বাংলায় শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ছিলেন তিনি
সোহেল মো. ফখরুদ-দীন
দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে বার্মা অয়েল কোম্পানির শ্রমিক ধর্মঘটের নেতৃত্ব দেন। এরপরে আরম্ভ হয়েছিল আসামের শত সহস্র চা-বাগান কুলিদের আন্দোলন। এই কুলিদের উপর অমানুষিক নিপীড়ন, নির্যাতনের প্রতিবাদে শুরু হয় আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে ধর্মঘট।
যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, চট্টগ্রামে আসার জন্য মহাত্মা গান্ধীকে আমন্ত্রণ জানালেন। আমন্ত্রণ গ্রহণ করেই মহাত্মা গান্ধী চট্টগ্রামে আসলেন। “আসাম বেঙ্গল রেল-কর্মচারী ধর্মঘট” ন্যায়সঙ্গত কিনা, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অনুমোদন ও সমর্থন লাভ করার যোগ্য কিনা, সরেজমিন অনুসন্ধান করবেন মহাত্মা গান্ধী। মহাত্মা গান্ধীকে অভ্যর্থনা করবার বিপুল আয়োজন করেছেন যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত। মহাত্মা গান্ধী অতিথি হলেন যতীন্দ্রমোহনের বাসভবনে। রেলস্টেশন থেকে যতীন্দ্রমোহনের বাসভবন পর্যন্ত সুদীর্ঘ রাস্তার দুইধারে বহু নারী পুরুষ সারি সারি দাঁড়িয়ে মহাত্মা গান্ধীকে সংবর্ধনা জানালেন। এই সুশঙ্খল জনসভা ও সংবর্ধনা সভায় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন চন্দ্রশেখর দে, তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন শ্রীমতি নেলী সেনগুপ্ত (যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের সহধর্মিণী)।
ধর্মঘটের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে গান্ধীজী সমর্থন করলেন ধর্মঘটকে। বক্তৃতা প্রসঙ্গ ধর্মঘটীদের ধৈর্য, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও কষ্ট বরণের প্রশংসা করলেন। যতীন্দ্রমোহনের বিস্ময়কর সংগঠন প্রতিভা এবং সুষ্ঠু নেতৃত্ব অভিনন্দিত করলেন। “‘আসাম বেঙ্গল রেল-কর্মচারী ধর্মঘট’ কংগ্রেস কার্যসূচির সঙ্গে জড়িত করেছিলেন যতীন্দ্রমোহন এবং তা যুক্তিসঙ্গত হয়নি”, এমন মন্তব্য করেছিলেন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির কোনো কোনো সদস্য। তাঁদের এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিত গান্ধীজী অভিমত প্রকাশ করলেন, অহিংস-অসহযোগ সংগ্রামে কংগ্রেসকে শক্তিশালী করেছে রেল ধর্মঘট। অত্যাচার, অবিচারের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে প্রতিবাদ করতে জনমতে সাহস সঞ্চার করেছে ধর্মঘট। জাতীয়তাবোধের প্রেরণার উজ্জীবিত হয়েছে জনসাধারণ ধর্মঘটকালে। ঘরে ফিরে চরকার প্রবর্তন হয়েছে। তাঁতের মাকু চলছে অবিরাম, গ্রামে-গ্রামে চট্টগ্রামবাসী পবিত্র পরিধেয়রূপে।
দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সবকয়টি আন্দোলনের নেতৃত্বে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং তাঁর অসাধারণ সংগঠন শক্তির প্রভাবে তিনি সব আন্দোলনে সফলকাম হয়েছেন। মাসব্যাপী বেঙ্গল রেল শ্রমিক আন্দোলনের বিরাট ব্যয় নির্বাহ করতে তাঁকে পৈতৃক সম্পত্তিই শুধু বন্ধক দিতে হয়নি; বহুবার কারাবরণও করতে হয়েছে। অসহযোগ আন্দোলন, সত্যাগ্রহ আন্দোলন – সবেতেই দেশপ্রিয় ছিলেন পুরোভাগে। তাই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পরে দেশপ্রিয় কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র, প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভাপতি এবং বঙ্গীয় ব্যবস্থাপনা পরিষদের কংগ্রেস দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯২৫-১৯৩০-৩১ সাল পর্যন্ত তিনি ক্রমান্বয়ে পাঁচবার কলকাতার মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন।
প্রসঙ্গত: প্রখ্যাত জননেতা এ কে ফজলুল হক বলেছিলেন, “যদিও আমাদের কর্ম পরিধি ভিন্ন, তবু একথা স্বীকার না করে পারি না কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে একমাত্র যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তর উপরই ভারতের মুসলমান সম্প্রদায় বিশ্বাস রাখতে পারতো…। মুসলমান সম্প্রদায়ের মুখপত্র “The Mussalman” সম্পাদকীয় প্রবন্ধে লিখেছিলেন।“Mr. J. M. Sengupta was perhaps the only Hindu Leader of whom it could be said with also lute certainty that if he stood as a Candidate for election under joint electorate even in a predominantly votes, defeating his Muslim rival if any.”
যতীন্দ্রমোহনের অসাধারণ সংগঠন প্রতিভা পরিস্ফুট হল ‘বিওসি’ ধর্মঘটের সাফল্যে। সমগ্র ভারতে যতীন্দ্রমোহন পরিচিত হলেন শক্তিশালী ত্যাগব্রতী জননেতারূপে। স্বীকৃতি পেলেন সমগ্র ভারত শ্রমিক আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে। প্রিয়শিষ্যের কৃতিত্বে গর্বিত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। আন্তরিক ভালোবাসা জ্ঞাপন করলেন যতীন্দ্রমোহনকে। বিপুল গৌরবে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠানের সর্বভারতীয় নেতার পদে অধিষ্ঠিত হলেন যতীন্দ্রমোহন।
শ্রমিক আন্দোলনের স্থপতি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার নেতাকে সংবর্ধনা জানালেন, যতীন্দ্রমোহনের অভিনন্দন সভায় সুন্দর ভাষণ দিলেন প্রবীণ নেতা প্রসন্ন কুমার সেন। যতীন্দ্রমোহনের ত্যাগ, সাহস ও জনসেবার উজ্জ্বল ছবি তুলে ধরলেন শ্রোতৃবর্গের সম্মুখে। আবেগে, উচ্ছ্বাসে, কৃতজ্ঞচিত্তে প্রস্তাব করলেন, যতীন্দ্রমোহনকে “দেশপ্রিয়” আখ্যায় ভূষিত করা হোক। সানন্দে প্রস্তাব সমর্থন করলেন বর্ষীয়ান নেতা, শেখ এ চাঁদগামী কাজেম আলী ও মৌলানা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী এবং আচার্য রমেশ চন্দ্র সেন ও শিখ সাধু, বামা কৃপাল দাশ উদাসী। উৎসাহে, উদ্দীপনায়, উল্লাসে, সভা উদ্বেলিত। সহস্র কণ্ঠের বন্দেমাতরম, আল্লাহু আকবার, দেশপ্রিয় জয় ধ্বনিতে প্রস্তাব সংবর্ধিত হল।
আরও পড়ুন
বাংলার ‘মহারাজ’ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী
ব্রিটিশ সংস্থার পরাজয় ঘটেছে যতীন্দ্রমোহন পরিচালিত ধর্মঘট সংগ্রামে। এই সংগ্রামের অভূতপূর্ব সাফল্যে কলকাতার শ্বেতাঙ্গ সমাজ ক্রুদ্ধ। যতীন্দ্রমোহনের উপর রুষ্ট। শ্বেতাঙ্গ মুখপত্র, কলকাতার দৈনিক সংবাদপত্র, যতীন্দ্রমোহনকে “Infant Terrible of Chittagong” (চট্টগ্রামের করাল শিশু) আখ্যা দিয়ে অন্তরের দহনজ্বালা প্রশমিত করবার নির্লজ্জ প্রয়াস পেল জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্রে অভিনন্দন জানালো যতীন্দ্রমোহনকে, “ Un-crowned king of Chittagong” (চট্টগ্রামের মুকুটবিহীন রাজা) বলে অভিহিত করে।
৫ জুন, ১৯৩৩। দেশপ্রিয়কে কারাগার থেকে স্থানান্তরিত করা হল রাঁচিতে, যেখানে সুচিকিৎসার কোনো সরকারি সুব্যবস্থা ছিল না। সেকালে গভর্নমেন্টের দুর্জ্ঞেয় সিদ্ধান্ত। দেশবাসী বিস্মিত। একটি মহৎ জীবনকে নিয়ে গভর্নমেন্টের ছিনিমিনি খেলা! জনমনে সন্দেহের সঞ্চার হল। অনেকের অস্থির জিজ্ঞাসা, তবে কি এটা সরকারি ষড়যন্ত্র? তবে কি স্বজন পরিজনের পরিবেশ থেকে দূরে নিয়ে গিয়ে, বিনা চিকিৎসায় রেখে, মৃত্যুর পথে দেশপ্রিয়কে ঠেলে দেওয়ার দুষ্ট অভিসন্ধি, ভারত সরকারের? একটি নিরুত্তর বিহ্বল প্রশ্ন!
পাড়া প্রতিবেশীবিহীন প্রায় নির্জন অঞ্চল ‘কাঁকে রোড’ এর ‘নগেন্দ্র লজ’ রাঁচিতে দেশপ্রিয়’র অন্তরীন-আবাস। অহোরাত্র পুলিশের পাহারা, গৃহের চারিদিকে। গৃহে একটিও আসবাব নেই। সৃষ্টিছাড়া বাড়ি বলে মনে হয়। (উল্লেখ, দেশপ্রিয়ের মৃত্যুর পর রাঁচি মিউনিসিপ্যালিটি, দেশপ্রিয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনার্থে রাঁচির কাঁকে রোড-এর নতুন নামকরণ করেছিলেন “দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন রোড”।
রাঁচিতে দেশপ্রিয়র স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হল। শ্রীমতি নেলী উদ্বিগ্ন। চিঠি দিলেন সরকারি উচ্চ মহলে। কলকাতায়। কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে অবিলম্বে রাঁচি পাঠাতে অনুরোধ জানালেন চিঠিতে। শ্রীমতি নেলীর অনুরোধে গভর্নমেন্ট সাড়া দিলেন না।
২১ জুলাই, সন্ধ্যা ছয়টা। পুলিশ পাহারায় শ্রীমতি নেলী ও আইলীনকে সঙ্গে করে ড্রাইভে বেরিয়েছেন দেশপ্রিয়। শ্রীমতি নেলীকে বললেন, “আজ তোমাদের সঙ্গে খেতে বসব। একটু দেরি করবেই খাব।”
রাঁচি গলফ ক্লাবের কাছে গাড়ি পৌঁছেছে। ভেবেছিলেন, আরও কিছুদূর যাবেন। অস্বস্তি বোধ করলেন। শ্রীমতি নেলীকে বললেন, না, ভালো লাগছে না। বাড়ি ফিরে চল। নগেন্দ্র লজ-এ পৌঁছে বললেন, আমার খাবার দাও। এক গ্লাস বার্লি খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। আইলীন কাছে বসে। জ্যেষ্ঠতাতের কপালে হাত রেখে। শ্রীমতি নেলী রান্নাঘরে। অকস্মাৎ আইলীনের আর্তনাদ। জ্যেঠিমা, জ্যেঠিমা, শিগগির এসো।
ঘরে প্রবেশ করে শ্রীমতি নেলী দেখলেন, শয্যায় শায়িত যতীন্দ্রমোহন বাকশক্তিরহিত। চোখে কোমল করুণ দৃষ্টি। হাত দুইখানি তাঁর দিকে প্রসারিত করবার চেষ্টা করছেন। ভারতের আকাশ অন্তহীন বেদনার অন্ধকারে আচ্ছন্ন হল ২২ জুলাই, ১৯৩৩-এ।