কিন্তু একটা শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ সব সময়েই যে কোনও গণতান্ত্রিক দেশের পক্ষে আদর্শ
শঙ্কর সিং বাঘেলা দল ছাড়ার পর কংগ্রেস নাজেহাল গুজরাটে। সোনিয়া গান্ধীর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোগী আহমেদ প্যাটেল রাজ্যসভার ভোটে জিতলে সেটাই হবে আশ্চর্যের। মোট ৫৭ জনের মধ্যে ৬ জন বিধায়ক দল ছেড়েছেন, ৭ জন দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছেন না, আরও জনা দশেক নাকি ক্রসভোট করতে পারেন। অথচ জিততে হলে অন্তত ৪৪ জনের প্রথম পছন্দের ভোট লাগবে।
এর মধ্যে আরও খবর, দল ছাড়ার অপেক্ষায় রয়েছেন মহারাষ্ট্রের নারায়ণ রানে আর তেলেঙ্গনা বিধানসভার বিরোধী দলনেতা কে জন রেড্ডি। নারায়ণ রানে ২০০৮ সাল থেকে দলে কোনঠাসা। সেই বছর মুখ্যমন্ত্রী অশোক চহ্বাণের বিরোধিতা করে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। পরে ক্ষমা চেয়ে দলে ফেরেন আগেকার শিবসেনা নেতা। তাঁর সঙ্গে বিধায়ক না–থাকলেও কোঙ্কন অঞ্চলে প্রভাব আছে। তিনি বিজেপিতে এলে ওই অঞ্চলে বিজেপির জমি তৈরি হবে। তেলেঙ্গানার জন রেড্ডির সঙ্গে বিজেপি–তে যোগ দিতে পারেন অন্তত আরও ৪ কংগ্রেস বিধায়ক। তিনি দলকে গ্রাহ্য না–করে এখন বিজেপি–র ডাকা সভায় যাচ্ছেন। সম্প্রতি হায়দরাবাদে বিজেপি–র তরফে উপরাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী বেঙ্কাইয়া নাইডুকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। বেঙ্কাইয়া তাঁর দলের প্রার্থী না হওয়া সত্ত্বেও জন রেড্ডি ওই সংবর্ধনা সভায় পৌঁছন। অথচ দল এখনও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি। নাগার্জুন সাগরের বিধায়কের সাফ কথা, বারবার বলা সত্ত্বেও দলীয় হাইকমান্ড তেলেঙ্গানায় কংগ্রেসকে শক্তিশালী করতে কোনও পদক্ষেপই করেনি। ফলে রাজ্যের মানুষের থেকে দল পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
গুজরাট যখন ভয়াবহ বন্যার কবলে তখন নিজের আসন ধরে রাখতে ৪২ জন বিধায়ককে কর্ণাটকে পাঠিয়েও স্বস্তিতে নেই প্যাটেল। বিজেপি বলছে, ৮ আগস্ট রাজ্যসভার নির্বাচনে কংগ্রেসের অন্তত ২০ জন বিধায়ক বিজেপি প্রার্থীকে ভোট দেবেন। ৬ জনের বিধানসভা থেকে পদত্যাগের পর এমনিতেই দলের বিধায়ক এখন ৫১। আরো কুড়ি কমলে সংখ্যাটা দাঁড়াবে ৩১। কুড়ির বদলে পনেরো হলেও হেরফের কিছু হচ্ছে না। কংগ্রেসের জামনগরের বিধায়ক রাঘব হংসরাজ পাটিল পরিষ্কারই জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর ভোট বিজেপি–ই পাবে। আর পরের নির্বাচনে জামনগর (গ্রামীণ) কেন্দ্র থেকে তিনি বিজেপি–র টিকিটেই লড়বেন। একই অবস্থানে রয়েছেন জামনগর উত্তরের কংগ্রেস বিধায়ক ধর্মেন্দ্র সিং জাডেজাও। তার উপর গুজরাটে আবার এবারের রাজ্যসভা ভোটে নোটা চালু হওয়ার কথা। কিছু বিধায়ক নোটায় ভোট দিলে প্যাটেলের ভরাডুবি নিশ্চিত।
বিজেপির নেতারা, বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ যখন দিনে ষোল–আঠারো ঘণ্টা কাজ করে চলেছেন, একের পর এক রাজ্যে শক্তি বাড়াচ্ছেন, কংগ্রেসের দিল্লির নেতারা কখনও ছুটি কাটাচ্ছেন, আর খুব নিয়ম করে ধরা বাঁধা বিবৃতি দিয়ে চলেছেন। কীভাবে দেশের রাজনৈতিক চালচিত্র বদলে যাচ্ছে, তা নিয়ে তাঁদের কোনও ভাবনাচিন্তা আছে বলে মনে হচ্ছে না। বিষয়টা উদ্বেগজনক এই কারণেই যে দেশে একটা শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ থাকা দরকার। এখন যা অবস্থা তাতে অদূর ভবিষ্যতে পাঞ্জাব ছাড়া কোনও রাজ্য কংগ্রেসের হাতে থাকবে না। লোকসভা ভোটের আগে যে সব রাজ্যে ভোট হবে তার মধ্যে আছে গুজরাট ও হিমাচল। বীরভদ্র সিং–এর দৌলতে হিমাচলে কংগ্রেসের হার নিয়ে সংশয় নেই। তাঁকে সরানোর কথা ভাবেনি কংগ্রেস। কর্ণাটকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা থাকলেও বিজেপির ঝাঁপিয়ে পড়ার ক্ষমতা তাদের এগিয়ে রেখেছে। দুটো রাজ্যেই হারলে থাকবে শুধু পাঞ্জাব।
পরিস্থিতি এমন যে বিজেপিকে রোখার কাজটা শুধু তৃতীয় শিবিরের কাঁধে এসে পড়ছে। এই রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিকে আটকে দিয়েছেন। ওড়িশায় নবীন পট্টনায়ক আটকে রেখেছেন। কিন্তু কংগ্রেস ভেঙে পড়ায় ওড়িশায় এবং সিপিএম–কংগ্রেস উভয়ের ব্যর্থতায় এই রাজ্যে দ্বিতীয় শক্তি হিসাবে উঠে আসছে বিজেপি। তেলেঙ্গানাতেও একই পরিস্থিতি। উত্তরপ্রদেশে সত্যিকারের মহাজোট হলে সেখানে বিজেপিকে কিছুটা রোখা সম্ভব। বিহারে সেই সম্ভাবনা বিলীন হয়ে গিয়েছে। কেরলে বামেরা প্রথম শক্তি হলেও কংগ্রেস আছে, এবং সেই কারণে বিজেপির উত্থান সম্ভব হচ্ছে না। যদিও রাজনৈতিক পরিস্থিতি আচমকাই বদলে যেতে পারে, তাহলেও বলা যেতে পারে এই মুহূর্তে কিন্তু পুরো দেশে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে যেখানে ২০১৯ সালে বিজেপিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলাই সম্ভব হবে না।
কোন দল জিতবে, কে হারবে, তা মানুষের ভোটে ঠিক হয়। কিন্তু একটা শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ সব সময়েই যে কোনও গণতান্ত্রিক দেশের পক্ষে আদর্শ। কারণ, একচ্ছত্র ক্ষমতা স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠার হাতছানি দেয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই কংগ্রেসের ডুবে যাওয়া দেশের পক্ষে কিছুটা বিপজ্জনক। কংগ্রেসকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে গঠনমূলক ভাবনাচিন্তা করতে হবে। তার কোনও লক্ষণ কিন্তু দেখা যাচ্ছে না।