আশি বছর পরে ফিরে দেখা পঞ্চাশের মন্বন্তর

আকালের সন্ধানে কলকাতায় চারদিন

“মানুষের জীবন ফুলবাগান নয়, প্রতারণা ও নৈরাজ্যের বিকট ভাগাড়”, টি এস এলিয়টের একটি কবিতার লাইন এভাবেই তর্জমা করেছিলেন বিশ শতকের গুরুত্বপূর্ণ একজন চিন্তাবিদ-গবেষক-লেখক, বিনয় ঘোষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের নাৎজি সরকারের হাতে যত ইহুদীর মৃত্যু হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি সংখ্যক বাংলার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৭৭০ এবং ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে। তাঁদের স্মরণে কোনও বিশেষ দিন নেই। সেই ১৯৮১ সালে অমর্ত্য সেন বলেছিলেন, বাংলার মানুষের পেট ভরার মতো খাদ্য সরকারের কাছে ১৯৪৩-এ মজুত ছিল, এবং ২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘Inglorious Empire: What the British Did to India’ বইটিতে শশী থারুর লেখেন, চার্চিল জেনেশুনেই অভুক্ত ভারতীয়দের মুখের খাবার চালান করে দেন ভরপেট খাওয়া ব্রিটিশ সৈন্যদলের দিকে, এমনকি গ্রীস ও ইউগোস্লাভিয়ার মানুষের জন্য ইউরোপে জমতে থাকা খাদ্যভাণ্ডারের দিকেও। ৮০ বছর পার হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া বাংলার আকালের, যে বিপর্যয় “পঞ্চাশের মন্বন্তর” (১৯৪৩-৪৪) বলে পরিচিত।

৮০ বছর পর আবারও কেন আমরা ফিরে দেখবো যা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাধিক লজ্জাজনক, অমানবিক একটি ঘটনা? এখনকার প্রজন্মের মন্বন্তর সম্পর্কে কোনও সরাসরি অভিজ্ঞতা নেই। অনাহারে ক্লিষ্ট দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষগুলোর অবস্থা কেমন হয়েছিল, তা জানা যায় ওই সময়ের খবরের কাগজের প্রতিবেদন, কিছু ফটোগ্রাফ, অথবা হাতে গোনা কয়েকজন শিল্পীর (জয়নুল আবেদিন, চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য প্রমুখ) আঁকা ছবি দেখে। যদিও মন্বন্তরের বীভৎসতা, তার বাস্তবতা কিছু প্রতিবেদন, প্রবন্ধ বা তুলির টানের সঙ্গে তুলনায় আসে না। তবুও ওটুকু আছে বলেই সেইসব কালো ইতিহাসের সামান্য আঁচ আমরা পেতে পারি। ব্রিটিশ ভারতের এই শেষ ও সবথেকে মর্মান্তিক আকাল, বাংলা এবং তার পার্শ্ববর্তী রাজ্যের প্রায় তিরিশ লক্ষ মানুষের প্রাণ গ্রাস করেছিল। সাইক্লোন, যুদ্ধ ও কৃষি-বিপর্যয়ের ফলে সহায় সম্বলহীন গ্রামবাসীরা শহর কলকাতার দিকে আসতে শুরু করেন খাবারের খোঁজে। শহরের রাস্তায় রাস্তায় দুর্ভিক্ষ-পীড়িত উদ্বাস্তু মানুষের ঢল নামে। অনেক মৃত্যু হয় অনাহার, অপুষ্টি এবং তজ্জনিত নানা রোগে। এমন বিপর্যয় আমাদের দেশে আর ফিরে না এলেও, এমন বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বারবার। কোভিড অতিমারি বা ইউরোপ-মহাদেশে চলতে থাকা যুদ্ধ আমাদের পঞ্চাশের দশকের মন্বন্তরের স্মৃতি উসকে দেয়নি কি?

এমন বিপর্যয় আমাদের দেশে আর ফিরে না এলেও, এমন বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বারবার। কোভিড অতিমারি বা ইউরোপ-মহাদেশে চলতে থাকা যুদ্ধ আমাদের পঞ্চাশের দশকের মন্বন্তরের স্মৃতি উসকে দেয়নি কি?

২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে এই পঞ্চাশের মন্বন্তরকে আলোচ্য বিষয় করেই শহরে অনুষ্ঠিত হলো চারদিনব্যাপী আলোচনাচক্র, প্রদর্শনী, সিনেমা এবং নাটকের অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠান সামগ্রিক ভাবে রয়াল সোসাইটি অফ এডিনবার্গের অনুদানে “British empire, Scotland and Indian famines” শীর্ষক কর্ম পরিকল্পনার অংশ, যা শুরু হয়েছিল স্কটল্যান্ডে ২০২২ সালের মার্চ মাসে। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত তিন গবেষক স্কটল্যান্ড, আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গে কর্মরত। প্রকল্পের মুখ্য গবেষক ড. সৌরিত ভট্টাচার্য স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রকল্পটি নথিভুক্ত করেছেন। অন্য দুই গবেষক, ড. রাজর্ষি মিত্র এবং ড. বিনায়ক ভট্টাচার্য, যথাক্রমে আই আই আই টি গুয়াহাটি এবং মৌলানা আবুল কালাম আজাদ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রকল্পের অন্যান্য কার্যক্রম দেখাশোনা করেছেন।

প্রকল্পের প্রথম থেকেই গবেষকদের আলোচনায় উঠে এসেছে বিপর্যয় এবং দুর্ভিক্ষ নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনার কথা। অর্থনীতিবিদ এবং ঐতিহাসিকরা পঞ্চাশের মন্বন্তর নিয়ে বহু গবেষণা করেছেন। এবার আমাদের জানার পালা এই বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল। জানার পালা আমরা এই প্রজন্মের মানুষ এই বিপর্যয়কে কী ভাবে দেখতে পারি। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল  কিছু সমমনস্ক গবেষক, শিল্পী ও লেখকদেরকে একসঙ্গে ভাবনার সুযোগ করে দেওয়া। একাধিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা মাথায় রেখে আলোচনাচক্র সংরক্ষণবিদ, লাইব্রেরিয়ান এবং গবেষকদের মত বিনিময়ের সুযোগ করে দেওয়া।

JBMRC-এ প্রদর্শনী

এর আগে এই প্রকল্পের কর্মপ্রণালীর অংশ হিসেবে তিনটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় স্কটল্যান্ড এবং গৌহাটিতে। প্রকল্পের গবেষকদের আমন্ত্রণে, চলতি বছরের মে মাসে স্কটল্যান্ডের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক থমাস ডিভাইন এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন স্কটিশ হাইল্যান্ডের দুর্ভিক্ষ নিয়ে। এবার এই প্রকল্পের শেষ আয়োজন হয় কলকাতায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের ৫ থেকে ৮ তারিখ। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ৫ তারিখ, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (MAKAUT)। উদ্বোধন করেন প্রতিষ্ঠানে উপাচার্য; প্রদর্শিত হয় মৃণাল সেন-এর ‘আকালের সন্ধানে’ ছবিটি এবং এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক আলোচনা করেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র বিদ্যার অধ্যাপক মানস ঘোষ।  

শিল্পী- সোমনাথ হোড়

যদুনাথ ভবন মিউজিয়াম অ্যান্ড রিসোর্স সেন্টার (JBMRC)-এ আলোচনাচক্র এবং প্রদর্শনী চলে ৬ এবং ৭ তারিখ। ৬ জানুয়ারি শুরু হয় সোমশংকর রায়ের কিউরেশনে ‘মননে পঞ্চাশ : মন্বন্তর ফিরে দেখা’ শীর্ষক প্রদর্শনী, যা সেসময়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন, ফটোগ্রাফ, অথবা শিল্পীদের ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছিল। তবে, এই প্রদর্শনী বোধহয় আরও একটু মনোযোগ দাবি করছিল। ছোটো একটি ঘরে, কিছু নথির ‘প্রিন্ট আউট’ বা প্রতিলিপি ঝুলিয়ে দিলেই কি ৮০ উত্তীর্ণ মন্বন্তর ফিরে দেখা যায়?  

প্রদর্শনী বাদে জনম মুখোপাধ্যায় ও সঞ্জয় কুমার মল্লিকের আলোচনা চলে চল্লিশের দশকের বাংলা নিয়ে। দেখানো হয় ‘ধরতি কে লাল’ সিনেমাটি, আলোচনা করেন সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় ও অনুরাধা রায়। মন্বন্তরের স্মৃতিরক্ষা নিয়ে কথালাপে ছিলেন সুপ্রিয়া চৌধুরী, মধুময় পাল, অভিজিৎ গুপ্ত, মহঃ ইনতাজ আলি ও ঋতুপর্ণা রায়। শেষদিন, ৮ তারিখ অন্যান্য অনুষ্ঠানের সঙ্গে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে বিজন ভট্টাচার্যের লেখা নাটক ‘জবানবন্দী’। সন্ধে সাড়ে ছটায় মধুসূদন মঞ্চে নাটকটি মঞ্চস্থ করছে আনন্দপুরের গুজব নাট্যগোষ্ঠী। নাট্যগোষ্ঠীর মতে এই নাটক বাঙালির আকালের সঙ্গে যুঝে ওঠার দলিল, যা আমাদের ইতিহাস সচেতনতার দলিল হিসেবেই প্রদর্শিত করা হচ্ছে।      

Post Tags
Developed by DXDasia