
হিন্দুমেলার সম্পাদক ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ, ব্রাহ্মসমাজেও যুক্ত হয়েছিলেন একসময়
লেখিকা মহুয়া দাশগুপ্তের কণ্ঠেও শুনে নিতে পারেন এই লেখা
ঠাকুরবাড়ি শিল্পীদের রত্নআকর, একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। সেই উনিশ শতকের অন্ধকার অতীত প্রকোষ্ঠ থেকে আজও ঝলমলিয়ে ওঠে প্রতিভার দ্যুতি। সেই সঙ্গে ফেলে আসা মুহূর্ত হয়ে যায় স্মৃতির রত্নভান্ডার! গল্পের মালা গেঁথে নবীন প্রজন্মের কাছে অন্যরকম এক নস্টালজিয়া হয়ে হাজির হয় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, যার প্রাচীন স্থাপত্যের অন্তরালে ইতিহাস লুকিয়ে থাকে। আজ এক শিশুর মতো সরল শিল্পীর গল্প বলি। রবীন্দ্রনাথের বড়োদাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প!
তিনি ছিলেন মজার মানুষ! অগাধ জ্ঞানের সাগর হলে বুঝি এমন আত্মবিস্মৃত হলেই মানায় বেশি। সারাদিন সাধনার মতো মগ্ন থাকতেন লেখাপড়ায়। তেতলার ঘরটা দ্বিজেন্দ্রনাথের ভার ভারিক্কি তত্ত্বকথায় ভরাট হয়ে থাকতো, ভাবনা ভাগ করে নেওয়ার লোক ছিল কম! মনের দোসর কেউ জুটলে খুশি মনে তাঁকে তত্ত্বকথা শুনিয়ে যেতেন দ্বিজেন্দ্রনাথ। এমন কথা রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন , ‘ছেলেবেলা’ বইটিতে। এই আধুনিক সময়ে বসে ভাবলে বেশ অন্যরকম লাগে, ঠাকুরবাড়ির তেতলার বারান্দায় অঙ্ক কষা কাগজ উড়ে যাচ্ছে, ঘরের ভিতর থেকে ভেসে আসছে বিলিতি বাঁশির সুর, প্রবল আবেগে বাংলা শব্দ, ধ্বনি, ছন্দকে বিচিত্র ভঙ্গিতে ব্যবহার করে সৃজন হচ্ছে ‘স্বপ্নপ্রয়াণ’ কাব্যের । সব শিল্পের স্রষ্টাই দ্বিজেন্দ্রনাথ। বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য— প্রতি ক্ষেত্রে তাঁর অবাধ বিচরণ। এইখানেই তাঁর স্বকীয়তা। দ্বিজেন্দ্রনাথের যে ছবি রবীন্দ্রনাথ তৈরি করেছেন, তা অনুসরণ করলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে জোড়াসাঁকোর তেতলার বারান্দায় একটি ছোটো বিছানা আর সামনে ডেস্ক নিয়ে ‘স্বপ্নপ্রয়াণ’ রচয়িতার উচ্চকলহাসে উজ্জ্বল মুখশ্রী! চারিদিকে আমের বোলের মতো খসে পড়ছে পরিত্যক্ত পৃষ্ঠা! যেগুলি একজোট করলে হয়তো একটি গোটা সাহিত্য হয়ে যেতে পারতো। অথবা অনাবিল আনন্দে সাঁতার কেটে ভেসে যেতে চাওয়া দ্বিজেন্দ্রনাথ কনিষ্ঠদের মনের বিস্ময়ের ফ্রেমে ধরা পড়েছিলেন অজান্তে।
সহজ মনের মানুষ ছিলেন বলেই বোধহয় জটিল দার্শনিক তত্ত্বগুলি সহজ করে প্রকাশ করতে ভালোবাসতেন। লেখা শোনানোর মানুষের তালিকায় যেমন ভাইয়েরা ছিলেন, তেমনই ভৃত্যদেরও তালিকাভুক্ত হতে হয়েছিল। ‘কালো দাই’ নামের এক ভৃত্য দ্বিজেন্দ্রনাথের ‘স্বপ্নপ্রয়াণ’-এর পংক্তি শুনে ভক্তিভরে অনেকগুলি প্রণাম করেছিলেন। এমন গল্পও শোনা যায়। দ্বিজেন্দ্রনাথের জীবনের প্রচলিত মজার ঘটনাগুলির কোলাজে আমাদের মনে স্মিত হাসির কিরণ ছড়িয়ে দেবেন এক ছদ্মবেশী দার্শনিক। যিনি শিশুর মতো উচ্ছ্বাসে ট্রাইসাইকেল চালিয়ে, পায়জামার উপর ডবল কোট — একটি সোজা করে ও একটি উল্টো করে পরে, পার্কস্ট্রিট, ময়দান, বালিগঞ্জ পাড়ায় বেরিয়ে আসতেন। অনায়াসে! কাপড়ের জোব্বা যদি হয়, কাগজের জোব্বা হবে না কেন? যেমন ভাবা তেমনি কাজ, কাগজের তৈরি বিচিত্র জোব্বা পরে শহর ঘুরে আসা কোনো ব্যাপার ছিল না তাঁর কাছে। আবার তিনিই একদিকে বাংলা শর্টহ্যান্ড পদ্ধতি নিয়ে ছোটোখাটো গবেষণা করছেন আর অন্যদিকে লেখার ঘোরে ভিখারিকে দিয়ে দিচ্ছেন পারিবারিক বহুমূল্য শাল অথবা নিচে দাঁড় করানো একটি গোটা রিক্সা! গল্পকথা নয়, সহজ সত্যি।
রবীন্দ্রনাথের পাশে চেয়ারে বসে আছেন তাঁর বড়োদাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর
কতদিন এমন হয়েছে যে অতিথিকে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করেছেন অথচ বাড়িতে কাউকে বলেননি। আবার কখনো অতিথির সামনে বসেই নিজের খাওয়া সেরে অবাক হয়ে চেয়ে থেকেছেন। পরে মনে পড়তে নিজেই লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে পড়েছেন। ঘি দিয়ে লুচি খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে জল দিয়ে লুচি ভেজে দেওয়ার ফরমাশ করেছেন। এই বয়স্ক শিশুটিকে নিয়ে তাঁর পুত্রবধূ হেমলতা দেবীর চিন্তার শেষ ছিল না। একথাও সত্যি!
দর্শন, বেদান্ত, অঙ্ক, সাহিত্য চর্চার সঙ্গে সঙ্গে কাগজ ভাঁজ করে নতুন জিনিস বানানোর খেলায় মেতে থাকতেন তিনি। ভাঁজ করার পদ্ধতি মনে রাখার ছড়া লিখতেন। এই খেলার নাম দিয়েছিলেন ‘বক্সামেট্রি’। হিন্দুমেলার সম্পাদক ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ। ব্রাহ্ম সমাজেও যুক্ত হয়েছিলেন একসময়। ঠাকুরবাড়ির প্রতিনিধি হয়ে জমিদারি পরিদর্শনেও গিয়েছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ। কিন্তু অতিরিক্ত প্রজাদরদি মনোভাবের কারণে তাঁকে ফিরিয়ে আনা হয় তাড়াতাড়ি । আসলে, বৈষয়িক কোনো বাঁধন দ্বিজেন্দ্রনাথের জন্য ছিল না একেবারেই।
দ্বিজেন্দ্রনাথ মানুষ থেকে পশুপাখি সকলকেই ভালোবাসতেন সরল মনে। তাঁকে ঘিরে যেমনষ জমায়েত হতো শিশুদের, তেমনই পাখি, কাঠবেড়ালিদেরও। তিনিও গভীরভাবে একাত্ম হয়ে যেতেন। নাহলে কেউ দাঁড়কাককে মেরে তাড়িয়ে দিতে বলে? নাকি পরের মুহূর্তে আবার সেই দাঁড়কাককেই ধরে আনতে বলে?
ছেলেমানুষদের বেশি শাসন করাও তাঁর নাপসন্দ ছিল। শেষবয়সে শান্তিনিকেতনে মেতে থাকতেন লেখাপড়া আর সৃষ্টিশীল কাজে। বুকপকেটে চশমা রেখে নিত্য ভুলে যাওয়া এই মানুষটিই ভোলেননি নিজের উইলে ভৃত্য মুনীশ্বর আর গোষ্ঠের জন্য কিছু সম্পত্তি বরাদ্দ করতে।
সত্যিই প্রতিভাবান মানুষদের সম্পূর্ণ বুঝতে পারাটাও একটা আর্ট!
সহায়ক গ্রন্থঃ
ঠাকুরবাড়ির সাতকাহন, শান্তা শ্রীমানী
ঠাকুরবাড়ির বাহিরমহল,চিত্রাদেব,
রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজন, সমীর সেনগুপ্ত ইত্যাদি।
