‘হলওয়েলের মৃতের তালিকা সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাসযোগ্য নহে’
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
সে অনেক দিন আগের কথা, প্রায় কুড়ি বৎসরের কথা। তখন ‘সাধনা’ বন্ধ হইয়া গেলে, সিরাজদ্দৌলা-শীর্ষক প্রবন্ধগুলি মাসে মাসে ‘ভারতী’তে প্রকাশিত হইত। যে মাসে অন্ধকূপহত্যা-কাহিনির সমালোচনা প্রকাশিত হইবার কথা, সেই মাসের লেখাটি ডাকঘরের গোলযোগে হারাইয়া যায়। নকল ছিল না; ` ভারতী’ প্রকাশিত হইবারও বড় বিলম্ব ছিল না। অগত্যা সে লেখাটিকে আবার তাড়াতাড়ি লিখিয়া পাঠাইতে হইয়াছিল।
তখন অন্ধকূপহত্যা-কাহিনি সম্বন্ধে তিনটি কথা বিশেষভাবে আলোচনা করিয়াছিলাম। (১) হলওয়েলের কাহিনিই অন্ধকূপহত্যার প্রধান কাহিনি,- সে কাহিনি বিশ্বাস করা কঠিন। (২) মিথ্যা হইলে কথাই নাই,- হইলেও, তাহার জন্য সিরাজদ্দৌলাকে অপরাধী করা যায় না। (৩) উত্তরকালে অন্ধকূপহত্যার প্রতিহিংসাসাধনের জন্য পলাশীর যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছিল বলিয়া ইতিহাসে যে কাহিনি স্থানলাভ করিয়াছে, সমসাময়িক কাগজপত্রে তাহার উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায় না।
যখন `ভারতী’তে এই লেখা বাহির হয়, তখন অন্ধকূপহত্যার স্মৃতিস্তম্ভটি বর্তমান ছিল না;- ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে তাহা অপসারিত হইয়াছিল। সুতরাং তাহার কথাও লিখিতে হইয়াছিল।
তাহার পর অনেক বৎসর চলিয়া গিয়াছে,- অনেক তথ্যানুসন্ধানের সূত্রপাত হইয়াছে,- গভর্নমেন্টের উদ্যোগে ও ব্যয়বাহুল্যে তিনখণ্ড বৃহৎ পুস্তকে সমসাময়িক কাগজপত্র মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইয়াছে, এবং লর্ড কর্জনের বদান্যতায় অন্ধকূপহত্যার একটি স্মৃতিস্তম্ভও নির্মিত হইয়াছে।
এতকালের পর আবার অন্ধকূপহত্যা কাহিনির সত্যমিথ্যার আলোচনায় সূত্রপাত হইয়াছে। এবার শ্রীযুক্ত জে. এইচ. লিট্ল সাহেব ইংরাজিতে একটি প্রবন্ধ লিখিয়া জানাইয়া দিয়াছেন,- `অন্ধকূপহত্যা-কাহিনি একটা প্রকাণ্ড ধাপ্পাবাজি!’
ইহাতে আবার হৈ চৈ পড়িয়া গিয়াছে। সংবাদপত্রে অনেক সমালোচনা ও প্রতিবাদ প্রকাশিত হইতেছে এবং কলিকাতা ঐতিহাসিক সমিতি একটি বিচারসভায় ইহার আলোচনার ব্যবস্থা করিয়া লিট্ল সাহেবকে ও তৎসঙ্গে আমাকেও আমন্ত্রণ করিয়াছেন। এই বিচারসভার ব্যবস্থা নূতন যুগের নূতন ব্যবস্থা,- ঐতিহাসিক তথ্যানুসন্ধানের সরল পথ অবলম্বন করিবার লালসা বিজ্ঞাপক প্রশংসনীয় ব্যবস্থা।
সিরাজদ্দৌলা শীর্ষক প্রবন্ধে ‘ভারতী’’তে প্রকাশিত হইয়াছিল, তাহার মধ্যে দুইটি কথা সর্ববাদিসম্মতরূপে স্বীকৃত হইয়া গিয়াছে। সিরাজদ্দৌলার অপরাধ ছিল না,- প্রতিহিংসা-সাধনের জন্যও পলাশির যুদ্ধ সংঘটিত হয় নাই,- এই দুইটি কথা যে সর্ববাদিসম্মতরূপে স্বীকৃত হইয়াছে, তাহার প্রধান প্রমাণ নূতন স্মৃতিস্তম্ভ। পুরাতন স্মৃতিস্তম্ভে যে কলঙ্কলিপি সংযুক্ত ছিল, তাহাতে এই দুটি কথা উল্লিখিত ছিল। নূতন স্মৃতিস্তম্ভে যে ফলক-লিপি সংযুক্ত হইয়াছে, তাহাতে এই দুটি কথা স্থান লাভ করিতে পারে নাই।
ইহা ইতিহাসের পক্ষে অল্প লাভ নয়। আরও একটি লাভের কথা এই যে, হলওয়েল পুরাতন স্মৃতিস্তম্ভে যাহাদিগের অন্ধকূপে নিহত হইবার কথা ক্ষোদিত করাইয়া গিয়াছিলেন, নূতন স্মৃতিস্তম্ভ রচনার সময়ে তথ্যানুসন্ধানে জানা গিয়াছে,- তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ দুর্গজয়ের পূর্বে বা সমসময়ে দুর্গরক্ষার্থ প্রাণত্যাগ করেন- তাহাদের পক্ষে অন্ধকূপে নিক্ষিপ্ত হইবার সময় ছিল না! সুতরাং হলওয়েলের মৃতের তালিকা যে সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাসযোগ্য নহে, সে কথাও প্রকারান্তরে স্বীকৃত হইয়াছে। হলওয়েল ঢাকার হত্যা-কাহিনি রচনা করিয়াছিলেন,- তাহা যে সর্বৈব মিথ্যা, সমসাময়িক ইংরাজ-দরবার তদন্ত করিয়া, সরকারি রিপোর্টে সে কথা লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন।
সুতরাং এখন যাহারা অন্ধকূপহত্যা কাহিনিকে সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিতেছেন, তাহারাও একবাক্যে বলিতেছেন,- ‘হলওয়েলের সকল কথা সত্য নহে।’
ঐতিহাসিক তথ্যানুসন্ধান এইরূপে ক্রমে ক্রমে অন্ধকূপ হত্যা-কাহিনির বিরোধী নানা কথা স্বীকার করিবার পর, শ্রীযুক্ত লিট্ল সাহেব তাহাকে শেষ ধাক্কা দিয়া প্রবন্ধ রচনা করিয়াছেন। তাহার প্রবন্ধ বঙ্গ-ভাষায় অনূদিত হইবার যোগ্য হইলেও কেহ এ পর্যন্ত তাহার আলোচনামাত্রও করেন নাই।
শ্রীযুক্ত লিটল একটি নূতন কথা শুনাইয়াছেন। তিনি আদ্যন্ত সমস্ত ঘটনার আলোচনা করিয়া বলিয়াছেন,- যে সকল ইংরাজ বীরপুরুষ দুর্গরক্ষায় প্রাণ বিসর্জন করিয়া, ইংরাজের পরাজয়কেও বিজয়গৌরবে গৌরবান্বিত করিয়া গিয়াছেন, ইংরাজ লেখকগণ অন্ধকূপ হত্যা-কাহিনি বিশ্বাস করিতে গিয়া, তাহাদিগের পুণ্য স্মৃতিকে অপমানিত করিতেছেন! ইহা অনুমান মাত্র হইলেও, ইহার অনুকূলে যে সকল কথা বলা যাইতে পারে, শ্রীযুক্ত লিটল তাহার উল্লেখ করিয়া বিষয়টির পুনরালোচনার পথ উন্মুক্ত করিয়া দিয়াছেন। এতদিনের পর ইতিহাস ইংরাজ বীরপুরুষগণের আত্ম-বিসর্জনের মহিমা কীর্তনের জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠিয়াছে।
এই ইংরাজ-লেখক অধুনা প্রকাশিত সমস্ত কাগজপত্রের সহায়তায় যেরূপ নিপুণতার সঙ্গে বিষয়টির আলোচনা করিয়াছেন, তাহা মুক্তকন্ঠে প্রশংসিত হইবার যোগ্য। হলওয়েলের করুণ কাহিনিকেই প্রধান অবলম্বন করিয়া, এই লেখক প্রচুর সমালোচনা কৌশলে দেখাইয়া দিয়াছেন,- সে কাহিনি লৌকিক কাহিনি হইতে পারে না, তাহা যে নিতান্ত রচা কথা, কাহিনির মধ্যেই তাহার অনেক প্রমাণ প্রচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে। হলওয়েলের রচনাভঙ্গি ভুক্তভোগীর অকৈতব রচনাভঙ্গি নহে,- তাহা আখ্যায়িকা-লেখকের সুকৌশল-বিন্যস্ত কৃত্রিম রচনাভঙ্গি। তাহার সাহায্যে কারাকক্ষের যে সকল বর্ণনা লিখিত হইয়াছে, তাহাও অন্ধকার রজনীর যন্ত্রণাপূর্ণ কারা-কক্ষের বন্দিগণের নয়ন গোচর হইবার সম্ভাবনা ছিল না।
অধুনা যে সকল কাগজপত্র প্রকাশিত হইয়াছে তাহার সাহায্যে দেখিতে পাওয়া গিয়াছে,- অনেক ইংরাজ দুর্গ-জয়-কালে বীরের ন্যায় দেহ বিসর্জন করিয়াছিলেন। ইহাদের মৃত্যু কাহিনি দুর্গবাসী অন্যান্য ইংরাজ সহযোগীগণ বিলাতে লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন। যাহারা এইরূপে দুর্গরক্ষার্থ প্রাণ বিসর্জন করেন, তাহাদের নামও অন্ধকূপে নিহত ব্যক্তিগণের তালিকাভূক্ত করিয়া, হলওয়েল কাহিনি রচনা করিয়াছিলেন। এই তথ্য এতদিন অপ্রকাশিত ছিল; ইহা এখন হলওয়েলের কাহিনিকে আরও সংশয়পূর্ণ করিয়া তুলিয়াছে।
হত্যা-কাহিনি ধীরে ধীরে গঠিত হইয়া উঠিয়াছিল। কি উদ্দেশ্যে হলওয়েল এই কাহিনি-রচনায় ব্যাপৃত হইয়াছিলেন, কি উদ্দেশ্যে এই কাহিনির প্রতিবাদ করিবার জন্য সেকালের কেহ কোনরূপ চেষ্টা করেন নাই, শ্রীযুক্ত লিটল তৎসম্বন্ধে স্টেটসম্যান পত্রে এক সুদীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশিত করিয়াছেন।
অন্ধকূপহত্যা-কাহিনি ইউরোপীয়গণের মধ্যে প্রচারিত হইলেও, দেশের লোকে তাহার বিন্দু-বিসর্গ জানিত না। অন্য স্থানের লোকের কথা দূরে থাকুক, খাস কলিকাতার লোকেরাও তাহা জানিত না। চন্দননগরের ফরাসি ও হুগলির ওলন্দাজ যাহা জানিয়াছিলেন, তাহাও স্বাধীনভাবে জানিতে পারেন নাই,- ‘হলওয়েল কোম্পানির’ নিকট হইতে তাহারা ইহার কথা অবগত হইয়াছিলেন। সুতরাং তাহাদের কাগজপত্রে ইহার যাহা কিছু উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়, তাহা জানা কথা নহে, শোনা কথা,- আখ্যায়িকা রচয়িতা হলওয়েলের নিকট হইতে শোনা কথা!
এই সকল কারণে হলওয়েলের কাহিনির সমালোচনা করিতে গিয়া হয় তাহাকে বিনা বিচারে সত্য বলিয়া গ্রহণ করিতে হইবে, না-হয় বিচার করিয়া সন্দেহপূর্ণ বলিয়া পরিত্যাগ করিতে হইবে। যাহারা এই কাহিনি এখনও গ্রহণ করিবার পক্ষপাতী, তাহারাও মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিতেছেন যে,- হলওয়েলের কাহিনি সর্বাংশে সত্য হইতে পারে না। একজন স্পষ্টই লিখিয়াছেন,- ‘কলিকাতার দুর্গ-জয়কালে অনেকে প্রাণ বিসর্জন করিয়াছিল, ইহা সত্য কথা। যদি তাহারা অন্ধকূপ-কারাগারে প্রাণ বিসর্জন করিয়া থাকে, তবে হলওয়েলের কাহিনি সর্বাংশে সত্য না হইলেও, একেবারে মিথ্যা হইতে পারে না।’ এখন ইতিহাসের সকল তর্ক এই ‘যদির’ উপর আসিয়া দাঁড়াইয়াছে।
(ভারতী, ১৩২৩ সনের বৈশাখ সংখ্যায় প্রকাশিত)