তাঁর চাকরিজীবনে বদলি-বিপর্যয়ের উদাহরণ প্রচুর
মাহবুব আলম
উনিশ শতকের খ্যাতিসম্পন্ন কবি নবীনচন্দ্র সেন পেশায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। ১৮৬৮ থেকে ১৯০৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত তিনি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার বিভিন্ন স্থানে ডেপুটিগিরি করেছেন। ডেপুটি আমলাতন্ত্রের নিম্নতম সপ্তম ধাপ থেকে প্রথম ধাপে পৌঁছাতে তাঁর মতো করিৎকর্মা অফিসারের দীর্ঘ ৩৬টি বছর লেগেছিল। এই দীর্ঘ কর্মজীবনকে তিনি আত্মজীবনী ‘আমার জীবন’-এ উল্লেখ করেছেন। ‘ঘোরতর বিপদসঙ্কুল চাকরিজীবন’ হিসেবে।
চাকরিজীবনে তাঁর মনে কোনো শঙ্কা বা বেদনাবোধ হতে দেখা যায়নি। অবসর নেওয়ার প্রসঙ্গে আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘৩৬ বছরের চাকরি হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়া হাসিতে হাসিতে কোর্ট হইতে বহির্গত হইলাম এবং গৃহে যাইতে যাইতে আকাশের দিকে চাহিয়া বলিলাম—দয়াময়, তোমার দয়ায় এই ঘোরতর বিপদসঙ্কুল চাকরিজীবন শেষ করিলাম…বাকি জীবন আমাকে শান্তি দিও…।’
নবীনচন্দ্র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রায়ই নানা মতভেদ এবং দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যহেতু বিরোধে জড়িয়ে পড়তেন। ১৮৭৭ সালে চট্টগ্রামে চা-শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণের প্রতিবিধানে সক্রিয় ভূমিকা ইংরেজ শাসকদের অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে ওঠে।
মাদারীপুরে তাঁর একটি রায়ের বিরুদ্ধে জেলা জজ তীর্যক মন্তব্য করে তাঁকে বিপদগ্রস্ত করে তোলেন। নবীনচন্দ্র লিখেছেন—‘আমি ষড়যন্ত্রে পড়িয়া এই রূপ বিপদগ্রস্ত হইয়াছিলাম যে আমার চাকরি যদি পণ্যদ্রব্য হইত, তবে সিকি পয়সা দিয়াও তাহা কেহ কিনিত না।’ হাইকোর্ট তাঁর রায় বহাল রাখায় তিনি সেই যাত্রায় রক্ষা পান। মাদারীপুরে একের পর এক তিনি বিভাগীয় তদন্তের মুখে পড়েছিলেন। তাঁর আত্মজীবনীতে নিজের সম্পর্কে কিছু অতিশয়োক্তি থাকলেও চাকরিজীবনের বিভ্রাট এবং বদলির বিপত্তির নানা বর্ণনা মূলত তথ্যনির্ভর ও বাস্তবানুগ বলেই গবেষকদের ধারণা। বেশ জাঁক করে নিজেই লিখেছেন, ‘সার্ভিসের মধ্যে আমি একজন বিষম সাহসী (ডেয়ার ডেভিল) প্রকৃতির লোক বলিয়া পরিচিত।’ অথচ আমার জীবন-এ এই সাহসী পুরুষকে প্রায়ই বলতে শোনা যায়, ‘দয়াময়, তুমি আমাকে এক মহাবিপদ হইতে উদ্ধার করিয়া আবার এই বিপদে ফেলিলে।’ মোকদ্দমার বিচারবিভ্রাটে আতঙ্কিত হাকিম নবীনচন্দ্রকে নিয়মিত দয়াময়ের শরণাপন্ন হতে হয়েছে। ‘নিঃসহায় হইয়া সেই বিপদভঞ্জনকে ডাকিতে লাগিলাম’—একদম করুণ আর্তি ঘুরেফিরে তাঁর লেখায় উঁকি দিয়েছে বারবার।
আরও পড়ুন
কেবা শুনাইল শ্যাম-নাম
তাঁর চাকরিজীবনে বদলি-বিপর্যয়ের উদাহরণ প্রচুর। মাত্র সাত মাসের মাথায় পুরী থেকে মাদারীপুরে বদলি হওয়ায় বড় দুঃখ পেয়েছিলেন তিনি। তাঁর চাকরিজীবনের বদলিবিভ্রাটের একটা উদাহরণ দিলেই যথেষ্ট হবে। ১৮৯৮ সালে চট্টগ্রামে নবীনচন্দ্র তাঁর অফিসে কেরানির পদে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে নিয়োগ দেন। প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহের ইচ্ছা প্রকাশ করে আবদুল করিম স্থানীয় জ্যোতি পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। এই বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে নানা প্রশাসনিক বিতর্কের সৃষ্টি হওয়ার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় তাঁর আমার জীবন-এ। বিতর্ক বহুদূর গড়ায় এবং এর জের ধরে আবদুল করিম চাকরিচ্যুত হন। নবীনচন্দ্র কুমিল্লায় বদলি হয়ে তাঁর সাধের চট্টগ্রাম ছাড়তে বাধ্য হন।
তাঁর ‘পলাশীর যুদ্ধ’ কাব্য বঙ্কিমের ‘আনন্দমঠ’-এর মতো দেশবাসীকে উদ্বেলিত এবং শাসকমহলের অংশবিশেষকে বিচলিত করেছিল। সন্দেহ নেই, নবীনচন্দ্র তাঁর এই কাব্যে ইংরেজের বিরাগভাজন হওয়ার আশঙ্কায় সিরাজকে নায়ক হিসেবে তুলে ধরেননি।
সিরাজ ও মীরজাফর উভয়েই তাঁর চোখে অগ্রহণীয়। মোহনলাল এই কাব্যের নায়ক। ক্লাইভকেও কোনো দোষারোপ বা খলনায়ক হিসেবে চিত্রিত করেননি নবীনচন্দ্র। বরং সিরাজের পরাজয়ের পর মোহনলালের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন, ‘ভারতের নহে আজি অসুখের দিন।’ শুধু এ-ই নয়, আরও বলেছেন, ‘এ সুখের দিনে প্রফুল্ল অন্তরে গাও মিলি সবে ব্রিটিশের ভয়ে।’ রাজশক্তির ভয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নবীন পলাশীর যুদ্ধ-এর প্রথম সংস্করণের অনেক পাঠ বদল করেছেন। প্রথম সংস্করণ থেকে ‘ইংরেজের রক্তে আজি করিব তর্পণ’ বাদ দেওয়া হয়। বাদ দেওয়া হয় ‘আসিবে ভারতে চির বিষাদ-রজনী!…’-এর মতো পঙক্তি। ‘সেই শোণিতের স্রোতে হইল তখন বঙ্গ-স্বাধীনতা-শেষ আশা বিসর্জন’-এর মতো বিপজ্জনক পঙক্তি ছেঁটে ফেলা হয়। নবীনচন্দ্রের কবিসত্তা ডেপুটি লীলার পায়ে এমনিভাবেই মাথা নত করেছিল।
পাশাপাশি সিরাজ চরিত্রে মিথ্যা কলঙ্ক লেপনের জন্য তিনি সমসময়েই ধিক্কৃত হয়েছেন তীব্র ভাষায়। এত কিছু করার পরও শাসক কর্তৃপক্ষের একটি অংশ তাঁর ওপর রুষ্ট হয়েছিল। শোনা যায়, এই বইয়ের কারণে তাঁর পদোন্নতি স্থগিত রাখা হয় কিছুদিনের জন্য। তবে বিলম্বে হলেও তাঁর পদোন্নতি ঠিকই হয়েছিল।
(ঋণ – বাংলা লাইব্রেরি)