মানুষ খুঁজেই পাওয়া যায় না, সেখানে এই ক্ষতি খুব বেশি অপূরণীয়।